বৈরী আবহাওয়ায় স্থগিত পরীক্ষা, চালু ক্লাস: ভোগান্তিতে শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা
কয়েকদিনের টানা বৃষ্টিতে রাজধানীসহ সাভার-আশুলিয়ার বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা তীব্র আকার ধারণ করেছে। সংকটময় পরিস্থিতিতে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা ও দুর্ভোগের কথা বিবেচনা করে সাভারের গণ বিশ্ববিদ্যালয়ে (গবি) চলতি সেমিস্টার ফাইনাল পরীক্ষা স্থগিত হলেও ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের। একই ভোগান্তিতে পোহাতে হচ্ছে অন্যান্য শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থীদের। ক্লাসে উপস্থিতি ও দায়িত্ব পালনের জন্য প্রতিকূল পরিবেশের মধ্যেও প্রতিদিনই ক্যাম্পাসে যেতে হচ্ছে তাদের।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, শিক্ষার্থীদের দূর্ভোগ ও নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে চলমান জানুয়ারি-জুন সেশনের ১২ থেকে ১৫ তারিখের সেমিস্টার ফাইনালের সকল পরীক্ষা স্থগিতের সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। তবে অন্যান্য সেশনের শিক্ষার্থীদের ক্লাস এখনো চলমান রয়েছে বলে জানা যায়। প্রতিকূল পরিস্থিতিতে শিক্ষক-শিক্ষার্থীসহ সংশ্লিষ্টদের ভোগান্তি নিরসনে এখনো সুনির্দিষ্ট কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি কর্তৃপক্ষ।
এদিকে স্থানীয় শিক্ষার্থীদের বরাতে জানা যায়, সাভার পৌর এলাকা, আশুলিয়ার জামগড়া, ভাদাইল, বাইপাইল, গাজীপুর, মীরপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় প্রায় প্রতি বর্ষাতেই একই ধরনের জলাবদ্ধতা দেখা দেয়। দীর্ঘদিনেও সমস্যার স্থায়ী সমাধান না হওয়ায় দুর্ভোগ বেড়েই চলেছে।
শিক্ষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, জলাবদ্ধতা ও যানজটের কারণে স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় কয়েক গুণ বেশি সময় ব্যয় করে কর্মস্থলে পৌঁছাতে হয়। অনেক এলাকায় পানি পেরিয়ে মূল সড়কে উঠতে হচ্ছে যা। কোথাও কোথাও গণপরিবহণও স্বাভাবিকভাবে চলাচল করছে না।
ভোগান্তি ঠেলে কর্মস্থলে আসার বিষয়ে ফার্মেসি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক তানিয়া আহমেদ তন্বী বলেন, আমার বাসার সামনের রাস্তার সংস্কার কাজ চলমান থাকায় গতকালের অতিবৃষ্টিতে রাস্তা জুড়ে হাঁটু সমান পানি জমেছে। পানি ভেঙে বড় রাস্তায় গিয়ে অনেক কষ্টে একটা রিকশা পেয়েছিলাম। পাকিজা মোড়েও হাঁটু সমান পানি, ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে জায়গায় জায়গায় গর্ত, ২০ মাইলের সামনে হাঁটু অব্দি পানি। গাড়ি রাস্তায় অর্ধেক ডুবে যায়, ইঞ্জিন বন্ধ হয়ে যায় তারপরেও আমাদের যেতে হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে সরকার চাইলে অন্তত দুদিনের জন্যও ওয়ার্ক ফ্রম হোম দিতে পারে। কিন্তু এ বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্তই জানায়নি।
কৃষি অনুষদের প্রভাষক লাবণী ইয়াসমিন বলেন, বৃষ্টির দিনে জলাবদ্ধতার কারণে সকালে ক্যাম্পাসের বাস ধরা ও নিয়মিত যাতায়াত করা আমাদের সবার জন্যই চরম ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাস মিস হয়ে গেলে জলাবদ্ধতার কারণে রাস্তায় কোনো গাড়ি পাওয়ারও উপায় থাকে না। যে যে দিন পরীক্ষা থাকবে না, সেদিনগুলোতে যেন অনলাইনের মাধ্যমে ক্লাস নেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। এতে করে শিক্ষার্থীদের দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ায় পড়াশোনার ক্ষতি যেমন হবে না, তেমনিভাবে ভোগান্তি থেকেও আমরা রেহাই পাবো।
