০৪ মার্চ ২০২৬, ২০:২৯

ফেসবুকে 'হাহা' রিঅ্যাক্ট দেওয়ায় ড্যাফোডিলের একটি বিভাগের শিক্ষার্থীদের তলব

ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি  © টিডিসি ফটো

ফেসবুকে ক্লাব কমিটির পোস্টে ‘হাহা’ রিঅ্যাক্ট দেওয়া এবং সমালোচনামূলক মন্তব্য করার অভিযোগে ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির (ডিআইইউ) নিউট্রিশন অ্যান্ড ফুড ইঞ্জিনিয়ারিং (এনএফই) বিভাগের প্রায় ৩০ জন শিক্ষার্থীকে তলব করেছে বিভাগীয় কর্তৃপক্ষ।

আজ বুধবার (৪ মার্চ) বিকেল তিনটার দিকে সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থীদের অফিসিয়াল মেইল পাঠিয়ে সভায় উপস্থিত থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়। বিভাগের সাবেক ও বর্তমান শিক্ষার্থীদের পাঠানো ওই মেইলে বিষয় হিসেবে ‘সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অসদাচরণ সংক্রান্ত সভা’ উল্লেখ করা হয়েছে। মূলত গত সোমবার (৩ মার্চ) এনএফই ক্লাবের নতুন কমিটি ঘোষণার পর থেকেই এই বিতর্কের সূত্রপাত হয়।

ঘটনার বিস্তারিত বিবরণে জানা যায়, সোমবার এনএফই ক্লাবের অফিসিয়াল ফেসবুক পেজে নতুন কমিটি প্রকাশ করা হলে শিক্ষার্থীরা অভিযোগ তোলেন যে, সেখানে ‘চেইন অব কমান্ড’ বা জ্যেষ্ঠতা মানা হয়নি। অনেক যোগ্য ও সিনিয়র শিক্ষার্থীকে বাদ দিয়ে জুনিয়রদের গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানো হয়েছে বলে দাবি করেন তারা। এরপরই ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা ওই পোস্টে ব্যাপকহারে ‘হাহা’ রিয়েক্ট দিতে থাকেন এবং ‘অযোগ্য আর পক্ষপাতিত্বকারী মানুষজন যখন ডিপার্টমেন্টের বড় বড় পজিশনে বসে আছেন, সেই ডিপার্টমেন্ট থেকে এর চেয়ে বেশি আশা করাও যায় না আসলে’—এমন সব সমালোচনামূলক মন্তব্য করেন। এরই প্রেক্ষিতে বিভাগীয় মেইলে বলা হয়, ‘এনএফই ক্লাব এবং বিভাগের অফিসিয়াল ফেসবুক গ্রুপ সংক্রান্ত কিছু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অসদাচরণের ঘটনা পরিলক্ষিত হয়েছে। এ ধরনের কার্যক্রম নিউট্রিশন অ্যান্ড ফুড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ এবং ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির মূল্যবোধ ও শৃঙ্খলার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।’

শেষ বর্ষের এক শিক্ষার্থী জানান, 'ক্লাব পলিটিক্স খুবই বাজে একটা জিনিস। ডিজার্ভিং ক্যান্ডিডেট রেখে তারা নিজেদের ইচ্ছামতো কমিটি প্রকাশ করে। এতে সংযুক্ত থাকে পূর্ববর্তী কমিটির সদস্যরাও। যাদের সঙ্গে তাদের ভালো সম্পর্ক এবং যারা তাদের কথায় ওঠাবসা করে, তাদেরই কমিটিতে রাখা হয়। এই নিয়ে কমিটি প্রকাশের পর সোশ্যাল মিডিয়ায় কমেন্ট করলে মেইল দিয়ে ডেকে পাঠানো হয়েছে, যা ব্যক্তি স্বাধীনতা হরণ বলে মনে করি। স্বাধীন বাংলাদেশে মত প্রকাশের স্বাধীনতা সবার আছে এবং এটাকে সম্মান করা উচিত। তা না হলে ফ্যাসিস্ট আমল আর এই আমলের মধ্যে তফাৎ কী?'

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এনএফই বিভাগের অধ্যয়নরত আরেক শিক্ষার্থী বলেন, 'গত ৪ মার্চ ডিআইইউ এনএফই ক্লাবের নতুন কমিটি ক্লাবের পেজ থেকে প্রকাশ করা হলে ডিপার্টমেন্টের বর্তমান ও সাবেক শিক্ষার্থীরা পোস্টটিতে হাহা রিয়েক্ট এবং বিভিন্ন মজার কমেন্ট করে। অবশ্য কমেন্টগুলো কমিটিকে কেন্দ্র করেই। কারণ, একটি ডিপার্টমেন্টের অফিসিয়াল ক্লাবের কমিটির প্রধান হতে হলে অবশ্যই সিনিয়র ও দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিতে হবে। এখানে কোনো ‘চেইন অব কমান্ড’ মানা হয়নি এবং যারা দীর্ঘদিন পরিশ্রম করেছে এই ক্লাবের জন্য, তাদের কাউকেই কোনো পদে রাখা হয়নি। এজন্য ডিপার্টমেন্টের শিক্ষার্থীদের এমন মন্তব্য। পোস্টের এসব কমেন্ট ও রিয়েক্ট যাচাই করে শিক্ষার্থীদের এভাবে মেইল দেওয়া হয়েছে ডিপার্টমেন্ট থেকে। এটি কি তাহলে বাকস্বাধীনতা হরণ নয়?'

