০৭ অক্টোবর ২০২৬, ১৬:৩৭

বেতন কাঠামো বদলেছে, রয়েছে বৈষম্য

বিদ্যালয়ে ক্লাস নিচ্ছেন এমপিওভুক্ত শিক্ষক  © এআই দিয়ে তৈরিকৃত ছবি

বেতন কাঠামো বদলালেও সরকারি শিক্ষকদের ‍তুলনায় বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারীদের বেলায় বৈষম্য রয়ে গেছে। মূল বেতন সরকারি কোষাগার থেকে শতভাগ পেলেও বাড়িভাড়া, উৎসব ভাতা, চিকিৎসা, শিক্ষা, শ্রান্তি-বিনোদন এবং অবসর-সুবিধায় বেশ বৈষম্যের স্বীকার হচ্ছেন তারা। দশকের পর দশক শিক্ষক-কর্মচারীরা নানা আন্দোলন-সংগ্রাম করলেও এ পার্থক্য দূর না হওয়ায় চাপা ক্ষোভ নিয়ে বেড়াচ্ছেন তারা। আর বৈষম্য থাকলে মেধাবীরা এই পেশায় আসতে আগ্রহ হারাবেন বলে মনে করছেন শিক্ষাবিদরা।

জানা গেছে, শিক্ষকদের বেতন কাঠামোয় বড় পরিবর্তন এলেও এখনো নানা বৈষম্য রয়ে গেছে। বিশেষ করে মাধ্যমিক পর্যায়ের ৯৭ শতাংশ এমপিওভুক্ত শিক্ষক সরকারি শিক্ষকদের তুলনায় মূল বেতন ও সুযোগ-সুবিধায় পিছিয়ে রয়েছেন। শিক্ষক সংকট শুধু বেতন-ভাতার নয়, পেশাগত প্রস্তুতি, কর্মপরিবেশ, পদোন্নতি, ক্যারিয়ার কাঠামো ও সামাজিক মর্যাদার ঘাটতিও এর সঙ্গে জড়িত। মেধাবীদের শিক্ষকতা পেশায় আকৃষ্ট করতে সম্মানজনক বেতন-ভাতার পাশাপাশি পেশাগত নিরাপত্তা, নির্ভরযোগ্য ক্যারিয়ার পথ এবং রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে বলে জানান শিক্ষাবিদরা।

শিক্ষকদের বেতন বৈষম্যের বিষয়ে শিক্ষাবিদ ড. মনজুর আহমদ বলেন, শিক্ষকদের সংকট শুধু বেতন-ভাতার নয়; শিক্ষক ব্যবস্থাপনা, পেশাগত প্রস্তুতি, কর্মপরিবেশ, পদোন্নতি ও ক্যারিয়ার কাঠামোর দীর্ঘদিনের ঘাটতিও এর সঙ্গে যুক্ত। মেধাবীদের শিক্ষকতায় আনতে হলে সম্মানজনক আর্থিক সুবিধার পাশাপাশি পেশাগত নিরাপত্তা ও নির্ভরযোগ্য ক্যারিয়ার পথ নিশ্চিত করতে হবে।

বর্তমান সরকারের সময়ে শিক্ষকদের বেতন কাঠামোতে পরিবর্তন এসেছে জানিয়ে এই শিক্ষাবিদ বলেন, এর সুফল মূলত সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরা পাবেন। অথচ দেশে মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের মোট শিক্ষকের মাত্র ৩ শতাংশ সরকারি শিক্ষক। তারা সরকারি চাকরির ২০টি গ্রেডের মধ্যে ১০ম গ্রেডের বেতন কাঠামোতে রয়েছেন। অন্যদিকে মাধ্যমিকের ৯৭ শতাংশ শিক্ষক এমপিওভুক্ত। তারা সরকারি শিক্ষকদের তুলনায় মূল বেতন এবং প্রায় এক-চতুর্থাংশ সুবিধা পান। আর নন-এমপিও শিক্ষকরা বিদ্যালয়ের নিজস্ব অর্থায়নে বেতন পান, যা এর চেয়েও উল্লেখযোগ্যভাবে কম।

তিনি বলেন, প্রাথমিক পর্যায়ের অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষকও বেসরকারি ব্যবস্থার আওতাভুক্ত। তাদের জন্য বেতন কাঠামোর কোনো নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থা নেই। ফলে শিক্ষকদের সংকটময় অবস্থা থেকেই যাচ্ছে। বর্তমান সরকারের শিক্ষা ভাবনায় অনেক পরিবর্তনের আশ্বাস শোনা যাচ্ছে। তবে এসব উদ্যোগ কতটা বাস্তবায়ন হবে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।

