১২ জুলাই ২০২৬, ১০:০০

জাতীয় গবেষণা রিপোজিটরি: বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা সংস্কৃতির বিপ্লব ঘটাবে কি?

প্রফেসর আশিক মোসাদ্দিক  © সংগৃহীত

বাংলাদেশের উন্নয়ন শুধু অবকাঠামো ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির উপর নির্ভরশীল নয়, বরং নতুন জ্ঞান সৃষ্টি, সংরক্ষণ ও তার কার্যকর প্রয়োগের উপর নির্ভর করে। একবিংশ শতাব্দীতে জ্ঞানই সর্বোচ্চ মূল্যবান সম্পদ এবং গবেষণা তার প্রধান উৎস। গত দুই দশকে দেশে উচ্চশিক্ষার ব্যাপক সম্প্রসারণ ঘটেছে। সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে এবং গবেষণা প্রকাশনার সংখ্যাও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। তথাপি, একটি মৌলিক প্রশ্ন বারবার উঠে আসে: এসব গবেষণার ফলাফল জাতীয় উন্নয়ন, উদ্ভাবন ও জনকল্যাণে কতটুকু ব্যবহৃত হচ্ছে?

বর্তমান সমস্যা ও চ্যালেঞ্জসমূহ:
বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বর্তমানে বেশ কয়েকটি গুরুতর সমস্যা বিদ্যমান। প্রথমত, গবেষণা প্রায়শই বিচ্ছিন্ন ও অসমন্বিত। থিসিস গ্রন্থাগারের তাকে সীমাবদ্ধ, প্রকল্প প্রতিবেদন দপ্তরের ফাইলে আটকে থাকে এবং অনেক প্রকাশিত নিবন্ধ সহজে খুঁজে পাওয়া যায় না। ফলে একই বিষয়ে বারবার গবেষণা হয়, সরকারি অর্থের অপচয় ঘটে এবং জ্ঞানের প্রয়োগ ব্যাহত হয়। দ্বিতীয়ত, অর্থায়নের অপ্রতুলতা ও অসম বণ্টন। সাম্প্রতিক তথ্য অনুসারে, গবেষণা বরাদ্দ প্রতি শিক্ষকের জন্য খুবই সীমিত, যা টেকসই গবেষণার জন্য অপর্যাপ্ত। তৃতীয়ত, শিল্প-একাডেমিয়া সহযোগিতার অভাব, আধুনিক অবকাঠামোর ঘাটতি, ব্রেইন ড্রেন এবং রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বিশেষ করে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে। চতুর্থত, আন্তর্জাতিক দৃশ্যমানতার অভাবের কারণে উদ্ধৃতি কম এবং বিদেশি অনুদানের সুযোগ সীমিত।

পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়: 

তুলনামূলক বিশ্লেষণ:
পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়সমূহের সুবিধা:সরকারি অর্থায়ন, বৃহত্তর অবকাঠামো, প্রতিষ্ঠিত খ্যাতি এবং বড় আকারের শিক্ষক-শিক্ষার্থী সম্প্রদায়। এগুলো জাতীয় গবেষণা এজেন্ডা (কৃষি, স্বাস্থ্য, জলবায়ু) বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

সীমাবদ্ধতা: 
আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, রাজনৈতিক প্রভাব, ধীরগতির সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং আধুনিক ল্যাব-লাইব্রেরির অভাব। ফলে গবেষণার গতি ও মান উভয়ই প্রভাবিত হয়।

প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়সমূহের সুবিধা: 
নমনীয়তা, আধুনিক সুবিধা, শিল্পের সাথে দ্রুত যোগাযোগ এবং বাজার-চাহিদাভিত্তিক প্রোগ্রাম। কিছু প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় (যেমন নর্থ সাউথ, BRAC) ইতোমধ্যে উচ্চ গবেষণা তীব্রতা দেখিয়েছে।

সীমাবদ্ধতা:
লাভমুখী দৃষ্টিভঙ্গি, টিউশন ফি-নির্ভরতা, গবেষণায় কম বিনিয়োগ এবং মৌলিক গবেষণার পরিবর্তে প্রয়োগমুখী কাজের প্রাধান্য। ফলে জাতীয় প্রয়োজনের সাথে সামঞ্জস্য কম।এই বৈষম্যের ফলে জাতীয় গবেষণা ব্যবস্থা খণ্ডিত হয়ে পড়েছে।

জাতীয় গবেষণা রিপোজিটরির ভূমিকা ও UGC-এর কৌশল:
বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (UGC)-এর “জাতীয় গবেষণা রিপোজিটরি” প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় যুগান্তকারী পদক্ষেপ। এটি শুধু ডিজিটাল আর্কাইভ নয়, বরং গবেষণা ব্যবস্থাপনার ডিজিটাল মেরুদণ্ড। এর মাধ্যমে গবেষকরা বিদ্যমান জ্ঞান সহজে পর্যালোচনা করে নতুন কাজ শুরু করতে পারবেন, যা পুনরাবৃত্তি কমাবে এবং মৌলিকত্ব বাড়াবে।

