২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২০:৩৬

কোন প্রতিষ্ঠান যুগের বেশি, কোনটি বছরের পর বছর—ভাড়া বিল্ডিংয়ে চলছে ২৯ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় লোগো  © টিডিসি সম্পাদিত

১৯৯৬ সালে সরকারের অনুমোদন পায় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ‘দ্য পিপলস ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ’। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠার সর্বোচ্চ ১২ বছরের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়কে স্থায়ী ক্যাম্পাসে যাওয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। তবে প্রতিষ্ঠার তিন দশক পেরিয়ে গেলেও এখনও স্থায়ী ক্যাম্পাসে যেতে পারেনি বিশ্ববিদ্যালয়টি। আইনের এই বিধান উপেক্ষা করেই রাজধানীর মোহাম্মদপুরে অস্থায়ী ক্যাম্পাসে চলছে প্রতিষ্ঠানটির একাডেমিকসহ সব ধরনের কার্যক্রম।

বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়টিতে আচার্য কর্তৃক মনোনীত কোনো উপাচার্য, উপ-উপাচার্য ও কোষাধ্যক্ষ নেই। বিশ্ববিদ্যালয়টির ডেপুটি রেজিস্টার শাহ নুরন্নবী শনিবার (২৬ সেপ্টেম্বর) দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেছেন, নরসিংদীর শিবপুরে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের পাশে একটি জায়গায় স্থায়ী ক্যাম্পাসের জন্য ভবন তোলা হয়েছিল। তবে পরবর্তীতে সেই জায়গাতে মহাসড়কের জায়গা পড়ায় সেখানে স্থায়ী ক্যাম্পাস করা সম্ভব হচ্ছে না। তাই সেখানে আর যাওয়া হবে না। বর্তমানে ঢাকার আশেপাশে জায়গা খুঁজছি। জায়গা পাওয়া গেলে স্থায়ী ক্যাম্পাস করা হবে। তাই আপাতত মোহাম্মদপুর বর্তমানে অস্থায়ী ক্যাম্পাসে কার্যাক্রম চালিয়ে যাওয়া হবে। তবে সেটি ভাড়ায় নয়, তাদের সেটি নিজস্ব জায়গায় ক্যাম্পাস করা হয়েছে বলে জানান তিনি।

শুধু দ্য পিপলস ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ নয়, প্রতিষ্ঠার ১২ বছর পার হলেও দেশের ২৯টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় এখনও স্থায়ী ক্যাম্পাসে যেতে পারেনি। এসব বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রম চলছে ভাড়া করা ভবনের বিভিন্ন ফ্লোরে। স্থায়ী ক্যাম্পাসে না যাওয়ার বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় সংশ্লিষ্টরা নানা কারণ দেখিয়েছেন। কেউ দাবি করছেন, স্থায়ী ও অস্থায়ী ক্যাম্পাসে একইসঙ্গে একাডেমিক কার্যক্রম চলছে। কেউ বলছেন, শিগগিরই স্থায়ী ক্যাম্পাসে যাওয়ার প্রস্তুতি চলছে। আবার কেউ জানিয়েছেন, স্থায়ী ক্যাম্পাসের জন্য জায়গা খোঁজা হচ্ছে; উপযুক্ত জায়গা পাওয়া গেলেই সেখানে কার্যক্রম স্থানান্তর করা হবে।

বিগত ১৭ বছরে এসব বিশ্ববিদ্যালয়ে রাজনৈতিক প্রভাব ও দলীয়করণ করা হয়েছে। ফলে তারা বিভিন্ন ক্ষেত্রে ছাড় পেয়েছে। আমরা এখন সব বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়কে অডিটের আওতায় নিয়ে এসেছি। প্রাথমিকভাবে যেসব বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ রয়েছে, সেগুলোকে অগ্রাধিকার দিয়ে ইউজিসির বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় শাখা কাজ শুরু করেছে। আমরা আশা করছি, এর মাধ্যমে আইনের ব্যত্যয় ঘটবে না।- অধ্যাপক ড. আব্দুল্লাহ-আল-মামুন, সদস্য, ইউজিসি

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন ২০১০-এর ১২(১) ধারা অনুযায়ী, প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়কেই স্থায়ী ক্যাম্পাসে যাওয়া বাধ্যতামূলক। প্রতিষ্ঠার জন্য সরকারের দেওয়া সাময়িক অনুমতির মেয়াদ ৭ বছর। এরপর বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ আবেদন করলে সরকার তিন দফায় সর্বোচ্চ ৫ বছর পর্যন্ত সময় বাড়িয়ে দিতে পারে। এ সময়ের মধ্যে আইনে নির্ধারিত পরিমাণ জমিতে নিজস্ব স্থায়ী ক্যাম্পাস প্রতিষ্ঠা করে সেখানে শিক্ষা কার্যক্রম শুরু করতে হবে। তবে এরই মধ্যে ১২ বছরের বেশি সময় পার হওয়ায় এসব বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য আইন অনুসারে আর সময় বাড়ানোর সুযোগ নেই।

