০৯ অক্টোবর ২০২৬, ২০:২১

বিশ্বসেরা ২ শতাংশ বিজ্ঞানীর তালিকায় গ্রিন ইউনিভার্সিটির উপাচার্য ড. মোহাম্মদ শরীফ উদ্দিন

অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ শরীফ উদ্দিন  © সংগৃহীত

বিশ্বের শীর্ষ ২ শতাংশ বিজ্ঞানীর তালিকায় স্থান পেয়েছেন গ্রিন ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ শরীফ উদ্দিন। যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটি ও নেদারল্যান্ডসভিত্তিক প্রকাশনা সংস্থা এলসেভিয়ার প্রকাশিত ২০২৬ সালের তালিকায় তিনি এ সেরার স্বীকৃতি পেয়েছেন। গত এক বছরের গবেষণার ভিত্তিতে বৃহস্পতিবার তালিকাটি প্রকাশ করা হয়।

প্রকাশিত তালিকায় অধ্যাপক  ড. মোহাম্মদ শরীফ উদ্দিনের বৈশ্বিক অবস্থান ১ লাখ ৮৮ হাজার ৭৬১তম। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি তার গবেষণার প্রধান ক্ষেত্র। এ ক্ষেত্রে তার উপ-ক্ষেত্র কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ইমেজ প্রসেসিংয়ে বৈশ্বিক অবস্থান ৮ হাজার ৫১০তম। তার এইচ-ইনডেক্স ১৩ এবং এইচএম-ইনডেক্স ৭।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে দেওয়া এক পোস্টে অনুভূতি শেয়ার করে উপাচার্য অধ্যাপক মোহাম্মদ শরীফ উদ্দিন বলেন, ‘আলহামদুলিল্লাহ! এলসেভিয়ার ও স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রকাশিত ২০২৬ সালের তালিকায় বিশ্বের শীর্ষ ২ শতাংশ বিজ্ঞানীর মধ্যে স্থান পেয়ে আমি অত্যন্ত আনন্দিত।

আমার শ্রদ্ধেয় শিক্ষক, গবেষণার সহকর্মী, নিষ্ঠাবান শিক্ষার্থী এবং গবেষক দলের সদস্যদের প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানাই। আপনাদের অব্যাহত সহযোগিতা ও সমর্থন আমাকে গবেষণার বিভিন্ন ক্ষেত্রে আরও গভীরভাবে কাজ করতে অনুপ্রাণিত করেছে।

এই স্বীকৃতি শুধু আমার একার নয়। আমার গবেষণার পথচলায় যারা যুক্ত ছিলেন, তাদের সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টার প্রতিফলন এটি।

মহান আল্লাহ যেন আমাকে বিজ্ঞান, গবেষণা ও মানবকল্যাণে অবদান রাখার সুযোগ দেন।’

অধ্যাপক মোহাম্মদ শরীফ উদ্দিন ২০০২ সালে জাপানের কিয়োটো ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি থেকে ডক্টর অব ইঞ্জিনিয়ারিং (পিএইচডি) ডিগ্রি অর্জন করেন। এর আগে ১৯৯৯ সালে জাপানের শিগা ইউনিভার্সিটি থেকে টেকনোলজি এডুকেশনে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি এবং ১৯৯১ সালে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) থেকে ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। পরে ২০১৩ সালে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমবিএ ডিগ্রি নেন।

১৯৯১ সালে চট্টগ্রামের বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজিতে (বর্তমানে চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়—চুয়েট) প্রভাষক হিসেবে তার শিক্ষকতা জীবন শুরু হয়। ১৯৯২ সালে তিনি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে যোগ দেন। বর্তমানে তিনি এ বিভাগের অধ্যাপক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

দীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সভাপতি এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের আইসিটি সেলের শিক্ষক-ইনচার্জ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। এসব দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও প্রযুক্তিগত কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন।

অধ্যাপক শরীফ উদ্দিনের আন্তর্জাতিক গবেষণার অভিজ্ঞতা রয়েছে। তিনি বিশ্বের বিভিন্ন খ্যাতনামা গবেষণা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পোস্টডক্টরাল গবেষণা করেছেন। এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে সিঙ্গাপুরের বায়োইনফরমেটিকস ইনস্টিটিউট, জাপানের টয়োটা টেকনোলজিক্যাল ইনস্টিটিউট, কিয়োটো ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি, চিবা ইউনিভার্সিটি ও সাইতামা ইউনিভার্সিটি, জার্মানির বন ইউনিভার্সিটি এবং চীনের চাইনিজ একাডেমি অব সায়েন্সেসের ইনস্টিটিউট অব অটোমেশন।

তার গবেষণার ক্ষেত্র বেশ বিস্তৃত। কম্পিউটার ভিশন, কৃষি ও জীবচিকিৎসাবিষয়ক ইমেজিং, ছবি ও তথ্যের নিরাপত্তা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং মেশিন লার্নিং নিয়ে তিনি গবেষণা করেন।