UGC- এর করনীয় রূপরেখা:
- আন্তঃসংযোগ ও সমতা:পাবলিক ও প্রাইভেট উভয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউশনাল রিপোজিটরির সাথে আন্তঃসংযোগ (Interoperability) নিশ্চিত করে একটি জাতীয় নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা। এতে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলো জাতীয় এজেন্ডায় যুক্ত হবে এবং পাবলিকগুলো আধুনিকতা লাভ করবে।

- নীতি ও বাধ্যবাধকতা: সকল UGC-অর্থায়িত প্রকল্প, থিসিস ও প্রকাশনা জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক করা। গবেষণা অবদানকে পদোন্নতি, অনুদান ও পুরস্কারের সাথে যুক্ত করা।

- মান নিয়ন্ত্রণ: আন্তর্জাতিক মানের মেটাডেটা, DOI, ORCID, প্লেজিয়ারিজম চেক এবং ওপেন অ্যাক্সেস নীতি বাস্তবায়ন। প্রোগ্রাম অ্যাক্রেডিটেশনের সাথে যুক্ত করে মান উন্নয়ন।

- অর্থায়ন ও সক্ষমতা বৃদ্ধি:সমান বণ্টনের পরিবর্তে প্রতিযোগিতামূলক গ্রান্ট, MRes/PhD পার্টনারশিপ এবং আন্তর্জাতিক স্যান্ডউইচ প্রোগ্রাম চালু। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমিয়ে গবেষণা সময় বৃদ্ধি এবং প্রাইভেটগুলোতে ট্যাক্স ইনসেনটিভ দিয়ে গবেষণা বিনিয়োগ উৎসাহিত করা।

- শিল্প-সমাজ সংযোগ:রিপোজিটরিতে ডেটা শেয়ারিং, টেকনোলজি ট্রান্সফার অফিস এবং এসডিজি-সম্পর্কিত ড্যাশবোর্ড তৈরি।

- জাতীয় র‍্যাঙ্কিং ও অ্যাক্রেডিটেশন: প্রতি তিন বছর অন্তর জাতীয় র‍্যাঙ্কিং চালু করে গবেষণা আউটপুট, উদ্ধৃতি, সহযোগিতা ও সমাজীয় প্রভাবকে ওজন দেওয়া। নিম্নমানের বিশ্ববিদ্যালয়কে বিশেষ তত্ত্বাবধানে আনা।

ভারতের Shodhganga-এর মতো এই রিপোজিটরি হাজার হাজার থিসিসকে দৃশ্যমান করতে পারে, যা আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও ফান্ডিং বাড়াবে। মালয়েশিয়ার মতো কয়েকটি গবেষণা-নিবিড় বিশ্ববিদ্যালয়কে বিশেষ বিনিয়োগ দিয়ে গ্লোবাল টপ ৫০০-এ নিয়ে যাওয়া সম্ভব।

UGC-কে নেতৃত্ব দিয়ে একটি জাতীয় গবেষণা নীতি প্রণয়ন করতে হবে যাতে গবেষণাকে শুধু একাডেমিক অনুশীলন নয়, বরং জাতীয় উন্নয়নের চালিকাশক্তি হিসেবে দেখা হয়। ওয়ার্কশপ, মেন্টরশিপ, ইনোভেশন হাব এবং সাফল্যের গল্প প্রচারের মাধ্যমে গবেষকদের মধ্যে সৃজনশীল সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। আন্ডারগ্র্যাজুয়েট পর্যায় থেকে গবেষণায় সম্পৃক্ত করে নতুন প্রজন্মকে প্রস্তুত করা।

জাতীয় গবেষণা রিপোজিটরি সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে পাবলিক-প্রাইভেট বৈষম্য হ্রাস পাবে, গবেষণার মান উন্নত হবে, বিশ্ববিদ্যালয় র‍্যাঙ্কিং উন্নীত হবে এবং জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি গড়ে উঠবে। UGC-এর এই উদ্যোগ প্রশংসনীয়। তবে বাস্তবায়নে রাজনৈতিক অঙ্গীকার, পর্যাপ্ত বাজেট ও সকল অংশীজনের অংশগ্রহণ অপরিহার্য। জ্ঞানসম্পদকে জাতীয় সম্পদে পরিণত করতে পারলে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মই হবে এর সবচেয়ে বড় লাভভোগী।

লেখক: প্রফেসর আশিক মোসাদ্দিক, উপ-উপাচার্য, ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটি