১৮ জুলাই ২০২৬, ১০:০৯

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিরোধ দিবস: শিক্ষার্থীদের রাজপথে নামায় নতুন মোড় নেয় আন্দোলন

১৮ জুলাই বিভিন্ন জায়গায় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের আন্দোলন  © টিডিসি সম্পাদিত

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ইতিহাসে ১৮ জুলাই একটি টার্নিং পয়েন্ট। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলগুলো বন্ধ করে দেওয়ার পর যখন আন্দোলনের গতি থমকে যাওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছিল, ঠিক তখনই রাজপথে নেমে আসেন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। তাদের সক্রিয় অংশগ্রহণে সারা দেশে সফলভাবে পালিত হয় ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচি। তবে দিনটি একই সঙ্গে রক্তাক্ত সংঘর্ষেরও সাক্ষী। শিক্ষার্থীদের সঙ্গে পুলিশ ও ছাত্রলীগের সংঘর্ষে সাংবাদিকসহ ২৯ জন নিহত হন এবং আহত হন অন্তত তিন হাজার মানুষ।

১৮ জুলাইয়ের আগেও বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে বেশিরভাগ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা যুক্ত ছিলেন। তবে এদিনই প্রথমবারের মতো বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী সংগঠিতভাবে রাজপথে নামেন। সাধারণত রাজনৈতিক কর্মসূচি থেকে দূরে থাকা এসব শিক্ষার্থী আবু সাঈদ, ওয়াসিমসহ নিহতদের হত্যার বিচার এবং বৈষম্যের অবসানের দাবিতে আন্দোলনে যোগ দেন।

এদিন ঢাকায় শহীদ হন নর্দান ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের শিক্ষার্থী আসিফ হাসান, ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির ইরফান ভূঁইয়া, মানারাত ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির পারভেজ শাকিল, ইসলামিক ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজির জাহিদুজ্জামান তানভীন, ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির আল হামীম সায়মন, সাউথইস্ট ইউনিভার্সিটির রাব্বী মিয়া, ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটির আসিফ ইকবাল এবং সাউথইস্ট ইউনিভার্সিটির ইমতিয়াজ আহমেদ জাবির।

এদিনের সবচেয়ে আলোচিত ঘটনাগুলোর একটি ছিল মিলিটারি ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির (এমআইএসটি) শিক্ষার্থী শাইখ আসহাবুল ইয়ামিনের মৃত্যু। আন্দোলনকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, মিরপুরে পুলিশের রায়ট কার থেকে শিক্ষার্থীদের লক্ষ্য করে গুলি চালানো হলে ইয়ামিন প্রতিরোধের চেষ্টা করেন। তিনি রায়ট কারে উঠে পড়লে সেখানে তাকে গুলি করা হয়। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে গাড়ি থেকে সড়কে ফেলে দেওয়া হয়। পরে হাসপাতালে না নিয়ে কয়েকজন পুলিশ সদস্য তাকে উঁচু সড়ক বিভাজক থেকে নিচে ফেলে দেয় বলে অভিযোগ ওঠে। ঘটনাটি দেশজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে।

একই দিন সরকার জানায়, কোটা পুনর্বহালে হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে করা আপিলের শুনানি ২১ জুলাই অনুষ্ঠিত হবে। অন্যদিকে আওয়ামী লীগের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের অভিযোগ করেন, ‘বিএনপি-জামায়াতের প্রশিক্ষিত ক্যাডার বাহিনী সারাদেশে এই তাণ্ডব চালাচ্ছে। তাদের উস্কানির জন্য সারাদেশে কয়েকজনকে প্রাণ দিতে হয়েছে।’

আরও পড়ুন: ক্যাম্পাসের বাইরে নিয়ে নবীনদের র‍্যাগিং—অজ্ঞান হয়ে পড়েন ছাত্রী, কান্নাকাটি অনেকের

রাজধানীর রামপুরা, নতুনবাজার, প্রগতি সরণি, বাড্ডা ও উত্তরাসহ বিভিন্ন এলাকায় শিক্ষার্থীরা প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। সংঘর্ষের একপর্যায়ে কয়েকজন পুলিশ সদস্য কানাডিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশের ভবনে আশ্রয় নেন। অভিযোগ রয়েছে, ভবনের ভেতর থেকে শিক্ষার্থীদের লক্ষ্য করে সাউন্ড গ্রেনেড ও টিয়ারশেল নিক্ষেপ করা হয়। পরে বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা ভবনটি ঘিরে ফেললে র‌্যাবের একটি হেলিকপ্টারের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাদ থেকে প্রায় ৬০ জন পুলিশ সদস্যকে উদ্ধার করা হয়।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকার সারা দেশে ২২৯ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন করে। তবুও বিভিন্ন স্থানে সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে। যাত্রাবাড়ী, শনির আখড়া ও আজিমপুরে ১০ জন, উত্তরায় ৯ জন, বাড্ডায় ২ জন, ধানমন্ডিতে ১ জন, সাভারে ১ জন, চট্টগ্রামে ২ জন, নরসিংদীতে ২ জন, মাদারীপুরে ১ জন এবং সিলেটে ১ জন নিহত হন। সব মিলিয়ে সাংবাদিকসহ ২৯ জন প্রাণ হারান এবং আহত হন অন্তত তিন হাজার মানুষ।

সংঘাতের মধ্যেই দুপুরে সরকার আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আলোচনার প্রস্তাব দেয়। তবে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে বলেন, ‘শহীদদের রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে কোনো সংলাপ নয়।’

রাতে আওয়ামী লীগ জরুরি সংবাদ সম্মেলন করে। একই দিন রাত ৯টার দিকে সরকার সারা দেশে ইন্টারনেট সেবা বন্ধ করে দেয়। সে সময় তৎকালীন তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনায়েদ আহমেদ পলক বলেন, ‘গুজব ঠেকাতেই মোবাইল ইন্টারনেট বন্ধ করা হয়েছে। আমরা সারাদেশে ইন্টারনেট বন্ধ করিনি, ইন্টারনেট নিজেই বন্ধ হয়ে গিয়েছিল।’

দিনভর সংঘর্ষের রেশ গভীর রাত পর্যন্ত অব্যাহত ছিল। শনির আখড়া, কাজলা, সাইনবোর্ডসহ বিভিন্ন এলাকায় সড়কে আগুন জ্বলতে থাকে। একই সঙ্গে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা অভিভাবকদেরও রাজপথে নেমে পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানান।

জুলাইয়ের ঘটনাপ্রবাহ শুধু একটি দিনের আন্দোলন ছিল না; এটি ছিল আন্দোলনের গতিপথ বদলে দেওয়া একটি ঐতিহাসিক বাঁক। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ব্যাপক অংশগ্রহণ, দেশজুড়ে প্রতিরোধ এবং আত্মত্যাগ আন্দোলনকে নতুন শক্তি ও গতি দেয়। শহীদ আবু সাঈদ, ওয়াসিমসহ অসংখ্য প্রাণের আত্মত্যাগে রক্তাক্ত সেই দিনের ধারাবাহিকতাই পরবর্তী সময়ে গণঅভ্যুত্থানকে আরও বেগবান করে তোলে।

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রশক্তির সাধারণ সম্পাদক যাবের বিন নূর দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ১৮ জুলাই বাংলাদেশের সংগ্রাম ও প্রতিরোধের ইতিহাসে এক স্মরণীয় দিন। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাই আন্দোলনকে এগিয়ে নিয়ে যান এবং তাদের অংশগ্রহণ আন্দোলনের গতিপথ বদলে দেয়।

অভ্যুত্থানের পরও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ঐতিহাসিক ভূমিকা যথাযথ মূল্যায়ন করা হয়নি বলেও জানান তিনি। ১৮ জুলাইয়ের শহীদদের স্মরণ করে তিনি বলেন, অভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তিতে বর্তমান ও অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতি অভিযোগ তুলেই বলছি, প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের এ ঐতিহাসিক অবিস্মরণীয় অবদানকে যথাযথভাবে মুল্যায়িত ও সংরক্ষিত করা হয়নি। শুধুমাত্র অরাজনৈতিক হওয়ার কারনে, এত বোল্ড ও অসামান্য অবদান থাকার পরেও মুখের স্তুতি ছাড়া বিশেষ কোন স্বীকৃতি তাদের দেওয়া হয়নি।

তিনি আরও বলেন, আজকের এই ঐতিহাসিক ১৮ই জুলাইয়ে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ত্রিশোর্ধ্ব শহীদের পাশাপাশি সারাদেশের দেড় হাজার শহীদের আত্মদানকে শ্রদ্ধা ভরে স্মরণ করছি। আমরা যারা এই লড়াইয়ে তাদের রক্তের বিনিময়ে বিজয়ী হয়েছি, সারা জীবন আমরা তাদের রক্তের কাছে ঋণী হয়ে রইবো। এ রক্তের একমাত্র প্রতিদান বাংলাদেশের মানুষকে স্থায়ীভাবে তাদের কাঙ্ক্ষিত মুক্তি এনে দেওয়া, ও রাষ্ট্রের মালিকানা বুঝিয়ে দেওয়া। যারাই আবার এই রাষ্ট্রকে জনগনের থেকে কেড়ে নিতে চাইবে, স্বৈরাচার হতে চাইবে, বিদেশীদের কাছে সার্বভৌমত্ব বিক্রি করতে চাইবে, তাদের বিরুদ্ধে আবারও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা প্রতিরোধ গড়ে তুলবে।