দায়িত্বের কাছে ইচ্ছেগুলো হার মেনে যায়
মুসলমানদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব ঈদুল ফিতর সমাগত। উৎসবের আমেজে সেজে উঠেছে পুরো দেশ। কেউ ঘরে ফিরছেন, কেউবা প্রিয়জনের ঘরে ফেরার অপেক্ষায় পথ চেয়ে আছেন।
উৎসবের লম্বা ছুটি উপভোগ করতে মানুষ যখন ঘরে ফিরছেন অথবা প্রিয়জনের মুখে হাসি ফোটাতে কেনাকাটায় ব্যস্ত, তখনও নাগরিকদের নিরাপত্তা দিতে নির্ঘুম রাত কাটছে কালাম হোসেনের। কালাম হোসেনের মতো হাজারো পুলিশ সদস্যের জীবনে উৎসব নয়, ঈদ আসে বাড়তি দায়িত্ব পালনের বার্তা নিয়ে। উৎসবের দিনে প্রিয়জন থেকে দূরে থাকা এই পেশাজীবীদের কাছে ‘দায়িত্বের পোশাকের ভার, উৎসবের আনন্দের চেয়েও বেশি’।
পুলিশ সদস্য কালাম হোসেন বলছিলেন, ‘সবার মতো আমরাও যদি ছুটিতে চলে যাই, তাহলে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হবে। তাছাড়া এটাই পুলিশের কাজ; পরিবার-প্রিয়জনের চেয়েও দায়িত্বটাই আমাদের কাছে বড়।’
যশোরে কর্মরত এই পুলিশ সদস্য জানাচ্ছিলেন, ১৬ বছরের চাকরিজীবনে অন্যদের মতো পরিবারের সাথে ঈদ করা বা বন্ধুদের সাথে ঈদের নামাজ পড়ার সুযোগ খুব কমই হয়েছে তার।
‘ছুটি তো দূরের কথা, উৎসব এলেই দায়িত্বের চাপ যেন আরও বেড়ে যায়’, বলছিলেন পুলিশ সদস্য সুজাউদ্দৌলা।
তিনি বলেন, ‘সাধারণ সময়ে ১২ ঘণ্টা ডিউটি থাকলেও উৎসবের সময় ১৭ থেকে ১৮ ঘণ্টা কাজ করতে হয়। দিনের ডিউটি শেষ হতে না হতেই শুরু হয় রাতের স্পেশাল ডিউটি। এভাবেই চলছে আমাদের জীবন।’
উৎসবের দিনে পরিবারের কথা মনে পড়ে কি না- এমন প্রশ্নে কিছুটা বিষণ্ন হয়ে পড়েন এই পুলিশ সদস্য। চোখ ছলছল করে ওঠে তার। তিনি বলেন, ‘ঈদের দিন খুব ইচ্ছা করে ছেলেমেয়েকে নিয়ে ঘুরতে বের হই। যখন দেখি সবাই পরিবার নিয়ে ঘুরছে, তখন খুব কষ্ট হয়। পুলিশের চাকরি না করলে আমিও হয়তো ওভাবে ঘুরতে পারতাম। কিন্তু দায়িত্বের কাছে ইচ্ছেগুলো হার মেনে যায়। তবুও একটা কথা ভেবেই ভালো লাগে যে, আমি যেতে না পারলেও আমার কারণে অন্যরা নিরাপদে পরিবার নিয়ে সময় কাটাতে পারছে নির্বিঘ্নে।’
পুলিশ সদস্য রাসেল বলেন, ‘প্রতিটি মানুষের কাছে তার পরিবার সবার আগে। কিন্তু আমি এমন একটা পেশায় আছি যেখানে দেশ এবং জনগণের নিরাপত্তা সবার আগে। আমি চাইলেই আর পাঁচটা সাধারণ মানুষের মতো জীবনযাপন করতে পারি না; নিয়ম ও কর্তব্যের মধ্যেই আমাকে থাকতে হয়। উৎসবের দিনে পরিবার থেকে দূরে থাকাটা কষ্টের হলেও এখন তা মানিয়ে নিয়েছি।’
পুলিশের এই ত্যাগ সাধারণ মানুষ কতটা অনুভব করে- এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘পুলিশকে নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে নানা মত আছে। তবে কেউ বিপদে পড়লে সবার আগে আমাদের কাছেই ফোন আসে। তবে একথা ঠিক যে, পুলিশের কাজ সাধারণ মানুষের জন্যই। কিছু ভুলত্রুটি হয়তো আছে, তবে সেগুলো বাদ দিলে বাংলাদেশ পুলিশের অবদান অস্বীকার করার সুযোগ নেই।’
উৎসবের দিনে পরিবার-প্রিয়জন থেকে দূরে থাকা এসব পুলিশ সদস্যের জন্য জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে বিশেষ আয়োজন থাকবে বলে জানিয়েছেন যশোরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) আবুল বাশার। তিনি বলেন, ‘যেসব পুলিশ সদস্য ঈদের দিন কর্মস্থলে থাকবেন, তাদের জন্য জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে প্রীতিভোজের ব্যবস্থা থাকবে। পাশাপাশি দায়িত্বরত সবাই যাতে ঈদের নামাজ পড়তে পারেন, সেজন্য আগে থেকেই শিডিউল অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দিয়েছেন পুলিশ সুপার।’
এই সিনিয়র কর্মকর্তা বলছিলেন, সদস্যরা যাতে একাকিত্ব অনুভব না করেন, সে বিষয়ে সকল ইউনিট ইনচার্জকে সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে।