শীর্ষ চার পদই ফাঁকা, ভারপ্রাপ্ত বিওটি চেয়ারম্যানও— কানাডিয়ান ইউনিভার্সিটি প্রশাসনে লেজেগোবরে অবস্থা
যে কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম সঠিকভাবে পরিচালনা করতে উপাচার্য (ভিসি), উপ-উপাচার্য (প্রো-ভিসি) ও কোষাধ্যক্ষ (ট্রেজারার)— এই তিনটি পদ গুরুত্বপূর্ণ। আইন অনুযায়ী, সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে এই তিন পদে নিয়োগ দেন দেশের রাষ্ট্রপতি; যিনি একইসঙ্গে সব বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্য (চ্যান্সেলর) হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। তবে শীর্ষ এ তিনটি পদই ফাঁকা রয়েছে বেসরকারি কানাডিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশে। শুধু এই তিন পদই নয়; ফাঁকা রয়েছে রেজিস্ট্রারের পদও। এ পদে অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে জনসংযোগ ও ভর্তি বিষয়ক উপদেষ্টাকে।
এখানেই শেষ নয়; কানাডিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশের উপাচার্য প্রফেসর ড. এইচএম জহিরুল হকের মেয়াদ শেষ হলেও তাকেই নিয়মিত ভিসি হিসেবে উল্লেখ করেছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। গ্র্যাজুয়েট হওয়া শিক্ষার্থীদের সার্টিফিকেটেও স্বাক্ষর করছেন তিনি; যে সার্টিফিকেট আদতে ‘অবৈধ’ বলছে ইউজিসি। শুধু তাই নয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক অনুষ্ঠানে অধ্যাপক জহিরকে নিয়মিত ভিসি হিসেবে উল্লেখ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে একাধিক পোস্টও দিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।
উচ্চশিক্ষা তদারক প্রতিষ্ঠান বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন (ইউজিসি) জানিয়েছে, একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের গুরুত্বপূর্ণ তিনটি পদ ফাঁকা থাকতে পারে না। এ পদগুলো দীর্ঘদিন শূন্য থাকলে উচ্চ শিক্ষালয়টিতে স্থবিরতা দেখা দিতে পারে। একই সাথে ভারপ্রাপ্ত উপাচার্যকে নিয়মিত উপাচার্য হিসেবে উপস্থাপন করা অন্যায় বলে জানিয়েছে ইউজিসি।
‘কানাডিয়ান ইউনিভার্সিটির শীর্ষ পদগুলো ফাঁকা থাকা দুঃখজনক। উপাচার্যের মেয়াদ শেষ হওয়ার পূর্বেই নতুন ভিসি নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া দরকার ছিল। এছাড়া কেন ভারপ্রাপ্ত লেখা হচ্ছে না; সে বিষয়ে খোঁজ নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’-অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেন, সদস্য ইউজিসি
এ বিষয়ে ইউজিসি সদস্য (বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়) অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেন দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘কানাডিয়ান ইউনিভার্সিটির শীর্ষ পদগুলো ফাঁকা থাকা দুঃখজনক। উপাচার্যের মেয়াদ শেষ হওয়ার পূর্বেই নতুন ভিসি নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া দরকার ছিল। এছাড়া কেন ভারপ্রাপ্ত লেখা হচ্ছে না; সে বিষয়ে খোঁজ নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
ইউজিসি সূত্রে জানা গেছে, ২০২২ সালের ২০ এপ্রিল কানাডিয়ান ইউনিভার্সিটির উপাচার্য হিসেবে চার বছরের জন্য নিয়োগ পান প্রফেসর ড. এইচএম জহিরুল হক। সে হিসেবে ২০২৬ সালের ২০ এপ্রিল তার মেয়াদ শেষ হয়েছে। এরপর থেকে এ পদে তিনি ভারপ্রাপ্ত হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। ভারপ্রাপ্ত হিসেবে দায়িত্ব পালন করলেও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাকে নিয়মিত উপাচার্য হিসেবে উল্লেখ করছে।
সূত্রর তথ্য বলছে, বিগত আওয়ামী লীগের সময় ২০২৩ সালের ২১ নভেম্বর অধ্যাপক ড. মো. গিয়াস উদ্দিন আহসানকে কানাডিয়ান ইউনিভার্সিটির প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়। তবে পট পরিবর্তনের পর তিনি দায়িত্ব থেকে সরে যান। তবে ঠিক কবে নাগাদ তিনি দায়িত্ব থেকে সরে গেছেন সেটি নিশ্চিত হওয়া যায়নি। এছাড়া ২০২৫ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর থেকে বিশ্ববিদ্যালয়টির ট্রেজারের পদ ফাঁকা থাকলেও তা পূরণে উদ্যোগ নেয়নি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।
নাম অপ্রকাশিত রাখার শর্তে কানাডিয়ান ইউনিভার্সিটির এক কর্মকর্তা দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘বিগত আওমী লীগের সময়ে চৌধুরী নাফিজ সরাফাত বোর্ড অব ট্রাস্টিজের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেছেন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগের পতন হলে বিওটির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্বে আসেন চৌধুরী জাফরউল্লাহ শারাফাত। এরপর তিনিই বিশ্ববিদ্যালয়ের সবকিছু। তার নির্দেশনার বাইরে বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনো কাজ হয় না। উপাচার্য স্যারও কোনো নির্দেশনা দিতে পারেন না। বিশ্ববিদ্যালয়টি মূলত অচল হয়ে পড়েছে চৌধুরী জাফরউল্লাহ শারাফাতের কারণেই।’
বিশ্ববিদ্যালয়ের শীর্ষ পদগুলো ফাঁকা থাকা প্রসঙ্গে জানতে চাইলে কানাডিয়ান ইউনিভার্সিটির ভারপ্রাপ্ত উপাচার্য প্রফেসর ড. এইচএম জহিরুল হক দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘প্রো-ভিসি এবং ট্রেজারারের পদ পূরণে কেন উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে না সেটি বোর্ড অব ট্রাস্টিজ (বিওটি) ভালো বলতে পারবে। আমি যতটুকু জানি ভিসি পদে নিয়োগের জন্য তিনজনের নামের তালিকা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়া হয়েছে।’
ভারপ্রাপ্ত উপাচার্যকে নিয়মিত উল্লেখ করছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ২০২৬ সালের ২০ এপ্রিলের পর কানাডিয়ান ইউনিভার্সিটির অন্তত পাঁচটি অনুষ্ঠানে প্রফেসর ড. এইচএম জহিরুল হককে নিয়মিত উপাচার্য হিসেবে উল্লেখ করেছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। এর মধ্যে আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস উপলক্ষে গত ৩ মে কানাডিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশের আইন বিভাগে শ্রমিক দিবস উদযাপন এবং ‘ভয়েসেস অব লেবার’ শীর্ষক শ্রমিক দিবস ম্যাগাজিনের মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। ওই অনুষ্ঠানে অধ্যাপক জহিরুল হককে নিয়মিত উপাচার্য হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। যদিও নিয়ম অনুযায়ী ভারপ্রাপ্ত উপাচার্য উল্লেখ করার কথা ছিল।
কানাডিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশের পাবলিক হেলথ বিভাগ গত ২৭ এপ্রিল স্প্রিং ২০২৬ এ ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীদের ওরিয়েন্টেশন প্রোগ্রামের আয়োজন করা হয়। ওই অনুষ্ঠানে নতুন ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীদের সামনে প্রফেসর ড. এইচএম জহিরুল হককে নিয়মিত উপাচার্য হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
গত ৩০ এপ্রিল কানাডিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশের পাবলিক হেলথ অ্যান্ড ওয়েল-বিয়িং ক্লাব, মাইন্ডউইজের সহযোগিতায় মানসিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা ও শিক্ষার্থীদের সুস্থতা নিয়ে একটি সেশনের আয়োজন করে। ওই সেশনেও প্রফেসর ড. এইচএম জহিরুল হককে নিয়মিত উপাচার্য হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে।
গত ২৬ এপ্রিল কানাডিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশে নতুন ওয়েবসাইটের বেটা সংস্করণ ও অডিটোরিয়ামের রি-ব্র্যান্ডিংয়ের শুভ উদ্বোধন করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের চেয়ারম্যান (ভারপ্রাপ্ত) চৌধুরী জাফরউল্লাহ শারাফাত। ওই অনুষ্ঠানেও প্রফেসর ড. এইচএম জহিরুল হককে নিয়মিত উপাচার্য উল্লেখ করেছে বিশ্ববিদ্যায় কর্তৃপক্ষ। এছাড়া গত ২৩ এপ্রিল কানাডিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশে ক্রিকেট ও টেবিল টেনিস বিজয়ীদের সম্মাননা প্রদান করা হয়। এই অনুষ্ঠানেও প্রফেসর ড. এইচএম জহিরুল হককে নিয়মিত উপাচার্য উল্লেখ করা হয়েছে।
ভারপ্রাপ্ত উপাচার্যকে নিয়মিত উপাচার্য উল্লেখ করা অপরাধ বলে নিজেই শিকার করেছেন প্রফেসর ড. এইচএম জহিরুল হক। তিনি বলেন, ‘আমি ভারপ্রাপ্ত হিসেবে আছি। আমার নামের পাশে অবশ্যই ভারপ্রাপ্ত লিখতে হবে। এটি না করলে সেটি অন্যায় হয়েছে। আমি এ বিষয়ে রেজিস্ট্রারের (অতিরিক্ত দায়িত্ব) সঙ্গে কথা বলব।’
ট্রেজারার পদ নিয়ে মিথ্যাচার বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের
ভারপ্রাপ্ত উপাচার্যকে নিয়মিত উপাচার্য হিসেবে উল্লেখ করেই ক্ষান্ত হয়নি কানাডিয়ান ইউনিভার্সিটি কর্তৃপক্ষ। বিশ্ববিদ্যালয়টির ট্রেজারার নিয়ে মিথ্যাচার করা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়টিতে ২০২৫ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর থেকে রেজিস্ট্রারের পদ ফাঁকা রয়েছে। তবে একই বছরের ২৯ নভেম্বর জনসংযোগ দপ্তর থেকে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে প্রফেসর এ. এস. এম. সিরাজুল হককে ট্রেজারার হিসেবে দেখানো হয়েছে।
শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ভারপ্রাপ্ত উপাচার্যকে নিয়মিত হিসেবে উল্লেখ করা এবং ট্রেজারার না থাকলেও একজনকে ট্রেজারার বানিয়ে উপস্থাপন করা রীতিমতো অন্যায়। ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থী এবং অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে এটি প্রতারণার শামিল। এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রহণযোগ্যতার পাশাপাশি প্রশাসনিক স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে কানাডিয়ান ইউনিভার্সিটির বিওটির চেয়ারম্যান চৌধুরী জাফরউল্লাহ শারাফাতের ব্যবহৃত নাম্বারে কল দেওয়া হলে সেটি বন্ধ পাওয়া যায়। পরে হোয়াটসঅ্যাপে খুদে বার্তা পাঠানো হলেও তিনি কোনো উত্তর দেননি।
জানতে চাইলে কানাডিয়ান ইউনিভার্সিটির রেজিস্ট্রার (ইনচার্জ) এ. এস. এম. জি. ফারুক দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘জহির স্যার ভারপ্রাপ্ত হিসেবে আছেন। তার নামের পাশে ভারপ্রাপ্ত লেখা উল্লেখ না থাকলে সেটি অন্যায় হয়েছে। আর ট্রেজারার প্রফেসর এ. এস. এম. সিরাজুল হকের বিষয়টি মিসটেক হতে পারে। ফেসবুক পেজ এবং অন্যান্য জায়গা থেকে বিষয়গুলো সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হবে।’