১৭ জুন ২০২৬, ২২:৫৯

এনএসইউতে ‘রাজনীতিতে অর্থ: বাংলাদেশে দলীয় অর্থায়ন ও জবাবদিহিতা’ শীর্ষক সেমিনার অনুষ্ঠিত

সেমিনারে অংশ নেওয়া অতিথিরা  © সংগৃহীত

নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (এনএসইউ) ইতিহাস ও দর্শন বিভাগ (ডিএইচপি) এবং রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও সমাজবিজ্ঞান বিভাগের (পিএসএস) যৌথ উদ্যোগে ‘রাজনীতিতে অর্থ: বাংলাদেশে দলীয় অর্থায়ন ও জবাবদিহিতা’ শীর্ষক একটি সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়। 

বুধবার (১৭ জুন) বিকেল ৩টায় এ সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়।

সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন যুক্তরাজ্যের নটিংহাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের সহযোগী অধ্যাপক ড. ফার্নান্দো কাসাল বার্তোয়া। প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার। স্বাগত বক্তব্য দেন স্কুল অব হিউম্যানিটিজ অ্যান্ড সোশ্যাল সায়েন্সেস-এর অধ্যাপক ও ডিন ড. মো. রিজওয়ানুল ইসলাম। 

সেমিনার সঞ্চালনা করেন ইতিহাস ও দর্শন বিভাগের অধ্যাপক ও চেয়ারম্যান ড. মাহবুবুর রহমান এবং ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও সমাজবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ও চেয়ারম্যান ড. রিজওয়ান খায়ের।

সেমিনারের শুরুতে ড. মাহবুবুর রহমান বিষয়টির তাৎপর্য তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ‘রাজনীতিতে অর্থের প্রভাব কেবল নেতিবাচকই নয়, এটি রাষ্ট্রীয় শাসনব্যবস্থার মূলে আঘাত করতে সক্ষম। রাজনীতিতে অর্থের প্রভাব রয়েছে এবং সেই প্রভাব অত্যন্ত ক্ষতিকর হতে পারে। বর্তমান সংসদ সদস্যদের মধ্যে অনেকের ঋণের পরিমাণ হাজার হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা কীভাবে স্বার্থদ্বন্দ্ব থেকে নিজেদের দূরে রাখবেন এই প্রশ্নের সৎ উত্তর খোঁজা এখন বাংলাদেশের জন্য অপরিহার্য।’

তিনি আরও উল্লেখ করেন যে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনেও প্রার্থীরা কোটি কোটি টাকা ব্যয় করছেন, যা প্রমাণ করে যে অর্থের দাপট কেবল জাতীয় রাজনীতিতে নয়, স্থানীয় পর্যায়েও সমানভাবে বিদ্যমান।

ডিন ড. রিজওয়ানুল ইসলাম সেমিনারের বিশেষজ্ঞ প্যানেলের প্রশংসা করে বলেন, প্রধান অতিথি দীর্ঘদিন ধরে এই বিষয়ে কাজ করছেন এবং এর চেয়ে অভিজ্ঞ ও প্রাসঙ্গিক আলোচক প্যানেল গঠন করা কঠিন হতো।

ড. ফার্নান্দো কাসাল বার্তোয়া রাজনৈতিক দলের নিয়ন্ত্রণ বিষয়ক একটি গ্রন্থের সহলেখক হিসেবে অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেসে প্রকাশিতব্য কাজ করছেন এবং ওএসসিইর রাজনৈতিক দল বিষয়ক কোর গ্রুপের সদস্য হিসেবে কাজ করেন। তিনি বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক সংকটের তিনটি মূল কারণ চিহ্নিত করেন: ব্যাপক দুর্নীতি, দুর্বল দলীয় প্রাতিষ্ঠানিকতা এবং সংসদে নারীর অপ্রতুল প্রতিনিধিত্ব।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের তথ্য উদ্ধৃত করে তিনি বলেন, বৈশ্বিক দুর্নীতি সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান ১৫১তম যা দেশটিকে বিশ্বের সর্বাধিক দুর্নীতিগ্রস্ত দেশগুলোর মধ্যে স্থান দেয়। তিনি আরও জানান, বাংলাদেশে সংসদের সরাসরি নির্বাচিত আসনে নারীর প্রতিনিধিত্ব মাত্র ৩.৫ শতাংশ, যা আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক গড়ের তুলনায় অত্যন্ত কম। তুলনামূলক গবেষণার বরাত দিয়ে তিনি বলেন, সংসদে নারীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধি পেলে রাজনৈতিক দুর্নীতি ও মেরুকরণ উভয়ই হ্রাস পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

