মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত ইস্যুতে বাংলাদেশি শ্রমিকদের অধিকার ও সংকট নিয়ে এনএসইউতে সেমিনার
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান আঞ্চলিক সংঘাতের প্রভাব ইস্যুতে বাংলাদেশি অভিবাসী শ্রমিকদের অধিকার ও দুর্ভোগ নিয়ে নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটিতে (এনএসইউ) একটি সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়েছে।
মঙ্গলবার (৩১ মার্চ) বিশ্ববিদ্যালয়টির সাউথ এশিয়ান ইনস্টিটিউট অব পলিসি অ্যান্ড গভর্ন্যান্স (এসআইপিজি)-এর অধীনে সেন্টার ফর মাইগ্রেশন স্টাডিজ (সিএমএস) ‘Caught Between War and Work: The Rights and Sufferings of Bangladeshi Migrant Workers in the Gulf amid the US–Israel–Iran Conflict’ শীর্ষক এ সেমিনারের আয়োজন করে। এনএসইউ’র সিন্ডিকেট হলে অনুষ্ঠিত এ আয়োজনে নীতিনির্ধারক, শিক্ষাবিদ, উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা ও সিভিল সোসাইটির প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
আলোচনায় মধ্যপ্রাচ্যের চলমান আঞ্চলিক সংঘাত ও উপসাগরীয় অঞ্চলের অনিশ্চয়তা কীভাবে বাংলাদেশি অভিবাসী শ্রমিকদের জীবন ও অধিকারকে প্রভাবিত করছে এবং সংকটকালীন সময়ে শ্রমিকদের জীবিকা সুরক্ষায় কার্যকর নীতিগত পদক্ষেপ কী হতে পারে তা তুলে ধরা হয়।
আলোচকরা জানান, সংকট পরিস্থিতি খুব দ্রুত শ্রমিকদের কর্মসংস্থানের ধারাবাহিকতা ব্যাহত হতে পারে। চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি সংঘাত শুরুর পর থেকে ফ্লাইট বাতিল এবং আকাশপথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে যাতায়াতে বাধা সৃষ্টি হয়েছে। মার্চের শেষ নাগাদ অন্তত সাতজন বাংলাদেশি নাগরিক এই সংঘাতে নিহত হয়েছেন বলে জানা যায়। একইসঙ্গে ইরান থেকে ১৮৬ জন বাংলাদেশিকে দেশে ফিরিয়ে আনার মতো জরুরি সমন্বিত পদক্ষেপের কথাও এ আলোচনায় উঠে আসে।
সেশনটি সঞ্চালনা করেন সিএমএস-এর পরিচালক অধ্যাপক শেখ তৌফিক এম. হক বলেন, শ্রম অভিবাসন বাংলাদেশের অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হলেও শাসনব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার কারণে শ্রমিকরা ঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন।
এনএসইউ-এর পলিটিক্যাল সায়েন্স অ্যান্ড সোসিওলজি (পিএসএস) বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ও সিএমএস সমন্বয়ক ড. সেলিম রেজা অভিবাসন প্রবণতা ও ঝুঁকি প্রসঙ্গে বলেন, উপসাগরীয় অঞ্চলে বাংলাদেশি শ্রমিকদের অধিকাংশই স্বল্প দক্ষতাসম্পন্ন কাজে নিয়োজিত, যেখানে শ্রম তদারকি দুর্বল। উচ্চ নিয়োগ ব্যয় তাদের ঋণের ফাঁদে ফেলে এবং চুক্তি পরিবর্তন, মজুরি আটকে রাখা ও ন্যায়বিচার পাওয়ার সীমাবদ্ধতার মতো সমস্যাগুলো সংঘাতের সময় আরও তীব্র হয়ে ওঠে।
একই বিভাগের আরেক সহযোগী অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ জালাল উদ্দিন সিকদার বিষয়টিকে ভূরাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করে বলেন, সংকটের সময় অভিবাসন ব্যবস্থায় ক্ষমতার বৈষম্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তিনি শক্তিশালী অভিবাসন কূটনীতি, জরুরি সুরক্ষা ব্যবস্থা, ক্ষতিপূরণ ও আইনি সহায়তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি শ্রমবাজার বৈচিত্র্যকরণের ওপর জোর দেন।
ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের প্রধান শরিফুল ইসলাম হাসান বলেন, ক্রমবর্ধমান সংঘাত ও অস্থিতিশীলতা অনিয়মিত অভিবাসন বৃদ্ধি করতে পারে, বিশেষ করে ভূমধ্যসাগরের মতো ঝুঁকিপূর্ণ পথে, যেখানে প্রতিবছর হাজারো মানুষ প্রাণ হারাচ্ছে। অনেক বাংলাদেশি শ্রমিকের বিদেশযাত্রা বাতিল হচ্ছে, চাকরি হারাচ্ছেন এবং আর্থিক সংকটে পড়ছেন, যা অভিবাসনের আকাঙ্ক্ষা ও বাস্তব অর্থনৈতিক লাভের মধ্যে একটি বড় ফাঁক নির্দেশ করে।
ওয়ারবে ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশনের পরিচালক জাসিয়া খাতুন নারী অভিবাসী শ্রমিকদের সংকটের বিষয়টি তুলে ধরে বলেন, অনিয়মিত পথে বিদেশে যাওয়া নারী শ্রমিকরা মজুরি বঞ্চনা, চলাচলে বাধা এবং শারীরিক ও যৌন নির্যাতনের ঝুঁকিতে থাকেন। ভয়, আটক, বহিষ্কার বা আরও নির্যাতনের আশঙ্কায় অনেকেই বিচার চাইতে পারেন না।
সরকারের পক্ষ থেকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের (ওয়েস্ট এশিয়া উইং) পরিচালক মোহাম্মদ বশির বলেন, অভিবাসন নীতিতে বাস্তবতা বিবেচনা করা জরুরি। সীমিত গন্তব্য, দক্ষতার ঘাটতি এবং শ্রমিকদের সঠিকভাবে শনাক্ত ও পর্যবেক্ষণের অভাব বাংলাদেশের অবস্থানকে দুর্বল করে।
আইএলও বাংলাদেশের কারিনা লেভিনা বলেন, শ্রম অভিবাসনকে বিলাসিতা হিসেবে নয়, বরং জাতীয় শ্রম ও উন্নয়ন নীতির অংশ হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। তিনি সবুজ জ্বালানি খাতে নতুন কর্মসংস্থানের সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করেন এবং আঞ্চলিক সহযোগিতা জোরদারের আহ্বান জানান।
আইওএম বাংলাদেশের ভারপ্রাপ্ত প্রধান জিউসেপ্পে লোপ্রেতে বলেন, সংকটকালে অভিবাসী শ্রমিকদের কেন্দ্রবিন্দুতে রেখে নীতিনির্ধারণ করতে হবে, কারণ প্রচলিত নীতিমালা অনেক সময় এসব পরিস্থিতিতে কার্যকর হয় না।
প্রধান অতিথি হিসেবে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মো. নুরুল হক বলেন, দক্ষতার ঘাটতি, নিয়োগে অনিয়ম এবং সীমিত বাজারের ওপর নির্ভরতা বাংলাদেশের শ্রম অভিবাসন খাতে বড় চ্যালেঞ্জ। তিনি দক্ষতা উন্নয়ন, ভাষা প্রশিক্ষণ, নিয়োগ সংস্থার নিয়ন্ত্রণ এবং শ্রমিক কল্যাণ জোরদারের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
সেশনের সভাপতিত্ব করেন এনএসইউ-এর প্রো-ভিসি অধ্যাপক নেছার ইউ. আহমেদ, যিনি প্রমাণভিত্তিক নীতিনির্ধারণ ও আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয়ের গুরুত্ব তুলে ধরেন। সমাপনী বক্তব্যে এনএসইউ’র স্কুল অব হিউম্যানিটিজ অ্যান্ড সোশ্যাল সায়েন্সেস-এর ডিন অধ্যাপক ড. মো. রিজওয়ানুল ইসলাম বলেন, এই সংকট ভবিষ্যৎ সুযোগের জন্য প্রস্তুতির প্রয়োজনীয়তাও নির্দেশ করে।
সেমিনারটি একটি অধিক অধিকারভিত্তিক ও সমন্বিত অভিবাসন নীতির আহ্বানের মাধ্যমে শেষ হয়, যেখানে বাংলাদেশি অভিবাসী শ্রমিকদের নিরাপত্তা, কল্যাণ ও কণ্ঠস্বরকে অগ্রাধিকার দেওয়ার ওপর জোর দেওয়া হয়।