এই সময়ের পর সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি ও শিক্ষা সংক্রান্ত সকল কার্যক্রম বন্ধ করার কথা বলা হয়েছে আইনে। তবে বাস্তবে সেটির প্রয়োগ নেই। এই আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে ৮টি বিশ্ববিদ্যালয় এক থেকে দেড় যুগ; ১৭টি কয়েক বছর ধরে চলছে ভাড়া বিল্ডিংয়ে। আবার ৪টি বিশ্ববিদ্যালয় মালিকানা দ্বন্দ্ব ও স্থায়ী ক্যাম্পাস না থাকায় বন্ধ রেখেছে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন (ইউজিসি)।

জানতে চাইলে ইউজিসির সদস্য ও সংস্থাটির গণমাধ্যম মুখপাত্র অধ্যাপক ড. আব্দুল্লাহ-আল-মামুন দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, বিগত ১৭ বছরে এসব বিশ্ববিদ্যালয়ে রাজনৈতিক প্রভাব ও দলীয়করণ করা হয়েছে। ফলে তারা বিভিন্ন ক্ষেত্রে ছাড় পেয়েছে। আমরা এখন সব বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়কে অডিটের আওতায় নিয়ে এসেছি। প্রাথমিকভাবে যেসব বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ রয়েছে, সেগুলোকে অগ্রাধিকার দিয়ে ইউজিসির বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় শাখা কাজ শুরু করেছে। আমরা আশা করছি, এর মাধ্যমে আইনের ব্যত্যয় ঘটবে না। পাশাপাশি এসব বিশ্ববিদ্যালয়কে জবাবদিহিতার আওতায় আনা এবং তা নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

৮টি বিশ্ববিদ্যালয় এক-দেড় যুগে যায়নি স্থায়ী ক্যাম্পাসে
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, প্রতিষ্ঠার এক কিংবা দেড় যুগ পরও আরও ৭টি বিশ্ববিদ্যালয় যায়নি স্থায়ী ক্যাম্পাসে। এর মধ্যে ২০০১ সালের প্রতিষ্ঠিত ইউনিভার্সিটি অব ডেভেলপমেন্ট অল্টারনেটিভ, ২০০২ সালে প্রতিষ্ঠিত স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ, ২০০৩ সালে প্রতিষ্ঠিত দ্য মিলেনিয়াম ইউনিভার্সিটি, ভিক্টোরিয়া ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ, প্রেসিডেন্সি ইউনিভার্সিটি ও  প্রাইমএশিয়া ইউনিভার্সিটি এবং ২০০৬ সালের প্রতিষ্ঠিত আশা ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ স্থায়ী ক্যাম্পাসে যায়নি।

অন্যদিকে, ভিক্টোরিয়া ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ ইউজিসির লাল তালিকায় (এক তারকা) রয়েছে। প্রতিষ্ঠার পর থেকে প্রায় দুই দশক ধরে রাজধানীর একটি অনুমোদিত ভবনে তারা শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে আসছিল। এছাড়া দি পিপল’স ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ-এর প্রতিষ্ঠাকালীন সময় হতে অদ্যাবধি আচার্য নিয়োগকৃত ট্রেজারার নিয়োজিত নাই, সেই সাথে প্রো-ভিসি নিয়োজিত নেই। ফলে সেটিও ইউজিসির লাল তালিকায় (এক তারকা) রয়েছে। 

বছরের পর বছর ভাড়া বিল্ডিংয়ে চলছে ১৭ বিশ্ববিদ্যালয়
নর্থ ইস্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ ২০১২ সালে প্রতিষ্ঠিত। আইন অনুযায়ী ২০২৪ সালের মধ্যে স্থায়ী ক্যাম্পাসে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু এখনও অস্থায়ী ক্যাম্পাসে চলেছে তাদের কার্যক্রম। একই সালে প্রতিষ্ঠিত ইশাখা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, এক্সিম ব্যাংক কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশ, নর্থ ওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটি, সোনারগাঁও ইউনিভার্সিটি, ফেনী ইউনিভার্সিটি, ব্রিটানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, পোর্ট সিটি ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি এখনও অস্থায়ী ক্যাম্পাসে চলেছে তাদের কার্যক্রম।

তাছাড়া ২০১৩ সালের প্রতিষ্ঠিত চট্টগ্রাম ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটি, টাইমস ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ, নর্থ বেঙ্গল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, ফারইস্ট ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, রাজশাহী সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি ইউনিভার্সিটি, ব্রহ্মপুত্র ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, আর. পি. সাহা ইউনিভার্সিটি, কক্সবাজার ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি ও জার্মান ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশও এখনও অস্থায়ী ক্যাম্পাসে চলেছে তাদের কার্যক্রম।