রাজনৈতিক অর্থায়নে সংস্কারের প্রশ্নে ড. কাসাল বার্তোয়া তিন ধরনের সরকারি অর্থায়ন মডেল বিশ্লেষণ করেন। তিনি সতর্ক করেন যে কঠোর নিয়ন্ত্রণ ছাড়া রাজনৈতিক দলগুলোকে সরকারি অর্থ দেওয়া পরিস্থিতিকে আরও খারাপ করতে পারে। বাংলাদেশ প্রসঙ্গে তিনি কর্পোরেট রাজনৈতিক দান নিষিদ্ধ করা, পুরনো নির্বাচনী ব্যয়সীমা আধুনিক বাস্তবতা অনুযায়ী হালনাগাদ করা, ব্যক্তিগত দান নিয়ন্ত্রণে ক্যাপ আরোপ এবং দলীয় হিসাব ও নির্বাচনী ব্যয়ে পূর্ণ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার সুপারিশ করেন। ‘সরকারি অর্থায়ন ছাড়া রাজনৈতিক দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ অত্যন্ত কঠিন তবে যথাযথ তদারকি ছাড়া সরকারি অর্থায়ন পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে,’ বলেন তিনি।

ড. বদিউল আলম মজুমদার বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির অবক্ষয় নিয়ে সরাসরি ও ঐতিহাসিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে কথা বলেন। 

একাধিক নির্বাচনী চক্রে প্রার্থীদের সম্পদের তথ্য বিশ্লেষণ করে তিনি দেখান যে ক্ষমতায় থাকা দলের নেতারা নিজেদের সম্পদ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করেছেন, আর বিরোধী দলের নেতাদের সম্পদ তুলনামূলকভাবে হ্রাস পেয়েছে। ‘অর্থ একজন মানুষের ক্ষমতাকে প্রভাবিত করে। আমাদের দেশে রাজনীতি আর জনসেবা নেই এটি এখন একটি লাভজনক ব্যবসায় পরিণত হয়েছে,’ বলেন তিনি।

তিনি আক্ষেপ করে জানান যে বাংলাদেশে ‘রাজনীতি’ শব্দটি এখন মানুষের মুখে মুখে প্রতারণার প্রতিশব্দ হয়ে উঠেছে। ‘আমরা এখন বলি 'তুমি কি আমার সাথে পলিটিক্স করছো?' অর্থাৎ আমাকে ঠকানোর চেষ্টা করছো কিনা। অথচ রাজনীতির মূল উদ্দেশ্য ছিল জনসেবা।’
দীর্ঘদিন আইনি লড়াই চালিয়ে আসা এই সুশীল সমাজ নেতা জানান, নির্বাচন কমিশনকে দলীয় অর্থের হিসাব প্রকাশে বাধ্য করার জন্য তিনি আদালতে গিয়েছিলেন। কিন্তু রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানটি দলগুলোর পক্ষ নিয়ে তথ্য প্রকাশ না করে তা রক্ষা করেছে। 

তিনি বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোকে পারিবারিক বা ব্যক্তিকেন্দ্রিক রাজনীতির বাইরে এসে স্পষ্ট মতাদর্শভিত্তিক দল হিসেবে গড়ে উঠতে হবে। ছাত্ররাজনীতি যে সহিংসতার হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে, সে বিষয়েও তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেন এবং বর্তমান সরকারের প্রতি আহ্বান জানান যে, জনগণের আত্মত্যাগকে সম্মান জানিয়ে রাজনৈতিক ব্যবস্থার আমূল সংস্কার করা হোক।

সমাপনী পর্বে বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা মূল বক্তার সরকারি অর্থায়নের প্রস্তাবের সঙ্গে একমত পোষণ করে বলেন, সংস্কার শুরু করতে হলে কোথাও না কোথাও থেকে শুরু করতেই হবে। তিনি বলেন, প্রাতিষ্ঠানিক নৈতিকতা গড়ে তুলতে শিক্ষাব্যবস্থার ভূমিকা অপরিহার্য এবং এই প্রক্রিয়া আগেই শুরু হওয়া উচিত ছিল। এটি একটি জটিল প্রক্রিয়া, কিন্তু শুরুটা এখনই করতে হবে।

এই সেমিনারটি নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই ধারাবাহিক প্রচেষ্টার অংশ, যেখানে জাতীয় গুরুত্বের বিষয়গুলো নিয়ে প্রমাণনির্ভর ও নিরপেক্ষ বিতর্কের পরিসর তৈরি করা হয়। স্কুল অব হিউম্যানিটিজ অ্যান্ড সোশ্যাল সায়েন্সেস ভবিষ্যতেও এ ধরনের আলোচনার মঞ্চ প্রস্তুত রাখতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ, যেখানে গবেষক, নীতিনির্ধারক ও সুশীল সমাজ একত্রে দেশের গণতান্ত্রিক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার পথ খুঁজবেন।