২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৩:৪৬

পারফিউম নয়, ঘামের গন্ধেই প্রেমে পড়বেন নারীরা, নয়া ট্রেন্ড ‘ফেরোমোন ম্যাক্সিং’ কী?

ঘামের গন্ধকেই নাকি বানানো হচ্ছে যৌন আকর্ষণের হাতিয়ার  © টিডিসি সম্পাদিত

প্রেমের সম্পর্কে আকর্ষণ বাড়াতে এতদিন পরিচ্ছন্নতা ও সুগন্ধিকেই গুরুত্ব দেওয়া হতো। তবে সমাজমাধ্যমে এখন দেখা যাচ্ছে একেবারেই ভিন্ন এক প্রবণতা। ঘামের গন্ধকেই নাকি বানানো হচ্ছে যৌন আকর্ষণের হাতিয়ার। এই নতুন ধারার নাম দেওয়া হয়েছে ‘ফেরোমোন ম্যাক্সিং’।

ডেটিং জগতে এই প্রবণতা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বেশ আলোচনা চলছে। বলা হচ্ছে, নতুন প্রজন্মের পুরুষদের মধ্যেই এর প্রচলন বেশি। বিষয়টি নিয়ে একাধিক আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমেও প্রতিবেদন প্রকাশ হয়েছে।

সাধারণত ডেটে যাওয়ার আগে ভালোভাবে গোসল করা, পরিষ্কার পোশাক পরা, চুল ঠিক করা এবং সুগন্ধি ব্যবহার করাই স্বাভাবিক প্রস্তুতি। কিন্তু ‘ফেরোমোন ম্যাক্সিং’-এর ধারণা ঠিক এর বিপরীত। এর অনুসারীদের কেউ কেউ ডেটে যাওয়ার আগে গোসল না করা, সুগন্ধি ব্যবহার না করা কিংবা পরিষ্কার পোশাক না পরার কথা বলছেন। তাদের ধারণা, শরীরের স্বাভাবিক গন্ধই নাকি অন্যের কাছে আকর্ষণ তৈরি করতে পারে।

সাধারণত এতদিন জানতেন, ডেটে যাওয়ার আগে নিজেকে পরিপাটি করে সাজিয়ে নিতে হয়। ভাল করে স্নান করে পরিষ্কার পোশাক পরা থেকে চুল আঁচড়ে সুগন্ধি মাখা— এটাই এতকালের পরিচিত প্রস্তুতি। কিন্তু সমাজমাধ্যমের নতুন প্রবণতা বলছে, এ সবের উল্টোটা করুন। স্নান করবেন না। সুগন্ধি মাখবেন না। পরিষ্কার জামাও পরবেন না। নিজের শরীরের স্বাভাবিক গন্ধকেই হতে দিন প্রেমের অস্ত্র!

প্রশ্ন উঠবে, ফেরোমোন কী? এই ধারণার নেপথ্যেই বা কোন যুক্তি কাজ করছে? ফেরোমোন হল এক ধরনের বিশেষ রাসায়নিক পদার্থ, যা কোনও জীব বা প্রাণী তার নিজের শরীর থেকে বাতাসে বা পরিবেশে ছড়িয়ে দেয়। সহজ কথায়, এটি হল প্রাণীদের এক ধরনের গোপন বা অদৃশ্য ভাষা।