মেধাবীদের শিক্ষকতা পেশায় আকৃষ্ট করার ওপর গুরুত্ব দিয়ে ড. মনজুর আহমদ বলেন, মেধাবীদের শিক্ষকতা পেশায় আগ্রহী করে তুলতে হবে। তবে বর্তমানে ঔপনিবেশিক আমলের ভেরিফিকেশন ব্যবস্থার কারণে শিক্ষকতা পেশার প্রতি আগ্রহ আরও কমতে পারে। তাই বিষয়টি সরকারের পর্যালোচনায় রাখা উচিত।

শিক্ষকদের বর্তমান সংকটের সঙ্গে বৈশ্বিক শিক্ষক সংকটের বিষয়টি মিলিয়ে তিনি বলেন, শিক্ষকতার ভূমিকা ও মর্যাদা শুধু বেতন-ভাতার বিষয় নয়; এর সঙ্গে পেশাগত প্রস্তুতি, প্রশিক্ষণ, কর্মপরিবেশ, পদোন্নতি, দায়িত্ব ও জবাবদিহির বিষয়ও যুক্ত। বাংলাদেশে শিক্ষক ব্যবস্থাপনার এসব জায়গায় দীর্ঘদিনের ঘাটতি রয়েছে। তাই শুধু নতুন প্রকল্প বা প্রশিক্ষণ নয়, শিক্ষকতা পেশাকে দীর্ঘমেয়াদে আকর্ষণীয় ও মর্যাদাপূর্ণ পেশায় পরিণত করার উদ্যোগ প্রয়োজন।

শিক্ষকরা সমাজের ভবিষ্যৎ নির্মাণ করেন জানিয়ে তিনি বলেন, শিক্ষকদের আর্থিক ও সামাজিক মর্যাদা নিশ্চিত করা ছাড়া শিক্ষা ব্যবস্থায় কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আনা কঠিন। মেধাবীদের শিক্ষকতা পেশায় আনতে হলে তাদের জন্য একটি নির্ভরযোগ্য ক্যারিয়ার পথ, সম্মানজনক বেতন-ভাতা এবং পেশাগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।

শিক্ষাবিদ খোন্দকার কাওসার আহমেদ বলেন, ‘শিক্ষকের মর্যাদা শিক্ষককেই প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। শিক্ষক নিজেকে এমন এক অনন্য উচ্চতায় প্রস্তুত করবেন, যেন যথার্থ শিক্ষাদানের ক্ষেত্রে সমাজে তার কোনো যথোপযুক্ত বিকল্প তৈরি না হয়। এমনটি কি আদতে সম্ভব? অবশ্যই সম্ভব। তবে এর জন্য রাষ্ট্রকে সার্বিক সহযোগিতা নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে। 

শিক্ষকদের মর্যাদা নিয়ে তিনি বলেন, শিক্ষকের পেশাগত আন্তরিকতা এবং রাষ্ট্রের উপযুক্ত পৃষ্ঠপোষকতার মেলবন্ধনেই নিহিত রয়েছে শিক্ষক সমাজের প্রত্যাশিত মান-মর্যাদা। শিক্ষক আন্তরিক, কিন্তু রাষ্ট্রের সহযোগিতা নেই— সেখানে শিক্ষকের মর্যাদা সুরক্ষিত থাকে না। রাষ্ট্রের সহযোগিতা আছে, অথচ শিক্ষকের পেশাগত আন্তরিকতার অভাব— সেখানেও শিক্ষকের মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হতে পারে না। আর যেখানে শিক্ষকের পেশাদারিত্ব অনুপস্থিত এবং রাষ্ট্রের অবস্থানও যাচ্ছেতাই— সেখানে শিক্ষক-সমাজের মর্যাদা বৃদ্ধি পাওয়া একেবারেই অসম্ভব। বহুদিন ধরে আমাদের সমাজে শিক্ষকের কাঙ্ক্ষিত সম্মান অনুপস্থিত। খেয়াল করলে দেখবেন, শিক্ষক দিবস উদযাপনের সঙ্গেও আমাদের বৃহত্তর সমাজের ভক্তিপূর্ণ সম্পৃক্ততা নেই— এমনকি দায়সারা গোছের হলেও নয়। 

শিক্ষক জাতি গড়ার কারিগর, শিক্ষার মেরুদণ্ড— এ ধরনের বহুল উচ্চারিত কথাবার্তাও শিক্ষকের কোনো সামাজিক অবস্থান তৈরি করতে পারেনি—বকোয়াজি ছাড়া আর কী! তার মানে হলো, এখানে শিক্ষকের পেশাগত আন্তরিকতা ও নিষ্ঠার ঘাটতি আছে, কিংবা রাষ্ট্রের পর্যাপ্ত আনুকূল্য অনুপস্থিত—অথবা, কোনোটিই ঠিকঠাক নেই। আর এই দুটো জায়গা ঠিকঠাক না হওয়া পর্যন্ত সমাজে শিক্ষকের কাঙ্ক্ষিত মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হবে না। কস্মিনকালেও না!