অস্ত্র রাখার অভিযোগ দিয়ে মারধর করেছিল সহপাঠীরা, সিজিপিএ-৪ নিয়ে ডিনস অ্যাওয়ার্ড পেলেন সেই ছাত্রদল নেতা
২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় ব্যাগে ধারালো অস্ত্র রাখার অভিযোগে সহপাঠীদের থেকে মারধরের শিকার হয়েছিলেন ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী মো. আজহারুল ইসলাম। সেই ঘটনার প্রায় ১৯ মাস পর একাডেমিক সাফল্যের স্বীকৃতি হিসেবে ডিন’স অ্যাওয়ার্ড পেয়েছেন তিনি। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিবিএর এই শিক্ষার্থী বর্তমানে ড্যাফোডিল বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সক্রিয় নেতা ও আশুলিয়া থানা ছাত্রদলের সহ-সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর) অনুষ্ঠিত ডিন’স অ্যাওয়ার্ড ২০২৬ অনুষ্ঠানে গ্রীষ্মকালীন ২০২৫, শরৎ ২০২৫ ও বসন্ত ২০২৬ সেমিস্টারের একাডেমিক কৃতিত্বের জন্য মোট ৪১৫ শিক্ষার্থীকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। তাদের মধ্যে আজহারুল ইসলামও রয়েছেন।
আজহারুল ইসলামের একাডেমিক পথচলায় আলোচিত ওই ঘটনা ঘটে ২০২৫ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি। সেদিন ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি এলাকায় তার ব্যাগে ধারালো অস্ত্র পাওয়ার অভিযোগ ওঠে। পরে কয়েকজন শিক্ষার্থী তাকে মারধর করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে সোপর্দ করেন। ওই সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর জানিয়েছিলেন, বিষয়টি তদন্তাধীন এবং অপরাধ প্রমাণিত হলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একই ঘটনায় আজহার নিজেকে ফাঁসানোর দাবি করেছিলেন। ড্যাফোডিল ছাত্রদলের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক এহসানুল হক ফেরদৌসও ঘটনাটিকে পরিকল্পিত বলে দাবি করেছিলেন।
ঘটনার প্রায় ১৯ মাস পর বিষয়টি নিয়ে আজহার দাবি করেন, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের তদন্তে তার ব্যাগে অস্ত্র থাকার অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায়নি।
তার ভাষ্য, ‘প্রশাসন আমাকে জিজ্ঞেস করেছিল তাদের (যারা অস্ত্র পাওয়ার অভিযোগে মারধর করেছিলো) দেখলে চিনতে পারবো কিনা। আমি বলেছিলাম প্রধানত যে করেছে তাকে চিনব, পরে আমার চশমা খুলে নেয়া হয়েছিল। প্রশাসন হয়তো ভেবেছিল আমাকে মারধর করা বাকিদের চিনব না, প্রশাসন গড়িমসি করে সব শেষ করে দেয়, বলে মামলা হলেও কোন প্রমাণ পাওয়া যাবে না এবং মামলা চলাকালীন আমাদের এসময় পর্যন্ত স্টুডেন্টশিপ বাতিল থাকবে, এতে আমরাই ক্ষতিগ্রস্থ হবো। কিন্তূ কাছের জিনিস আমি ঠিকঠাক দেখতে পাই, দূরের জিনিস কম দেখলেও।’
ওই ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের বিষয়ে জানতে চাইলে আজহার বলেন, ‘পরবর্তীতে ক্যাম্পাসে কয়েকজনকে শনাক্ত করতে পেরেছিলাম। মিথ্যা দিয়ে সাময়িকভাবে মানুষকে অপদস্ত করা গেলেও, চূড়ান্ত সফলতা কখনো আটকে রাখা সম্ভব নয়।’
জানা যায়, আশুলিয়ার শ্রীখণ্ডিয়া গ্রামের ব্যবসায়ী মফিজ উদ্দীন সিকদার ও শিমুল সুলতানা সিমা দম্পতির দ্বিতীয় সন্তান আজহার। ২০২০ সালে ‘প্রতিভা আইডিয়াল স্কুল’ থেকে জিপিএ ৪.৭৮ নিয়ে এসএসসি এবং ২০২২ সালে ‘মাইলস্টোন কলেজ’ থেকে জিপিএ ৫.০০ (গোল্ডেন প্লাস) পেয়ে এইচএসসি পাস করেন তিনি।
