২৯ অক্টোবর ২০২৬, ১৫:৪৫

ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটিতে বিশ্ব গণমাধ্যম ও তথ্য সাক্ষরতা সপ্তাহ ২০২৬ অনুষ্ঠিত

ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটিতে সেমিনার অনুষ্ঠিত   © সংগৃহীত

তরুণদের মধ্যে তথ্য যাচাই, ভুল ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অপতথ্য মোকাবিলা এবং দায়িত্বশীলভাবে ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহারের দক্ষতা বাড়ানোর আহ্বানের মধ্য দিয়ে ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটিতে বিশ্ব গণমাধ্যম ও তথ্য সাক্ষরতা সপ্তাহ ২০২৬-এর জাতীয় সেমিনার ও পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠিত হয়েছে।

বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয়ের মঞ্জুর এলাহী অডিটোরিয়ামে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এতে গবেষণার ফলাফল তুলে ধরার পাশাপাশি গণমাধ্যম ও তথ্য সাক্ষরতা নিয়ে কাজ করা তরুণ, শিক্ষার্থী ও বিভিন্ন উদ্যোগকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়।

ইউনেস্কো ঢাকা ও মিডিয়া অ্যান্ড ইনফরমেশন লিটারেসি নেটওয়ার্ক বাংলাদেশের (MILNetBD) সহযোগিতায় এবং জাতিসংঘের নির্বাচনবিষয়ক প্রকল্প ‘ব্যালট’-এর সহায়তায় ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির তথ্য অধ্যয়ন বিভাগ এ আয়োজন করে।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের উপদেষ্টা—পলিসি ও স্ট্র্যাটেজি এবং তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় ও সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত ড. জাহেদ উর রহমান। সভাপতিত্ব করেন ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারপারসন ও প্রতিষ্ঠাতা উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে ড. জাহেদ উর রহমান বলেন, ‘গণমাধ্যম ও তথ্য সাক্ষরতা মানুষের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার পরিবর্তে সচেতনতা তৈরি করতে হবে। নিজের বিশ্বাসের সঙ্গে মিলে যায়—এমন তথ্য নিয়েও প্রশ্ন করতে মানুষকে উৎসাহিত করতে হবে। ভুল তথ্য ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অপতথ্য বিশ্বজুড়েই একটি চ্যালেঞ্জ। সেমিনার ও উন্মুক্ত আলোচনার মাধ্যমে সব বয়সের মানুষের মধ্যে এসব মোকাবিলার জন্য প্রয়োজনীয় সমালোচনামূলক চিন্তার দক্ষতা গড়ে তোলা সম্ভব।’

বাংলাদেশে ইউনেস্কোর প্রতিনিধি ও ঢাকা কার্যালয়ের প্রধান ড. সুসান ভাইজ বিশেষ অতিথির বক্তব্যে বলেন, ‘গণমাধ্যম ও তথ্য সাক্ষরতা তরুণদের তথ্য নিয়ে প্রশ্ন করতে, সমালোচনামূলকভাবে ভাবতে এবং নির্বাচনসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে জেনেবুঝে সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করে। শিক্ষায় এসব দক্ষতা যুক্ত করে এবং আলোচনা ও বিতর্কের সুযোগ বাড়িয়ে আমরা গণতান্ত্রিক জীবনে তাঁদের সচেতন অংশগ্রহণে সহায়তা করতে পারি।’

অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে আরও উপস্থিত ছিলেন ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির ভারপ্রাপ্ত উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আশিক মোসাদ্দিক এবং ইউএনডিপি বাংলাদেশের জাতিসংঘের নির্বাচনী সহায়তা প্রকল্প ব্যালটের প্রধান কারিগরি উপদেষ্টা আন্দ্রেস দেল কাস্তিয়ো সানচেস।

প্রতিবছর ২৪ থেকে ৩১ অক্টোবর বিশ্বব্যাপী গণমাধ্যম ও তথ্য সাক্ষরতা সপ্তাহ পালিত হয়। তথ্য সংগ্রহ ও বোঝার পাশাপাশি তা সমালোচনামূলকভাবে মূল্যায়ন, দায়িত্বশীলভাবে ব্যবহার, তৈরি ও আদান-প্রদানের দক্ষতা বাড়ানো এ সপ্তাহ পালনের অন্যতম লক্ষ্য। এ বছরের প্রতিপাদ্য ‘We All Play a Part – Media and Information Literacy for the People’। সুস্থ তথ্যপরিবেশ গড়ে তুলতে শিক্ষক, সাংবাদিক, নীতিনির্ধারক, ডিজিটাল কনটেন্ট নির্মাতা, নাগরিক সমাজ ও তরুণদের সম্মিলিত দায়িত্বের বিষয়টি এতে তুলে ধরা হয়েছে।

ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটিতে এ উপলক্ষে ২৫ অক্টোবর সচেতনতামূলক র‍্যালি ও গণমাধ্যম ও তথ্য সাক্ষরতা সচেতনতা বুথ উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে কর্মসূচি শুরু হয়। ২৬ অক্টোবর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে গণমাধ্যম ও তথ্য সাক্ষরতা বিষয়ে বক্তৃতা প্রতিযোগিতা এবং ২৭ ও ২৮ অক্টোবর ক্যাম্পাসে সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়। ২৯ অক্টোবর অনুষ্ঠিত হয় জাতীয় সেমিনার ও পুরস্কার বিতরণী। ৩০ ও ৩১ অক্টোবর অনলাইনে সচেতনতামূলক কার্যক্রম আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে।

এসব কর্মসূচিতে তথ্য যাচাই, ভুল ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অপতথ্য মোকাবিলা, নৈতিক যোগাযোগ এবং ডিজিটাল প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দায়িত্বশীল ব্যবহার নিয়ে আলোচনা ও অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি করা হয়। এর পাশাপাশি শিক্ষক, শিক্ষার্থী, ক্যাম্পাসভিত্তিক সংগঠন ও যুব নেটওয়ার্ককে যুক্ত করে অংশীদারদের বৃহত্তর কার্যক্রমও পরিচালিত হচ্ছে।

সপ্তাহব্যাপী আয়োজনের বাইরে এসব কার্যক্রমের মধ্যে রয়েছে সিটিজেনশিপ অলিম্পিয়াড, MIL অ্যাম্বাসেডর উদ্যোগ, তরুণদের নেতৃত্বাধীন সোশ্যাল অ্যাকশন প্রজেক্ট (SAP), বিশ্ববিদ্যালয় ক্লাবগুলোর ভিডিও নির্মাণ কার্যক্রম, টিচার্স ফেলোশিপ এবং ক্যাম্পাস কানেক্টেড।

সিটিজেনশিপ অলিম্পিয়াড ২০২৬-এ বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের প্রায় ১ হাজার ৭৪৬ জন অংশগ্রহণ করেন। ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির তথ্য অধ্যয়ন বিভাগ ও MILNetBD-এর নেতৃত্বে এবং ব্যালটের আওতায় ইউনেস্কোর কারিগরি সহায়তায় এ অলিম্পিয়াড আয়োজন করা হয়। বাস্তব জীবনের পরিস্থিতিভিত্তিক প্রশ্নের মাধ্যমে তরুণদের গণমাধ্যম ও তথ্য সাক্ষরতার ব্যবহারিক দক্ষতা, সমালোচনামূলক চিন্তা, নৈতিক বিচারবোধ এবং ডিজিটাল ও নাগরিক জীবনে তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা বাড়ানো ছিল এর লক্ষ্য।

MIL অ্যাম্বাসেডর উদ্যোগে প্রায় ২৫ জন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী সহপাঠীদের সম্পৃক্ত করা, অলিম্পিয়াডের শিক্ষণ উপকরণ প্রচার এবং দায়িত্বশীলভাবে তথ্য ব্যবহারের বিষয়ে সচেতনতা তৈরিতে কাজ করেন। অন্যদিকে, শিক্ষার্থীদের সোশ্যাল অ্যাকশন প্রজেক্টে ফেসবুকে তথ্যবিশৃঙ্খলা, গণমাধ্যমের সঙ্গে দায়িত্বশীল সম্পৃক্ততা এবং মা ও গৃহিণীদের গণমাধ্যম ও তথ্য সাক্ষরতার মতো বিষয় উঠে আসে। অংশগ্রহণকারী বিশ্ববিদ্যালয় ক্লাবগুলোও গণমাধ্যম ও তথ্য সাক্ষরতা, সমালোচনামূলক চিন্তা এবং দায়িত্বশীল নাগরিকত্বের বার্তা নিয়ে ভিডিও তৈরি করে।

গণমাধ্যম ও তথ্য সাক্ষরতা শিক্ষা, শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বাধীন উদ্যোগে পরামর্শদান এবং ক্যাম্পাসভিত্তিক কার্যক্রম জোরদার করতে ২৪ জন শিক্ষককে ফেলোশিপ দেওয়া হয়। এ ছাড়া ক্যাম্পাস কানেক্টেড উদ্যোগের মাধ্যমে ১৩টি বিশ্ববিদ্যালয়কে যুক্ত করা হয়েছে। এর মাধ্যমে অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সহযোগিতা ও অভিজ্ঞতা বিনিময়ের সুযোগ তৈরি হয়েছে।