আইন বিভাগের ৮ম সেমিস্টারের শিক্ষার্থী ফাহিম বলেন, আমরা যারা মানিকগঞ্জ থেকে নিয়মিত বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে যাতায়াত করি তাদের প্রতিদিনের যাত্রাপথ এমনিতেই বেশ দীর্ঘ ও ক্লান্তিকর এর মধ্যে বর্ষাকালে সামান্য বৃষ্টি হলেই রাস্তার বিভিন্ন জায়গায় হাঁটু সমান পানি জমে তীব্র জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। নোংরা পানির মধ্য দিয়ে যাতায়াত করতে গিয়ে আমাদের চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয় এবং নানাবিধ স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ে। জলাবদ্ধতার কারণে রাস্তায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা তীব্র যানজট লেগে থাকে, যার ফলে সময়মতো ভার্সিটিতে পৌঁছানো অসম্ভব হয়ে পড়ে।
চলমান পরিস্থিতির বিষয়ে কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (গকসু) সহ-সভাপতি (ভিপি) ইয়াসিন আল মৃদুল দেওয়ান বলেন, বন্যা বা জলাবদ্ধতার কারণে যেসকল শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস করতে আসতে পারবে না, কোর্স টিচারের সাথে কথা বললে ক্লাসগুলো পরবর্তীতে করতে পারবে। এছাড়া শিক্ষার্থীদের সমস্যা বিবেচনা করে চলমান সেমিস্টারের পরীক্ষা স্থগিত করানো হয়েছে।
এবিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার প্রকৌশলী ওহিদ্দুজামান জানান, দেশের বর্তমান বৈরী আবহাওয়া পরিস্থিতি গভীরভাবে পর্যালোচনা করে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা ও সার্বিক স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব প্রদান করে আপাতত চলমান সেমিস্টার ফাইনাল পরিক্ষা ১৫ জুলাই পর্যন্ত স্থগিত করা হয়েছে। ক্লাসের বিষয়ে বিভিন্ন অনুষদের ডিন ও বিভাগীয় প্রধানদের দায়িত্ব দেওয়া আছে। পরিস্থিতি বিবেচনায় উনারা ক্লাস নিবেন কি নিবেন না সেটি বিবেচনা করবেন। তবে সকল শিক্ষক কর্মকর্তা, কর্মচারীদের ক্যাম্পাসে আসার বিষয়ে এখনও কোন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি।
আবহাওয়ার পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী আরও দুই-এক দিন বৃষ্টি অব্যাহত থাকতে পারে। এ অবস্থায় অপ্রয়োজনীয় ঝুঁকিপূর্ণ যাতায়াত এড়িয়ে সাময়িকভাবে 'ওয়ার্ক ফ্রম হোম' চালু করে জরুরি প্রশাসনিক কাজ অনলাইনে পরিচালনা করা সম্ভব হবে কিনা এ-বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আবুল হোসেন জানান, কোনো সরকারি কিংবা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে অফিস বন্ধ রাখার নিয়ম নেই। এখন পর্যন্ত অফিস বন্ধ রাখার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়নি। আমাদের শিক্ষক কর্মকর্তা কর্মচারীদের জন্য গাড়ি আছে, তারা গাড়িতে করে আসবে, তবে বৈরী আবহাওয়ার কারণে কেউ সমস্যায় পড়ে বা আসতে না পারে আমাদের কাছে আবেদন দিবে তা আমরা বিবেচনা করবো।
তিনি আরো বলেন, পরীক্ষা ও ক্লাস দুটি ভিন্ন বিষয়। কেউ যদি ভিজে ভিজে পরীক্ষা দিতে আসে, টানা তিন পরীক্ষা দেওয়া সম্ভব নয়। তাই আমরা পরীক্ষা স্থগিতের বিষয়ে আপাতত সিদ্ধান্ত নিয়েছি। ক্লাসের বিষয়ে শিক্ষার্থীরা তাদের কোর্স টিচারদের সাথে আলোচনা করে ক্লাস স্থগিত করাতে পারে এতে প্রশাসনের কোনো আপত্তি নেই।