০৯ জুলাই ২০২৬, ১৯:৫২

এনএসইউতে জলবায়ু শরণার্থী, আইনের পরিভাষা এবং এর অন্তর্নিহিত গুরুত্ব শীর্ষক ওয়েবিনার

ওয়েবিনার  © সৌজন্যে প্রাপ্ত

নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির (এনএসইউ) মানবিক ও সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদ (এসএইচএসএস) ‘জলবায়ু শরণার্থী, আইনের পরিভাষা এবং এর অন্তর্নিহিত গুরুত্ব’ শীর্ষক একটি ওয়েবিনারের আয়োজন করেছে।  গত ৭ জুলাই অনুষ্ঠিত এ ওয়েবিনারে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাস্তুচ্যুত মানুষের আইনি স্বীকৃতি, ‘জলবায়ু শরণার্থী’ পরিভাষার ব্যবহার এবং আন্তর্জাতিক আইন ও নীতিনির্ধারণে এর গুরুত্ব নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়।

এনএসইউ এসএইচএসএস এর ‘ডিস্টিংগুইশড ওয়েবিনার সিরিজ’এর অংশ হিসেবে আয়োজিত এ ওয়েবিনারে জলবায়ু পরিবর্তন, অভিবাসন এবং আন্তর্জাতিক আইনের পারস্পরিক সম্পর্ক ও এর বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা হয়। এতে অনুষদ সদস্য, শিক্ষার্থী, আইনজীবী, গবেষকসহ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে আগ্রহী বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের উল্লেখযোগ্য অংশগ্রহণ ছিল।

ওয়েবিনারে অতিথি বক্তা হিসেবে উপস্থিত ছিলেন যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব ওয়ারউইক-এর সহযোগী অধ্যাপক ড. সাইমন বেহরম্যান। শরণার্থী আইনের বিদগ্ধ পণ্ডিত হিসেবে পরিচিত ড. বেহরম্যান আইন, জলবায়ু বিপর্যয় ও মানুষের স্থানান্তর প্রক্রিয়ার পারস্পরিক সম্পর্ক নিয়ে গবেষণা করেছেন। 

তার উপস্থাপনায় তিনি জলবায়ু শরণার্থী শব্দটিকে ঘিরে আন্তর্জাতিক আইনের পরিভাষা ও ভাষাতাত্ত্বিক জটিলতার রূপরেখা তুলে ধরেন। আনুষ্ঠানিক আইনি দলিলগুলোতে এই শব্দটির স্বীকৃতি না থাকা সত্ত্বেও, জলবায়ুজনিত দুর্যোগের কারণে বাস্তুচ্যুত ব্যক্তিদের জন্য সুরক্ষার পরিধি এবং জরুরি প্রয়োজনীয়তা নির্ধারণের ক্ষেত্রে এই ‘লেবেল’ বা সংজ্ঞা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হিসেবে কাজ করে বলে তিনি মতপ্রকাশ করেন।

মূল বক্তব্যে ড. বেহরম্যান পরিসংখ্যান তুলে ধরে জানান, ২০১৬ সাল থেকে এযাবৎকাল পর্যন্ত বৈরী আবহাওয়া ও জলবায়ুর পরিবর্তনজনিত কারণে প্রায় ২৫ কোটি মানুষ ঘরবাড়ি হারিয়েছে, যার বার্ষিক গড় দাঁড়ায় আড়াই কোটির কাছাকাছি। সাম্প্রতিক ইতিহাসে এই প্রথমবারের মতো প্রাকৃতিক কারণে বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা সশস্ত্র সংঘাতের ফলে ঘরছাড়া মানুষের সংখ্যাকে ছাড়িয়ে গেছে। 

তিনি বাস্তবতার নিরিখে উল্লেখ করেন, ১৯৫১ সালের আন্তর্জাতিক শরণার্থী কনভেনশনের পরিধি বাড়িয়ে জলবায়ু শরণার্থীদের সেখানে অন্তর্ভুক্ত করার সম্ভাবনা হয়তো ক্ষীণ, তবে ফরাসি ভাষার মূল শব্দ (যার সরল অর্থ বিপদ থেকে আত্মরক্ষা) থেকে অনুপ্রাণিত এই পরিভাষাটি জলবায়ু সংকটের প্রেক্ষাপটে সর্বাংশে যথার্থ। 

তিনি যুক্তি দেন, ‘নামকরণ’ বা পরিভাষা সংক্রান্ত বিতর্কটি কোনো বিভ্রান্তি নয়, বরং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও অনিবার্য একটি প্রশ্ন; কারণ ‘অভিবাসী’ বা ‘বাস্তুচ্যুত ব্যক্তি’ শব্দের বিপরীতে "শরণার্থী"-র মতো শব্দগুলো আইনি অধিকার এবং সুরক্ষার সাথে সংশ্লিষ্ট। 

তিনি আরও উল্লেখ করেন, এই শব্দটির বিরুদ্ধে রাজনৈতিক প্রতিরোধ, বিশেষত জাতিসংঘের জলবায়ু আলোচনায় বৈশ্বিক উত্তরের (Global North) দেশগুলোর আপত্তির কারণে এই শব্দের পরিবর্তে পরিকল্পিতভাবে ‘জলবায়ু পরিবর্তনজনিত বাস্তুচ্যুতি, অভিবাসন এবং পরিকল্পিত পুনর্বাসন’-এর মতো অস্পষ্ট শব্দগুচ্ছ ব্যবহার করা হচ্ছে, যা ক্ষতিগ্রস্তদের আইনের সুরক্ষার পথে অন্তরায় হতে পারে।

নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির মানবিক ও সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন এবং আইনের অধ্যাপক মোঃ রিজওয়ানুল ইসলাম অনুষ্ঠানের সূচনা বক্তব্য প্রদান করেন। আন্তর্জাতিক শরণার্থী ব্যবস্থা ইতিমধ্যে চাপের মধ্যে রয়েছে উল্লেখ করে তিনি আলোচনার সূত্রপাত করেন। জলবায়ু পরিবর্তনজনিত শরণার্থীদের ক্ষেত্রে ১৯৫১ সালের কনভেনশন সম্প্রসারণের ব্যবহারিক উপযোগিতা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করলেও অধ্যাপক রিজওয়ান এই বিতর্কের গুরুত্ব ও প্রাসঙ্গিকতাকে স্বীকার করেন এবং এধরনের আলোচনাকে উৎসাহিত করেন। ওয়েবিনারটি সঞ্চালনা করেন নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির আইন বিভাগের জ্যেষ্ঠ প্রভাষক মোঃ লোকমান হোসেন।

পরিশেষে, একটি প্রাণবন্ত প্রশ্নোত্তর পর্বে ড. বেহরম্যান শ্রোতাদের বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর দেন এবং তাদের সাথে আলোচনায় সম্পৃক্ত হন। ‘ডিস্টিংগুইশড ওয়েবিনার সিরিজ’ হলো এনএসইউ এসএইচএসএস-এর অন্যতম প্রধান একাডেমিক উদ্যোগ। আয়োজকদের লক্ষ্য হলো এ ধরনের কর্মসূচির মাধ্যমে শিক্ষক, শিক্ষার্থী, গবেষক, এবং পেশাজীবীদের মাঝে অধিকতর অর্থবহ একাডেমিক সংলাপ ও সম্পৃক্ততা বৃদ্ধি করা।