ইউআইটিএসের সমাবর্তন ঘিরে আর্থিক অস্বচ্ছতা ও অব্যবস্থাপনার অভিযোগ, ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা
দীর্ঘ আট বছর পর আগামী ৩১ অক্টোবর অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ইউনিভার্সিটি অব ইনফরমেশন টেকনোলজি অ্যান্ড সায়েন্সেসের (ইউআইটিএস) চতুর্থ সমাবর্তন। তবে বহুল প্রতীক্ষিত এ আয়োজন ঘিরে সমাবর্তন ফি, আর্থিক অস্বচ্ছতা, অব্যবস্থাপনা, উপহারসামগ্রীর মান এবং শিক্ষার্থীদের সঙ্গে দুর্ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। এসব বিষয়ে ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করেছেন সমাবর্তনে অংশ নিতে যাওয়া শিক্ষার্থীদের একাংশ। তাঁদের অভিযোগ, দীর্ঘ অপেক্ষার পর আয়োজিত এ অনুষ্ঠান ঘিরে প্রত্যাশা পূরণের বদলে নানা অব্যবস্থাপনা ও অস্পষ্টতা তৈরি হয়েছে।
শিক্ষার্থীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এবারের সমাবর্তনে মোট ৩ হাজার ৯৭০ জন শিক্ষার্থী নিবন্ধন করেছেন। প্রত্যেক শিক্ষার্থীর কাছ থেকে অংশগ্রহণের জন্য ৭ হাজার টাকা করে নেওয়া হয়েছে। সে হিসাবে শুধু শিক্ষার্থীদের নিবন্ধন ফি থেকেই মোট ২ কোটি ৭৭ লাখ ৯০ হাজার টাকা আদায়ের হিসাব পাওয়া যায়।
এর বাইরে একজন অভিভাবকের জন্য দেড় হাজার টাকা এবং দুজন অভিভাবকের জন্য আড়াই হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। ফলে একজন অভিভাবকসহ সমাবর্তনে অংশ নিতে একজন শিক্ষার্থীকে মোট ৮ হাজার ৫০০ টাকা এবং দুজন অভিভাবকসহ অংশ নিতে ৯ হাজার ৫০০ টাকা দিতে হচ্ছে।
শিক্ষার্থীদের একাংশের প্রশ্ন, সমাবর্তন আয়োজনের জন্য তাঁদের কাছ থেকে আদায় করা বিপুল পরিমাণ অর্থ কোন কোন খাতে ব্যয় করা হচ্ছে এবং এ ব্যয়ের হিসাব কতটা স্বচ্ছভাবে প্রকাশ করা হবে।
তাঁদের কারও কারও দাবি, সমাবর্তনের সম্ভাব্য ব্যয় ৬০ থেকে ৭০ লাখ টাকার মধ্যে হতে পারে। তবে এ দাবির পক্ষে কোনো নিরীক্ষিত হিসাব বা প্রামাণ্য নথি পাওয়া যায়নি। এ অবস্থায় সমাবর্তনের প্রকৃত আয়-ব্যয়ের হিসাব প্রকাশের দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থীরা।
সমাবর্তনের নিবন্ধনপ্রক্রিয়া নিয়েও অসন্তোষ জানিয়েছেন কয়েকজন শিক্ষার্থী। তাঁদের অভিযোগ, নিবন্ধনের বিষয়ে পর্যাপ্ত প্রচার-প্রচারণা ছিল না। পাশাপাশি নির্ধারিত সময়সীমার কারণে অনেক শিক্ষার্থীকে সমস্যায় পড়তে হয়েছে।
এ ছাড়া সমাবর্তনের গাউন সংগ্রহের সময় ভোগান্তি, টি-শার্টের মাপ দেওয়ার পরও কারও কারও টি-শার্ট না পাওয়া এবং উপহারসামগ্রীর মান নিয়েও অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন শিক্ষার্থীরা।
কয়েকজন শিক্ষার্থীর অভিযোগ, উপহারসামগ্রীর মান নিয়ে প্রশ্ন তোলার পর তাঁরা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কাছ থেকে দুর্ব্যবহারের শিকার হয়েছেন। এমনকি সমাবর্তন আয়োজন নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করতে গিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষকের কাছ থেকেও দুর্ব্যবহার পেয়েছেন বলে অভিযোগ করেছেন তাঁরা।
সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থীদের ভাষ্য অনুযায়ী, তাঁদের উদ্দেশে ওই শিক্ষক বলেন, ‘তোরা কি করবি কর। তোমরা যতদূর যেতে পারবা, আমিও ততদূর যেতে পারব।’
দীর্ঘ আট বছর পর সমাবর্তন আয়োজন ঘিরে শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা ছিল অনেক বেশি। তবে অতিথি নির্বাচন ও আয়োজনের পরিধি নিয়েও অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন কেউ কেউ।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শিক্ষার্থী বলেন, ‘আমরা দেখেছি, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনে চ্যান্সেলর তথা বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি অথবা শিক্ষামন্ত্রীকে প্রধান অতিথি হিসেবে আমন্ত্রণ জানানো হয়। কিন্তু আমাদের সমাবর্তনে রাষ্ট্রপক্ষের কোনো অতিথিকে পাচ্ছি না। আমরা পাচ্ছি বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের চেয়ারম্যান ও আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের চেয়ারম্যানকে। এর চেয়ে লজ্জাজনক আর কী হতে পারে!’
