তেলাপোকা, আঁশটে পোকা, মুরগির পচা মাংস —কী নেই ডিআইইউর ক্যান্টিনের খাবারে!
ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির (ডিআইইউ) পুরাতন ক্যাম্পাসের ক্যান্টিনে খাবারের মান ও পরিবেশ নিয়ে শিক্ষার্থীদের অভিযোগ যেন কমছেই না। কখনো খাবারে পোকা, কখনো পচা মাংস, আবার কখনো রান্নার তেলে মৃত তেলাপোকা—একের পর এক এমন অভিযোগ সামনে এলেও পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নতি নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে। গত ২০ মে ক্যান্টিনে আকস্মিক অভিযান চালিয়ে পচা চিকেন, পচা সিঙ্গারা ও সমুচার পুর এবং রান্নার তেলে মৃত তেলাপোকা পাওয়ার পর ১০ কর্মদিবসের মধ্যে দৃশ্যমান ও যুগান্তকারী পরিবর্তনের আশ্বাস দিয়েছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. মো. আবুল কালাম আজাদ। কিন্তু কয়েক মাস পেরিয়ে গেলেও সেই আশ্বাসের বাস্তবায়ন নিয়ে অসন্তোষ রয়েছে শিক্ষার্থীদের মধ্যে।
আজ রবিবার (২৫ অক্টোবর) ক্যান্টিনের খাবারে ফের আঁচা পোকা পাওয়ার অভিযোগ সামনে আসায় নতুন করে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে।
এর আগে গত ২০ মে ২০২৬ তারিখে ডিআইইউ'র পুরাতন ক্যাম্পাসের ক্যান্টিনে আকস্মিক অভিযান চালায় প্রক্টরিয়াল টিম। ওই অভিযানে ক্যান্টিনের ফ্রিজে সংরক্ষিত পচা চিকেন, পচা সিঙ্গারা ও সমুচার পুর পাওয়া যায়। পাশাপাশি রান্নার তেলে মৃত তেলাপোকার উপস্থিতিও সাংবাদিকদের ক্যামেরায় ধরা পড়ে। এ ছাড়া রান্নাঘরের নোংরা ও স্যাঁতসেঁতে পরিবেশ খাবার প্রস্তুত ও সংরক্ষণের স্বাস্থ্যবিধি নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করে।
অভিযানের সময় ক্যান্টিনের খাবারের মান, পরিচ্ছন্নতা ও অব্যবস্থাপনা নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেন শিক্ষার্থীরা। তাঁদের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. মো. আবুল কালাম আজাদ জানান, ক্যাফেটেরিয়ার বিষয়ে বোর্ড অব ট্রাস্টির নির্দেশনা রয়েছে। ঈদুল আজহার ছুটি শেষে ক্যাম্পাস খোলার পর বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হবে। একই সঙ্গে ১০ কর্মদিবসের মধ্যে ক্যান্টিনে দৃশ্যমান ও যুগান্তকারী পরিবর্তন আনার আশ্বাস দিয়েছিলেন তিনি।
তবে শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, আশ্বাসের পর এখন পর্যন্ত ক্যান্টিনে দোকান পরিবর্তন ও নতুন দোকান চালু হলেও খাবারের মানে প্রত্যাশিত পরিবর্তন আসেনি। ওই সময় পোকা পাওয়ার অভিযোগ ওঠা একটি দোকানের মালিক পরিবর্তন করা হয়। পাশাপাশি ক্যাম্পাসের ক্যান্টিনে আরও দুটি নতুন দোকান চালু হয়। কিন্তু দোকান পরিবর্তন ও নতুন দোকান চালুর পরও খাবারের মান নিয়ে অভিযোগ অব্যাহত রয়েছে।
নতুন করে ক্যান্টিনের খাবারে আবারও পোকা পাওয়ার অভিযোগ সামনে আসলে ১০ কর্মদিবসের মধ্যে পরিবর্তন আনার আশ্বাস কতটা বাস্তবায়িত হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন শিক্ষার্থীরা। তাঁদের মতে, শুধু অভিযান পরিচালনা কিংবা সাময়িক পরিবর্তনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। বরং খাবারের মান, রান্নাঘরের পরিবেশ ও পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করতে নিয়মিত তদারকি প্রয়োজন।
