তিন দশকের পথচলায় বৈশ্বিক দিগন্তে ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিক
ছোট পরিসরে শুরু হয়েছিল যাত্রা। ১৯৯৬ সালে প্রতিষ্ঠার সময় ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিক (ইউএপি) ছিল এক উদীয়মান বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, আর সামনে ছিল সম্ভাবনা, আর সঙ্গে ছিল নিজেদের আলাদা করে তুলে ধরার চ্যালেঞ্জ। প্রায় তিন দশক পর সেই প্রতিষ্ঠানই আজ আন্তর্জাতিক একাডেমিক সংযোগ, যৌথ গবেষণা ও বৈশ্বিক অংশীদারত্বের মাধ্যমে নিজেদের উপস্থিতি বিস্তৃত করেছে।
শুধু শ্রেণিকক্ষের পাঠদানেই সীমাবদ্ধ না থেকে ইউএপি ধীরে ধীরে নিজেদের বিস্তৃত করেছে বৈশ্বিক জ্ঞান বিনিময়ের পরিসরে। জাপান, যুক্তরাষ্ট্র, মালয়েশিয়া, চীন কিংবা ইউরোপের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে অংশীদারত্ব গড়ে তুলে বিশ্ববিদ্যালয়টি উচ্চশিক্ষাকে নিয়ে যেতে চেয়েছে আন্তর্জাতিক মঞ্চে। ফলে ইউএপির শিক্ষার্থীদের সামনে খুলে যাচ্ছে নতুন নতুন সম্ভাবনার দরজা। শিক্ষার্থী বিনিময় কর্মসূচি, যৌথ গবেষণা, আন্তর্জাতিক সম্মেলনে অংশগ্রহণ, একাডেমিক সহযোগিতা, এমনকি শিল্পখাতের সঙ্গে বাস্তবভিত্তিক সংযোগের সুযোগও বাড়ছে ক্রমাগত।
এই আন্তর্জাতিক সংযোগের ভেতর দিয়ে ইউএপি কেবল একটি বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবেই নয়, বরং একটি ‘গ্লোবাল লার্নিং স্পেস’ হিসেবে নিজেদের গড়ে তোলার চেষ্টা করছে। যেখানে একজন শিক্ষার্থী শুধু পাঠ্যবইয়ের জ্ঞানেই সীমাবদ্ধ থাকেন না; বরং বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের শিক্ষা-গবেষণা, প্রযুক্তি, উদ্ভাবন ও পেশাগত বাস্তবতার সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পান। বিশ্ববিদ্যালয়টির এই যাত্রা তাই কেবল অবকাঠামো বা একাডেমিক সম্প্রসারণের গল্প নয়, এটি এক ধরনের রূপান্তরের গল্প— স্থানীয় পরিসর থেকে বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে উঠে আসার গল্প।
গল্পটা শুরু হয়েছিল মাত্র ৩ জন শিক্ষার্থী নিয়ে। বর্তমানে রাজধানীর ফার্মগেটে বিশ্ববিদ্যালয়টির দৃষ্টিনন্দন স্থায়ী ক্যাম্পাস। সাতটি অনুষদ ও ২১ টি বিভাগে বর্তমানে শিক্ষার্থী সংখ্যা প্রায় ৮ হাজার। পূর্ণকালীন ও খণ্ডকালীন মিলিয়ে শিক্ষক সংখ্যা ২৫০ জনেরও বেশি। আটটি আন্ডারগ্র্যাজুয়েট ও ১০টি পোস্টগ্র্যাজুয়েট প্রোগ্রাম চালু রয়েছে। যুক্তরাজ্যভিত্তিক শিক্ষা ও গবেষণা সংস্থা কোয়াককোয়ারেলি সায়মন্ডস (কিউএস) ‘এশিয়া ইউনিভার্সিটি র্যাংকিং ২০২৬’ -এ ইউএপি’র অবস্থান ৯০১ থেকে ৯৫০। বাংলাদেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে এটি উল্লেখযোগ্য অবস্থান।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য রয়েছে নানা সুযোগ-সুবিধা। ঢাকার প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত ক্যাম্পাসে রয়েছে আধুনিক সুযোগ-সুবিধা সমন্বিত মিলনায়তন, ৬০টির অধিক ক্লাসরুম, ৫২টির বেশি আধুনিক গবেষণাগার, নান্দনিক কেন্দ্রীয় পাঠাগার, মেডিকেল সার্ভিস, আধুনিক ক্যাফেটেরিয়া, কাউন্সেলিং সেন্টার, ইনডোর গেমস রুমসহ সেন্ট্রাল ক্লাব রয়েছে ১৫টি।
ক্লাসরুম থেকেই বৈশ্বিক স্বপ্নের পথে
আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষা, গবেষণা ও একাডেমিক সহযোগিতা সম্প্রসারণে কাজ করছে ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিকের (ইউএপি) ‘অফিস অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যাফেয়ার্স’। বিদেশে উচ্চশিক্ষা, যৌথ গবেষণা এবং ক্রেডিট ট্রান্সফারের সুযোগ তৈরি করতে ইউএপি এশিয়া, ইউরোপ ও আমেরিকার বিভিন্ন খ্যাতনামা বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে একাধিক একাডেমিক চুক্তি সম্পন্ন করেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ‘ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি’ ও ‘ক্যালিফোর্নিয়া ব্যাপ্টিস্ট ইউনিভার্সিটির সঙ্গে ইউএপির একাডেমিক সহযোগিতা কার্যক্রম চালু রয়েছে। এছাড়া জাপানের ‘পোর্ট অ্যান্ড এয়ারপোর্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউট’-এর সঙ্গে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের গবেষণা চুক্তির ফলে শিক্ষার্থীরা কংক্রিট প্রযুক্তি ও স্ট্রাকচারাল ডিউরেবিলিটি বিষয়ে গবেষণার সুযোগ পাচ্ছে।
জাপানের কানাজাওয়া ইউনিভার্সিটির সঙ্গে ইউএপির ফার্মেসি এবং কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের গবেষণা সহযোগিতাও সক্রিয় রয়েছে। এর আওতায় ফার্মেসি বিভাগের পাঁচ বছর মেয়াদি একটি যৌথ গবেষণা সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে।
গল্পটা শুরু হয়েছিল মাত্র ৩ জন শিক্ষার্থী নিয়ে। বর্তমানে রাজধানীর ফার্মগেটে বিশ্ববিদ্যালয়টির দৃষ্টিনন্দন স্থায়ী ক্যাম্পাস। সাতটি অনুষদ ও ২১ টি বিভাগে বর্তমানে শিক্ষার্থী সংখ্যা প্রায় ৮ হাজার।
রাশিয়ার ‘সাউথওয়েস্ট স্টেট ইউনিভার্সিটি’ এবং তুরস্কের ‘ওন্দোকুজ মেয়িস ইউনিভার্সিটি’র সঙ্গে ইউএপির একাডেমিক ও বৈজ্ঞানিক সহযোগিতা চুক্তি রয়েছে। মানবাধিকার ও বিচারবিষয়ক গবেষণায় সুইজারল্যান্ডভিত্তিক ‘ইন্টারন্যাশনাল ব্রিজেস টু জাস্টিস’-এর সঙ্গে আইন বিভাগের বিশেষ সমঝোতা স্মারক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
জার্মানির কারিগরি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান ওটিএইচ-এর সঙ্গে যৌথ গবেষণা, আন্তর্জাতিক কনফারেন্স আয়োজন এবং উইন্টার স্কুল কর্মসূচির উদ্যোগ নিয়েছে ইউএপি। এর মাধ্যমে ইউএপি বিজনেস স্কুলের শিক্ষার্থীরা আন্তর্জাতিক একাডেমিক কার্যক্রমে অংশগ্রহণের সুযোগ পাচ্ছে।
চীনের সিয়াস ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, শিয়ান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি এবং হুনান ইউনিভার্সিটি অব হিউম্যানিটিজ সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির সঙ্গে ইউএপির একাডেমিক সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। পাশাপাশি মালয়েশিয়ার ইউনিভার্সিটি টেকনোলজি মারা (UiTM)-এর সঙ্গে গবেষণা সহযোগিতা এবং ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজি সারাওয়াক ও ইন্দোনেশিয়ার ইউনিভার্সিটাস সুমাতেরা উতারার সঙ্গে সম্প্রতি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে।
আন্তর্জাতিক সহযোগিতার পাশাপাশি দেশীয় পর্যায়েও একাডেমিক নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ করেছে ইউএপি। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট)-এর সঙ্গে মাইলফলক এমওইউ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে গবেষণা সহযোগিতা যৌথ গবেষণা ও রিসোর্স শেয়ারিংয়ে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে। এছাড়া বরেন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয় ও বাংলাদেশ পুলিশ স্টাফ কলেজের সঙ্গেও ইউএপির একাডেমিক সহযোগিতা রয়েছে।
বাংলাদেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে ইউএপিই প্রথম চার বছর মেয়াদি বি. ফার্ম (অনার্স) প্রোগ্রাম চালু করে। এছাড়া থিসিস ও প্রজেক্ট উভয় গ্রুপ সমন্বয়ে মাস্টার অব ফার্মেসি ইন ফার্মাসিউটিক্যাল টেকনোলজি প্রোগ্রাম চালুর ক্ষেত্রেও পথিকৃৎ এই বিভাগ।
ইন্ডাস্ট্রি-একাডেমিয়া কোলাবোরেশনের অংশ হিসেবে বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিলের সঙ্গে আইটি প্রশিক্ষণ কার্যক্রম এবং ওয়ালটন হাই-টেক ইন্ডাস্ট্রিজের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের ইন্ডাস্ট্রিয়াল ভিজিট ও ইন্টার্নশিপ পরিচালিত হচ্ছে। পাশাপাশি মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও গবেষণা কার্যক্রমকে সমৃদ্ধ করতে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের সঙ্গেও ইউএপির বিশেষ সমঝোতা চুক্তি রয়েছে।
দেশের অন্যতম প্রাচীন ফার্মেসি বিভাগ
বিশ্বজুড়ে পেশাভিত্তিক শিক্ষার ক্ষেত্রে ফার্মেসির জনপ্রিয়তা দিন দিন বাড়ছে। দক্ষ ফার্মাসিস্ট, গবেষক ও একাডেমিক তৈরি করার লক্ষ্য নিয়ে ১৯৯৬ সালে ইউএপি প্রতিষ্ঠা করে তাদের ফার্মেসি বিভাগ, যা বর্তমানে দেশের তৃতীয় প্রাচীনতম ফার্মেসি বিভাগ হিসেবে পরিচিত। বর্তমানে বিভাগটিতে ইউজিসি ও ফার্মেসি কাউন্সিল অব বাংলাদেশ অনুমোদিত তিনটি ডিগ্রি প্রোগ্রাম চালু রয়েছে। এগুলো হলো, ব্যাচেলর অব ফার্মেসি, মাস্টার অব ফার্মেসি ইন ফার্মাসিউটিক্যাল টেকনোলজি এবং মাস্টার অব ফার্মেসি ইন ক্লিনিক্যাল ফার্মেসি অ্যান্ড ফার্মাকোলজি।
বাংলাদেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে ইউএপিই প্রথম চার বছর মেয়াদি বি. ফার্ম (অনার্স) প্রোগ্রাম চালু করে। এছাড়া থিসিস ও প্রজেক্ট উভয় গ্রুপ সমন্বয়ে মাস্টার অব ফার্মেসি ইন ফার্মাসিউটিক্যাল টেকনোলজি প্রোগ্রাম চালুর ক্ষেত্রেও পথিকৃৎ এই বিভাগ।
এ পর্যন্ত বিভাগটি অসংখ্য দক্ষ ও মেধাবী গ্র্যাজুয়েট তৈরি করেছে, যারা দেশের শীর্ষস্থানীয় ফার্মাসিউটিক্যাল শিল্প, গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং আন্তর্জাতিক একাডেমিক অঙ্গনে সফলতার সঙ্গে কাজ করছেন। শিক্ষার্থীদের যুগোপযোগী করে গড়ে তুলতে বিভাগটি নিয়মিত আধুনিক ও সমসাময়িক পাঠ্যক্রম অনুসরণ করছে। পাশাপাশি উদ্ভাবনী গবেষণা, ব্যবহারিক অভিজ্ঞতা এবং কৌশলগত একাডেমিক সম্পর্কের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের পেশাজীবী, গবেষক ও শিক্ষক হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বছরে ১৫ কোটি টাকার শিক্ষা বৃত্তি
মেধাবী ও সুবিধাবঞ্চিত শিক্ষার্থীদের জন্য উদার বৃত্তি কার্যক্রম পরিচালনা করছে ইউএপি। ইউজিসির নির্দেশনা অনুযায়ী, ৬ শতাংশ শিক্ষার্থীর জন্য বিনামূল্যে পড়াশোনার সুযোগ থাকার কথা থাকলেও বিশ্ববিদ্যালয়টি মোট শিক্ষার্থীর প্রায় ১০ থেকে ১২ শতাংশকে টিউশন ফি মওকুফ সুবিধা দিয়ে থাকে।
সেমিস্টার ফলাফলের ভিত্তিতে মেধাবী শিক্ষার্থীরা শতভাগ পর্যন্ত টিউশন ফি ছাড় পেয়ে থাকে। এছাড়া মুক্তিযোদ্ধা কোটার বৃত্তি, ভিসি স্পেশাল ওয়েভার, দুর্গম ও অনুন্নত এলাকার শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ বৃত্তিসহ মোট আট ধরনের শিক্ষাবৃত্তি চালু রয়েছে। প্রতিবছর বিশ্ববিদ্যালয়টি প্রায় ১৫ কোটি টাকারও বেশি শিক্ষাবৃত্তি প্রদান করে।
কো-কারিকুলার কার্যক্রমে সমান গুরুত্ব
শুধু পাঠ্যক্রমভিত্তিক শিক্ষাই নয়, শিক্ষার্থীদের সৃজনশীলতা ও নেতৃত্ব বিকাশেও গুরুত্ব দেয় ইউএপি। এজন্য শ্রেণিকক্ষের পাঠদানের পাশাপাশি বিভিন্ন কো-কারিকুলার কার্যক্রমে অংশগ্রহণে শিক্ষার্থীদের উৎসাহিত করা হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ক্লাবগুলোর পাশাপাশি ফার্মেসি বিভাগেও রয়েছে বিভিন্ন সক্রিয় ক্লাব। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো: ফার্মা সায়েন্স ক্লাব, ফার্মেসি ডিবেটিং অ্যান্ড কুইজ ক্লাব, সোশ্যাল অ্যাওয়ারনেস ক্লাব, কালচারাল ক্লাব, স্পোর্টস ক্লাব, ফটোগ্রাফি ক্লাব এবং এন্ট্রাপ্রেনিউরশিপ অ্যান্ড ক্যারিয়ার ডেভেলপমেন্ট ক্লাব।