গবেষণায় তার প্রকাশনার সংখ্যাও উল্লেখযোগ্য। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন জার্নাল ও প্রকাশনা সংস্থায় তার প্রায় ৩০০টি গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়েছে। এসব গবেষণাপত্র প্রকাশ করেছে এলসেভিয়ার, স্প্রিঙ্গার, আইইইই, এসিএম, উইলি, অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস, এসপিআইই ও অপটিকার মতো খ্যাতনামা প্রতিষ্ঠান। গুগল স্কলারে তার গবেষণাপত্রগুলো ৭ হাজার ৫০০ বারের বেশি উদ্ধৃত হয়েছে।

বৈজ্ঞানিক উদ্ভাবনের স্বীকৃতি হিসেবে তার নামে দুটি পেটেন্ট রয়েছে। এ ছাড়া তিনি একাধিক বই সম্পাদনা করেছেন এবং স্প্রিঙ্গার ও এলসেভিয়ারের মতো আন্তর্জাতিক প্রকাশনা সংস্থা থেকে প্রকাশিত বেশ কয়েকটি বইয়ের অধ্যায় লিখেছেন।

অধ্যাপক শরীফ উদ্দিন বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সম্মেলনে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেছেন। পাশাপাশি একাধিক আন্তর্জাতিক সম্মেলনে সাধারণ সভাপতি, টেকনিক্যাল প্রোগ্রাম কমিটির (টিপিসি) সভাপতি ও সহসভাপতি হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন।

গবেষণা ও একাডেমিক অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে তিনি বিভিন্ন পুরস্কার পেয়েছেন। ২০১৩ সালে ঢাকায় অনুষ্ঠিত আইসিআইইভি সম্মেলনে সেরা গবেষণাপত্রের পুরস্কার অর্জন করেন। এ ছাড়া ২০০৪ সালে পোল্যান্ডের ওয়ারশতে অনুষ্ঠিত আইসিসিভিজি সম্মেলনে সেরা উপস্থাপকের পুরস্কার পান।

২০০৪ সালে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের চলাচলে সহায়তার জন্য তার উদ্ভাবিত ‘ইলেকট্রনিক আই’ বিশ্বজুড়ে আলোচনায় আসে। এ উদ্ভাবনের জন্য সিএনএন, বিবিসি, রয়টার্স, দ্য নিউইয়র্ক টাইমস, দ্য জাপান টাইমস ও অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের মতো আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ও টেলিভিশন চ্যানেল তার কাজ নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করে।

শিক্ষার্থীদের আন্তর্জাতিক পর্যায়ের প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের প্রস্তুতি ও গবেষণায়ও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। ২০১৫ ও ২০১৭ সালে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের এসিএম আইসিপিসি ওয়ার্ল্ড ফাইনালস দলের শিক্ষার্থীদের প্রশিক্ষণ ও পরামর্শ দেন তিনি। এ ছাড়া তিনি বহু পিএইচডি ও স্নাতকোত্তর গবেষণার তত্ত্বাবধান করেছেন।

অধ্যাপক মোহাম্মদ শরীফ উদ্দিন ২০২৪ সালের ১৬ মে থেকে গ্রিন ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশের উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এ দায়িত্ব পালনের জন্য তিনি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে তার স্থায়ী পদ থেকে একাডেমিক ছুটিতে রয়েছেন।

পেশাগত স্বীকৃতির অংশ হিসেবে তিনি বাংলাদেশ একাডেমি অব সায়েন্সেস (বিএএস), ইনস্টিটিউশন অব ইঞ্জিনিয়ার্স, বাংলাদেশ (আইইবি) এবং বাংলাদেশ কম্পিউটার সোসাইটির (বিসিএস) ফেলো। তিনি ইনস্টিটিউট অব ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিকস ইঞ্জিনিয়ার্সের (আইইইই) সিনিয়র সদস্য হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক গবেষণা সাময়িকী IEEE Access-এর সহযোগী সম্পাদক হিসেবে কাজ করছেন।

উল্লেখ্য এবারের তালিকায় বাংলাদেশের ৩৪৭ জন গবেষক স্থান পেয়েছেন। ২০২৫ সালে এ সংখ্যা ছিল ২৮৬। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে তালিকায় বাংলাদেশের গবেষকের সংখ্যা বেড়েছে ৬১ জন। শতকরা হিসাবে এ বৃদ্ধি ২১ দশমিক ৩ শতাংশ।

গবেষকের সংখ্যার হিসাবে বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান ৪৫তম। গত বছরের তুলনায় দেশটি এক ধাপ এগিয়েছে। একই সঙ্গে তালিকায় বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যাও বেড়েছে। ২০২৫ সালে ৭৪টি বিশ্ববিদ্যালয় ও প্রতিষ্ঠান থেকে গবেষকেরা তালিকায় স্থান পেয়েছিলেন। চলতি বছর এ সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮৮টিতে। অর্থাৎ এক বছরে প্রতিষ্ঠানসংখ্যা বেড়েছে ১৪টি বা ১৮ দশমিক ৯ শতাংশ।