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, ক্যান্টিনে খাবারের সঙ্গে পোকা পাওয়ার ঘটনা নতুন নয়। কখনো খাবারে পোকা, কখনো চুল পাওয়ার অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে তাঁদের। এমনকি শিক্ষার্থীদের খাবার পরিবেশনের প্লেটেই ক্যান্টিনের বিড়ালকে খেতে দেখা যায় বলেও অভিযোগ রয়েছে। তাঁদের মতে, এসব ঘটনা খাবার পরিবেশন ও পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখার ক্ষেত্রে অবহেলার ইঙ্গিত দেয়।
এর আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে এক শিক্ষার্থী লিখেছিলেন, আসলে কী আর বলব! একদিন দুপুরে খেতে গিয়ে খিচুড়ি আর মাংস নিয়েছিলাম। দুইটাতেই পোকা ছিল। এরপর আর না খেয়েই উঠে চলে আসি।
এ ধরনের অভিযোগে ক্যান্টিনের খাবারের নিরাপত্তা নিয়ে শিক্ষার্থীদের উদ্বেগ বাড়ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যান্টিনে নিয়মিত খাবার গ্রহণকারী শিক্ষার্থীদের জন্য বিষয়টি শুধু ভোগান্তির নয়, সম্ভাব্য স্বাস্থ্যঝুঁকিরও কারণ হয়ে উঠছে।
ক্যান্টিনের অব্যবস্থাপনা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে এক শিক্ষার্থী বলেন, বিভিন্ন সময়ে আমরা দেখি, প্রক্টরিয়াল টিম ক্যান্টিনে অভিযান চালায়। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এর কোনো প্রপার সমাধান হচ্ছে না। বিভিন্ন সময় কোনো না কোনো শিক্ষার্থী খাবারে পোকা পাচ্ছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরেক শিক্ষার্থী বলেন, অভিযানের নামে প্রক্টরিয়াল টিম শিক্ষার্থীদের সঙ্গে একপ্রকার চোর-পুলিশ খেলেছে। তারা কী ধরনের অভিযান চালায়, তা নিয়ে বরাবরই প্রশ্ন থেকে যায়। এসব অভিযানের কোনো সুফল আসছে বলে আমার মনে হয় না। শুধু ক্যান্টিনের বিষয়েই নয়, প্রক্টরিয়াল টিমের নানা ধরনের কর্মকাণ্ডেও ব্যর্থতার বিষয়টি লক্ষ্য করা যায়।
শিক্ষার্থীদের এসব অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ক্যান্টিনের অব্যবস্থাপনা দূর করতে প্রক্টরিয়াল টিমের অভিযান ও প্রশাসনিক উদ্যোগের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তাঁদের মতে, অনিয়মের অভিযোগ সামনে আসার পর সাময়িক অভিযান পরিচালনা করাই যথেষ্ট নয়; বরং নিয়মিত তদারকি, খাবারের মান যাচাই এবং স্বাস্থ্যবিধি নিশ্চিত করার কার্যকর ব্যবস্থা থাকতে হবে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যান্টিন শিক্ষার্থীদের দৈনন্দিন জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। প্রতিদিন অনেক শিক্ষার্থী এখানকার খাবারের ওপর নির্ভর করেন। ফলে ক্যান্টিনে পরিবেশিত খাবার নিরাপদ ও স্বাস্থ্যসম্মত হওয়া জরুরি। কিন্তু বারবার খাবারে পোকা পাওয়ার অভিযোগ, পচা খাবার সংরক্ষণ এবং রান্নাঘরের অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের চিত্র সামনে আসায় ক্যান্টিন পরিচালনা ও তদারকির কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। প্রায়ই খাবারে পোকা পাওয়ার অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ক্যান্টিনের পরিবেশ ও খাবারের মান উন্নয়নে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন কী পদক্ষেপ নিয়েছে, নিয়মিত তদারকি হচ্ছে কি না এবং নতুন অভিযোগের পর কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে—এসব প্রশ্নের জবাব চান শিক্ষার্থীরা।
তাঁদের দাবি, ক্যান্টিনের অব্যবস্থাপনা দূর করতে শুধু আশ্বাস কিংবা লোকদেখানো অভিযান নয়, প্রয়োজন কার্যকর ও স্থায়ী সমাধান।