জীবজন্তুরা মানুষের মতো কথা বলতে পারে না। তাই তারা নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ করার জন্য এই রাসায়নিক সঙ্কেত ব্যবহার করে। একই প্রজাতির অন্য কোনও প্রাণী যখন এই গন্ধ বা রাসায়নিকের সংস্পর্শে আসে, তখন তারা একটি নির্দিষ্ট বার্তা পেয়ে যায় এবং সেই অনুযায়ী আচরণ করে। উদাহরণস্বরূপ বলা যেতে পারে, পিঁপড়ের রাস্তা চেনা থেকে কিছু পতঙ্গের যৌনমিলনের সঙ্গীর সন্ধান করা। কিন্তু সমাজমাধ্যমের এই ধারার যাঁরা প্রবর্তক এবং অনুগামী, তাঁদের যুক্তি, মানুষের শরীরের স্বাভাবিক গন্ধে এমন রাসায়নিক সঙ্কেত থাকতে পারে, যা অন্য মানুষের কাছে আকর্ষণ বাড়ায়। তাই সাবান বা সুগন্ধি দিয়ে সেই গন্ধ ঢেকে ফেলার বদলে সেটিকে যত বেশি সম্ভব ‘প্রাকৃতিক’ অবস্থায় রাখা উচিত। সমাজমাধ্যমে এই ধারণা নিয়ে নানা পরামর্শ ছড়িয়ে পড়তেই কিছু তরুণ, বিশেষ করে জেন-জ়ি পুরুষ, ডেটের আগে ইচ্ছা করে স্নান না করা শুরু করেছেন।

কিন্তু জীবজন্তুর ক্ষেত্রে যা সত্য, তা মানুষের ক্ষেত্রে সত্য না-ও হতে পারে। মানুষের ক্ষেত্রে এমন কোনও নির্দিষ্ট যৌগ এখনও বিজ্ঞানীরা চিহ্নিত করতে পারেননি, যাকে নিশ্চিত ভাবে ‘যৌন ফেরোমোন’ বলা যায় এবং যা অন্য মানুষকে যৌন ভাবে আকৃষ্ট করে। এমন কোনও চূড়ান্ত বৈজ্ঞানিক প্রমাণও নেই যে, মানুষ ফেরোমোন উৎপাদন করে বা তাতে সাড়া দেয়। ‘ফেরোমোন ম্যাক্সিং’-এর মূল সমস্যাটাই এখানে। ধারণাটি যতটা নিশ্চিত ভাবে সমাজমাধ্যমে বলা হচ্ছে, বিজ্ঞান ততটা নিশ্চিত নয়।

শরীরের গন্ধ আকর্ষণের ক্ষেত্রে কোনও ভূমিকা পালন করে না; এ কথাও বলা যায় না। নির্দিষ্ট কারও গায়ের স্বাভাবিক গন্ধ আপনার পছন্দ হতেই পারে। কোনও গন্ধে ভাল লাগার স্মৃতি তৈরি হতে পারে। আবার কোনও গন্ধ একেবারেই অপছন্দ হতে পারে। কিন্তু সেখান থেকে ‘স্নান বন্ধ করলেই প্রেমে সাফল্য’;  এই সিদ্ধান্তে পৌঁছোনোর মতো প্রমাণ নেই।

এখানে একটা খুব সাধারণ পার্থক্য ভুলে যাচ্ছে এই প্রবণতা। মানুষের নিজস্ব শরীরের গন্ধ থাকা স্বাভাবিক। যাঁকে ভালবাসেন, তাঁর গায়ের স্বাভাবিক গন্ধও কখনও পরিচিত বা আকর্ষণীয় মনে হতে পারে। গন্ধের সঙ্গে স্মৃতি ও আবেগেরও গভীর সম্পর্ক রয়েছে। কিন্তু শরীরের স্বাভাবিক গন্ধ পছন্দ করা আর দিনের পর দিন স্নান না করে, ঘাম ও ময়লা জমিয়ে ডেটে যাওয়া এক জিনিস নয়।

ঘাম, ত্বকে জমে থাকা মৃত কোষ, জীবাণু, ময়লা, ত্বকের সংক্রমণ ইত্যাদি নিয়ে ঘুরে বেড়ালে মহিলারা প্রেমে পড়ে যাবেন বা যৌন ভাবে আকৃষ্ট হবেন, এই ভাবনা খানিক অদ্ভুত বলে মনে করছেন মনোবিদেরা। প্রথম দেখায় অপরিচ্ছন্নতা চোখে পড়লে বা বোটকা গন্ধ নাকে এলে আকর্ষণের বদলে ঘৃণা তৈরি হতে পারে। প্রথম ডেট সেই প্রথমেই আটকে যেতে পারে। দ্বিতীয় পর্যন্ত গড়াবে না।