ওই শিক্ষার্থীর বক্তব্য, দীর্ঘ অপেক্ষার পর আয়োজিত সমাবর্তনে অতিথি নির্বাচন ও আয়োজনের পরিধি নিয়ে শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা পূরণ হয়নি।
সমাবর্তনের আমন্ত্রণপত্রে মোবাইল ফোন, ক্যামেরাসহ ইলেকট্রনিক ডিভাইস নিয়ে প্রবেশ না করার নির্দেশনা রয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন ফার্মেসি বিভাগের এক শিক্ষার্থী। এ নির্দেশনার যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তিনি।
ওই শিক্ষার্থী বলেন, ‘আট বছর পর আমাদের একটি মিলনমেলা হতে যাচ্ছে। সেখানে আমাদের মোবাইল নিতে বাধা কেন, ছবি তুলতে নিষেধ করা হচ্ছে কেন? অবশ্যই এর ভেতরে কোনো একটা সমস্যা রয়েছে। আমরা যেন ভিডিও করে সামাজিক মাধ্যমে তাঁদের কুকীর্তিগুলো তুলে ধরতে না পারি, সে জন্যই আমাদের নিষেধ করা হয়েছে বলে মনে হচ্ছে।’
তবে মোবাইল ফোন ও ক্যামেরা ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞার কারণ সম্পর্কে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। ফলে এ নির্দেশনার পেছনে কী কারণ রয়েছে, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
সমাবর্তন আয়োজন ঘিরে আর্থিক স্বচ্ছতা, ব্যবস্থাপনা ও শিক্ষার্থীদের অসন্তোষের বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের কাছে জানতে চাইলে তিনি অভিযোগগুলোর বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো ব্যাখ্যা দেননি বলে জানা গেছে। তবে গ্র্যাজুয়েট শিক্ষার্থীদের খাবারের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা ভালো মানের খাবারের ব্যবস্থা করব।’
অন্যদিকে, সমাবর্তনে রাষ্ট্রপতিকে অতিথি হিসেবে আমন্ত্রণ না জানানোর বিষয়ে জানতে চাইলে উপাচার্য জানান, রাষ্ট্রপতির কাছে আমন্ত্রণ জানিয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছিল। তবে অনুমোদন না পাওয়ায় তাঁকে সমাবর্তনে অতিথি হিসেবে আনা সম্ভব হয়নি।
শিক্ষার্থীদের মতে, সমাবর্তন কেবল একটি আনুষ্ঠানিক অনুষ্ঠান নয়; এটি শিক্ষাজীবনের গুরুত্বপূর্ণ অর্জন উদ্যাপনের পাশাপাশি দীর্ঘদিনের স্মৃতি, আবেগ ও ভালোবাসার সঙ্গে জড়িত। তাই দীর্ঘ আট বছর পর আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা, সুযোগ-সুবিধা ও সম্মান নিশ্চিত করা জরুরি।
তাঁদের অভিযোগ, অতিথি নির্বাচন, আয়োজনের ব্যবস্থাপনা এবং সার্বিক প্রস্তুতি নিয়ে তৈরি হওয়া অসন্তোষ সমাবর্তনের আনন্দকে ম্লান করছে। এ পরিস্থিতিতে সমাবর্তনে মোট কত টাকা আদায় হয়েছে, কোন কোন খাতে কত টাকা ব্যয় করা হচ্ছে এবং আয়োজন শেষে কোনো অর্থ উদ্বৃত্ত থাকলে তার ব্যবস্থাপনা কী হবে, তা বিস্তারিতভাবে প্রকাশের দাবি জানিয়েছেন শিক্ষার্থীরা।
একই সঙ্গে নিবন্ধনপ্রক্রিয়া, গাউন ও উপহারসামগ্রী বিতরণ, ইলেকট্রনিক ডিভাইস ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা এবং শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আচরণ নিয়ে ওঠা অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ পর্যালোচনার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।