বন্ধ চার বিশ্ববিদ্যালয়
মালিকানা দ্বন্দ্ব ও স্থায়ী ক্যাম্পাস না থাকায় বন্ধ রেখেছে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন। এর মধ্যে ইউজিসির লাল তালিকায় (তিন তারকা) রয়েছে ইবাইস ইউনিভার্সিটি, দি ইউনিভার্সিটি অব কুমিল্লা ও আমেরিকা বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি। আর কুইন্স বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে দুই তারকা।

স্থায়ী ক্যাম্পাস রয়েছে ৫৪টির
বাংলাদেশের প্রথম বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়। এটি ১৯৯৩ সালে যাত্রা শুরু করে। বর্তমানে দেশে সরকার অনুমোদিত ১১৭টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। এরমধ্যে স্থায়ী ক্যাম্পাসে রয়েছে ৫৪টি বিশ্ববিদ্যালয়ের। গত সপ্তাহে ইউজিসি থেকে প্রকাশিত সর্বশেষ তালিকায় এ তথ্য জানা গেছে। তালিকা দেখুন এখানে।

৩৪টির বয়স এখনও ১২ বছরের বেশি হয়নি
সম্প্রতি ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলায় ইকো ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি নামে দেশের ১১৭তম ও সর্বশেষ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে শিক্ষা মন্ত্রণালয় কর্তৃক অনুমোদন লাভ করে। সবমিলিয়ে ৩৪টি বিশ্ববিদ্যালয়ের বয়স এখনও ১২ বছরের বেশি হয়নি। ফলে তাদের স্থায়ী ক্যাম্পাসে যওয়ার বাধ্যবাধকতা নেই। তবে আগামী দুয়েক বছরের মধ্যে একাধিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বয়স ১২ বছর পার হবে। 

স্থায়ী ক্যাম্পাসে না যাওয়া বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যা বলছে
স্থায়ী ক্যাম্পাসে না যাওয়া একাধিক বিশ্ববিদ্যালয় সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা হয় দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসের। দি মিলেনিয়াম ইউনিভার্সিটির ভাইস চ্যান্সেলর (ভিসি) অধ্যাপক ড. অভিনয় চন্দ্র সাহা বলেন, আমাদের ৫টি বিভাগ রয়েছে বর্তমানে। আরও ৫টি অনুমোদনের জন্য ইউজিসিতে আবেদন করা হয়েছে। রাজধানীর রাজারবাগে এটির ক্যাম্পাস। এখানে স্থায়ী ক্যাম্পাস হবে। কেন স্থায়ী ক্যাম্পাসে যায়নি, সে বিষয়ে তিনি বিস্তারিত বলেননি।

যদিও বিশ্ববিদ্যালয়টির একটি সূত্র বলছে, বিশ্ববিদ্যালয়টি স্থানীয় সরকার পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী ড. আব্দুল মঈন খান পরিবারের। তাদের পারিবারিক খান ফাউন্ডেশন বিশ্ববিদ্যালয়টির জন্য জায়গা দিয়েছে। রাজারবাগেই এটির ক্যাম্পাস হচ্ছে। তবে এখনও পরিপূর্ণভাবে হয়নি।

স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের জনসংযোগ প্রধান প্রদীপ্ত মোবারক জানান, তাদের কিছু ক্লাস স্থায়ী ক্যাম্পাসে হয়। কিছু আবার আগের ক্যাম্পাসে। বাস নিয়ে শিক্ষার্থীদের নিয়ে যাওয়া হয়। ২০২৭ সালে শুরুতে স্থায়ী ক্যাম্পাসে চলে যাবে তারা। বিষয়টি ইউজিসি থেকে অনুমতি নিয়েছে বলে তিনি দাবি করেন।

প্রেসিডেন্সি ইউনিভার্সিটির উপাচার্য অধ্যাপক মো. আবদুল মান্নান চৌধুরী জানান, তারা এখনও অস্থায়ী ক্যাম্পাসে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালন করছেন। রাজধানীর হাতিরঝিলের আশেপাশে স্থায়ী ক্যাম্পাসের জন্য জায়গা খুঁজছেন তারা। পেলে সেখানেই শিফট করবেন।

সোনারগাঁও ইউনিভার্সিটির উপাচার্য অধ্যাপক শামীম আরা হাসান অসুস্থ থাকায় তিনি ছুটিতে আছেন। তবে বিশ্ববিদ্যালয়টির একটি সূত্র বলছে, তারা কিছু ক্লাস স্থায়ী ক্যাম্পাসেও নিচ্ছে। শিগগিরই সেখানে পুরোপুরি শিফট করবে।