২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারির ওই ঘটনার সময় তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষের দ্বিতীয় সেমিস্টারের শিক্ষার্থী ছিলেন। বর্তমানে তিনি তৃতীয় বর্ষের প্রথম সেমিস্টারে পড়ছেন।
আজহারুল ইসলাম ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির ২৪২ ব্যাচের ফল-২০২৪ সেমিস্টারে বিবিএর ৬৭তম ব্যাচে ভর্তি হন। এখন পর্যন্ত ছয় সেমিস্টারের ফলাফলে তিনি ফল ২০২৪-এ ৩.৯১, স্প্রিং ২০২৫-এ ৩.৮৮, সামার ২০২৫-এ ৪.০০, ফল ২০২৫-এ ৩.৯৬, স্প্রিং ২০২৬-এ ৪.০০ এবং সামার ২০২৬-এ ৪.০০ পেয়েছেন।
ছয় সেমিস্টারের মধ্যে তার সর্বনিম্ন ফলাফল স্প্রিং ২০২৫ সেমিস্টারে ৩.৮৮। ওই সেমিস্টারেই তিনি মারধরের শিকার হয়েছিলেন। তিনটি সেমিস্টারে তিনি পূর্ণ ৪.০০ পেয়েছেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০২৬ সালের ডিন’স অ্যাওয়ার্ডে সামার ২০২৫, ফল ২০২৫ ও স্প্রিং ২০২৬ সেমিস্টারের একাডেমিক কৃতিত্বের জন্য শিক্ষার্থীদের স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। ফলে ওই তিন সেমিস্টারে আজহারের ধারাবাহিক ফলাফলও এবারের একাডেমিক স্বীকৃতির আওতায় এসেছে।
নিজের অর্জন সম্পর্কে আজহার বলেন, ‘Dean’s Award আমার কাছে শুধু একটি পুরস্কার নয়; এটি আমার দীর্ঘদিনের পরিশ্রম, অধ্যবসায় এবং কঠিন সময়েও নিজের লক্ষ্যে অটুট থাকার স্বীকৃতি। নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও পড়াশোনায় মনোযোগ ধরে রেখে এই অর্জন করতে পেরে আমি আনন্দিত ও গর্বিত। যারা আমাকে থামিয়ে দিতে চেয়েছিল, তাদের প্রতি কোনো অভিযোগ নেই। আমার সাফল্যই আমার সবচেয়ে বড় উত্তর।’
আজহারুল ইসলাম বর্তমানে ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি ছাত্রদলের সক্রিয় নেতা ও আশুলিয়া থানা ছাত্রদলের সহ-সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি জানান, ২০২৫ সালের ঘটনার পর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হতে গিয়ে নতুন কোনো বাধার মুখে পড়তে হয়নি। বিশেষ করে ড্যাফোডিল ছাত্রদলের আহ্বায়ক ও তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক এহসানুল হক ফেরদৌস তাকে মানসিকভাবে সহযোগিতা করেছেন বলে জানান তিনি।
রাজনীতি ও পড়াশোনা কীভাবে একসঙ্গে সামলাচ্ছেন—দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসের এমন প্রশ্নের জবাবে আজহার বলেন, ‘ড্যাফোডিল ছাত্রদলের আহ্বায়ক ও তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক এহসানুল হক ফেরদৌস ভাই পড়াশোনার পাশাপাশি সাংগঠনিক কার্যক্রম চালিয়ে যেতে আন্তরিকভাবে সহযোগিতা করছেন। তিনি কখনো কোনো কিছু চাপিয়ে না দিয়ে তরুণদের দেশের ইতিবাচক পরিবর্তনে রাজনীতিতে যুক্ত হওয়ার পরামর্শ দেয়।’
রাজনীতিতে আসার অনুপ্রেরণা প্রসঙ্গে আজহার ঢাকার ১৯ আসনের সংসদ সদস্য ড. দেওয়ান মোহাম্মদ সালাউদ্দিনের কথা উল্লেখ করেন। তার ভাষ্য, বিসিএস ক্যাডার চিকিৎসক হয়েও তিনি সরকারি চাকরি ছেড়ে মানুষের সেবায় নিজেকে নিয়োজিত করেছেন—এই বিষয়টি তাকে রাজনীতিতে আসতে অনুপ্রাণিত করেছে।