অনুষ্ঠানে ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির তথ্য অধ্যয়ন বিভাগের চেয়ারপারসন ও MILNetBD-এর সভাপতি অধ্যাপক ড. দিলারা বেগম মূল গবেষণা প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন। এতে ব্যালটের আওতায় ইউনেস্কোর আর্থিক ও কারিগরি সহায়তায় বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক দলের পরিচালিত তরুণদের গণমাধ্যম ও তথ্য সাক্ষরতা মূল্যায়নের ফলাফল তুলে ধরা হয়। আলোচক ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্যবিজ্ঞান ও গ্রন্থাগার ব্যবস্থাপনা বিভাগের অধ্যাপক এবং গণমাধ্যম ও তথ্য সাক্ষরতা বিশেষজ্ঞ ড. কাজী মোস্তাক গাউসুল হক।

প্রশ্নমালাভিত্তিক এ মূল্যায়নে দেশের আট বিভাগের ১ হাজার ৬০৫ জন তরুণ অংশ নেন। ২০২৬ সালের জুন থেকে অক্টোবর পর্যন্ত তথ্য সংগ্রহ করা হয়। এতে অংশগ্রহণকারীদের ৮২ দশমিক ২ শতাংশ জানান, তারা গণমাধ্যম ও তথ্য সাক্ষরতা বিষয়ে কোনো প্রশিক্ষণ পাননি। নির্বাচনের তথ্য জানার প্রধান উৎস হিসেবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের কথা জানান ৫২ দশমিক ৩ শতাংশ। আর ৬২ দশমিক ২ শতাংশ জানান, নির্বাচনের সময় তারা ভুল বা বিভ্রান্তিকর তথ্যের মুখোমুখি হয়েছেন।

মূল্যায়নে গড় গণমাধ্যম ও তথ্য সাক্ষরতা সূচক ছিল ১০০-এর মধ্যে ৬৮ দশমিক ৪৯, যা গবেষণার মূল্যায়ন কাঠামোয় মধ্যম পর্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। তথ্য বোঝা, মূল্যায়ন ও ব্যবহারের তুলনায় তথ্যপ্রাপ্তি এবং তথ্য তৈরির ক্ষেত্রে গড় স্কোর কম ছিল।

গবেষণা প্রবন্ধে গণমাধ্যম ও তথ্য সাক্ষরতা শিক্ষা এবং তরুণদের প্রশিক্ষণ জোরদার, দায়িত্বশীল কনটেন্ট তৈরি, নির্বাচন ও নাগরিক তথ্য সাক্ষরতা, গণগ্রন্থাগারের ভূমিকা এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে অংশীদারত্ব বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়। এ ছাড়া কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাবিষয়ক সাক্ষরতা যুক্ত করে জাতীয় গণমাধ্যম ও তথ্য সাক্ষরতা নীতি প্রণয়ন এবং জাতীয় MIL নেটওয়ার্ককে আরও শক্তিশালী করার প্রস্তাব দেওয়া হয়। গবেষণা প্রতিবেদনের ওপর পরবর্তী কাজ চলমান রয়েছে। আলোচনার জন্য এ অনুষ্ঠানে গবেষণার ফলাফল উপস্থাপন করা হয়।

পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে সিটিজেনশিপ অলিম্পিয়াডের ১০ জন বিজয়ী, পাঁচজন MIL অ্যাম্বাসেডর, ভিডিও নির্মাণে অবদানের জন্য পাঁচটি বিশ্ববিদ্যালয় ক্লাব এবং তিনটি সোশ্যাল অ্যাকশন প্রজেক্ট দলকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়।

SAP বিভাগে পুরস্কার পায় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘ফেসবুকে তথ্যবিশৃঙ্খলা’ (Information Disorder on Facebook), ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির ‘গণমাধ্যমের প্রভাব ও দায়িত্বশীল সম্পৃক্ততা’ (Media Influence and Responsible Engagement) এবং খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘মা ও গৃহিণীদের মধ্যে গণমাধ্যম ও তথ্য সাক্ষরতা’ (MIL among Mothers and Homemakers) প্রকল্প।

সপ্তাহব্যাপী আয়োজন ও এর সঙ্গে যুক্ত বৃহত্তর কর্মসূচির মাধ্যমে গণমাধ্যম ও তথ্য সাক্ষরতা বিষয়ে জনসচেতনতা তৈরির পাশাপাশি এসব দক্ষতা শেখা ও বাস্তবে প্রয়োগের সুযোগ বাড়ানোর চেষ্টা করছেন আয়োজকেরা। শিক্ষক, গবেষক, গ্রন্থাগারিক, গণমাধ্যমকর্মীসহ বিভিন্ন অংশীজনের সহযোগিতায় MILNetBD বার্ষিক আয়োজনের বাইরেও এ ধরনের কার্যক্রম অব্যাহত রাখতে কাজ করছে।