‘ফেরোমোন ম্যাক্সিং’-এর সবচেয়ে প্রচলিত পরামর্শ হল স্নান না করা, সুগন্ধি এড়িয়ে চলা। কিন্তু সমাজমাধ্যমে আরও কিছু পরামর্শের কথা শোনা যাচ্ছে। ঘামে ভেজা জামা পরে ডেটে যাওয়ার কথাও বলা হচ্ছে। শুধু কি তা-ই? কিছু নেটপ্রভাবী দাবি করেছেন, নিজের প্রস্রাব পান করলেও নাকি ফেরোমোন বাড়তে পারে।

 এ সবের কোনও বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। বরং শরীর থেকে বর্জ্য পদার্থ বার করে দেয় প্রস্রাব। তাতে বর্জ্য ও জীবাণু থাকতে পারে। যৌন আবেদন বাড়ানোর কৌশল হিসেবে নিজের প্রস্রাব পান করতে থাকলে শেষমেশ রোগ বাধিয়ে শয্যাশায়ী হতে পারেন।

প্রশ্ন উঠবে, এই প্রবণতার উৎস কী? এর নেপথ্যে রয়েছে ১৯৯৫ সালের একটি সমীক্ষা। যেখানে কয়েক জন পুরুষের ঘামে ভেজা টি-শার্ট শোঁকানো হয়েছিল মহিলাদের। সেখান থেকে জানা গিয়েছিল, বিশেষ কিছু পুরুষের গায়ের গন্ধই তাঁদের পছন্দ হয়েছিল। সেখানে জিনতত্ত্বের বিষয়টিও খাড়া করা হয়।

পরবর্তীকালে এই বিষয়টি নিয়ে আরও কিছু পরীক্ষা হয়, যেখানে জিনের প্রসঙ্গটিকে খারিজ করে দেওয়া। সেগুলিরর মধ্যে ২০২০ সালের একটি পরীক্ষা অন্যতম। যেখানে দাবি করা হয়, পুরুষদের প্রতি মহিলাদের আকর্ষণের কারণ কেবল গায়ের গন্ধ নয়।

প্রেম বা আকর্ষণ এমন একটি বিষয়, যার কোনও সহজ সূত্র নেই। কে কাকে পছন্দ করবেন, তা নির্ভর করে বেড়ে ওঠা, অভিজ্ঞতা, ব্যক্তিত্ব, পরিপার্শ্ব, জীবনের পরিস্থিতি, আত্মবিশ্বাস এবং দু’জনের পারস্পরিক যোগাযোগের উপর। সময়ের সঙ্গে একই মানুষকে দেখার দৃষ্টিও বদলে যেতে পারে। এর কোনও চটজলদি সমাধান বা টোটকা হয় না।

তাই ডেটে যাওয়ার আগে ‘প্রাকৃতিক গন্ধ’ একেবারে মুছে ফেলতে হবে— এমন নয়। আবার সেই গন্ধকে ‘প্রেমের অস্ত্র’ বানাতে গিয়ে সাবান, পরিষ্কার জামা আর সুগন্ধিকে শত্রু ভাবারও কারণ নেই। কারণ শেষ পর্যন্ত প্রেম কোনও রাসায়নিক পরীক্ষাগারের ফর্মুলা নয়। সুগন্ধ হয়তো প্রথম মুহূর্তে ভাল লাগতে পারে, কিন্তু তার পরের কথোপকথন, রসবোধ, আচরণ, আত্মবিশ্বাস, সম্মান আর পারস্পরিক পছন্দ— এ সবের জায়গা কোনও ‘ডেটিং ট্রেন্ড’ নিতে পারে না। তাই অদ্ভুত ট্রেন্ড অনুসরণ না করে বরং নিজের উপর ভরসা রাখুন। [আনন্দবাজার পত্রিকার তথ্যের আলোকে]