শিক্ষার্থীদের সোশ্যাল মিডিয়া কার্যক্রমের কারণেই মেইল করা হয়েছে এমনটি নিশ্চিত করে নিউট্রিশন অ্যান্ড ফুড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের প্রধান, সহকারী অধ্যাপক ড. নিজাম উদ্দিন দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে জানান, 'বাকস্বাধীনতা কাকে বলে? সেটা কেমন? সেটা কি যেকোনো মত প্রকাশ করার স্বাধীনতা? সেটার কি কোনো নিয়ম নেই? কেউ কি ইচ্ছেমতো গালিগালাজ করতে পারে? এমন কিছু করলে ইউনিভার্সিটি যদি ডাকে, সেটা কি অপরাধ হবে? আমি ইউনিভার্সিটির বাইরে আছি। আগে জানতে হবে তারা কী করেছে বা কী লিখেছে। আপনারা স্পেসিফিক তথ্য দেন—কোন শিক্ষার্থীকে ডাকা হয়েছে। শিক্ষার্থীরা আমাদেরই ছাত্র, আমরা তাদের অভিভাবক। তাদের কোনো ক্ষতি হোক, সেটা আমরা চাই না। প্রতিষ্ঠানের মানসম্মান নষ্ট হোক, এমন কিছু নিশ্চয়ই তারাও করবে না। অভিযোগটি আগে দেখতে হবে, তারপর নির্দিষ্টভাবে কথা বলা যাবে।'

তিনি আরও বলেন, 'শিক্ষার্থীরা যা কমেন্ট করেছে, সেখানে আরও অনেক কিছু আছে। রোজা মুখে সব বলা সম্ভব না। অনেক খারাপ শব্দ আছে, যেগুলো তারা আপনাদের বলবে না। ধরুন, একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সোশ্যাল মিডিয়া গ্রুপে শিক্ষক, সিনিয়র-জুনিয়র সবাই আছেন। সেখানে এমন কোনো শব্দ ব্যবহার করা ঠিক নয়, যা প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তির মান-সম্মানে আঘাত করে। ডিপার্টমেন্টের সাইটে কিছু কুরুচিপূর্ণ শব্দ লেখা হয়েছে এবং সেগুলোকে প্রশ্রয় দেওয়া হচ্ছে। আমরা চাই না শিক্ষার্থীরা এমন সংস্কৃতি গড়ে তুলুক। তারা তো দেশকে সার্ভ করবে। আমরা চাই না তারা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করুক। আগের আন্দোলনেও আমি শিক্ষার্থীদের পক্ষেই কাজ করেছি। কিন্তু এর মানে এই নয় যে তারা বিশৃঙ্খলা করবে বা আমাদের সম্মানহানি করবে। তারা এমন কিছু শব্দ ব্যবহার করেছে, যেমন ‘ডিপার্টমেন্টের শিক্ষকরা সবাই অযোগ্য’। তাছাড়া মেয়েদের গালিগালাজ করতে ব্যবহৃত কিছু শব্দও উল্লেখ করেছে। বাকস্বাধীনতার নামে গালিগালাজের সংস্কৃতি আমরা চাই না। আমরা চাই আমাদের শিক্ষার্থীরা পরিমার্জিত হোক, দেশকে সেবা করুক এবং নিজেদের উন্নত করুক।

তারপরও বিষয়টি নির্দিষ্টভাবে দেখতে হবে। আমরা ডাকলে তাদের সঙ্গে কথা বলব—বাকস্বাধীনতা কী, তা নিয়ে আলোচনা করব। আমরা তো তাদের জেল-ফাঁসি দিচ্ছি না। আমরা চাই আমাদের শিক্ষার্থীরা পরিমার্জিত হোক। কারও কমিটিতে সুযোগ না হলে সে কি অন্যকে হেয়প্রতিপন্ন করবে? সেটাও তো ঠিক নয়।'

সোশ্যাল মিডিয়ায় কমেন্টের জেরে এভাবে মেইল দেওয়ায় শিক্ষার্থীরা মত প্রকাশে ভীত হতে পারেন কিনা এমন প্রশ্নে বিভাগীয় প্রধান বলেন, 'ব্যাপারটা এমন নয় যে তারা মত প্রকাশে ভয় পাবে। তবে ইউনিভার্সিটির যে নীতিমালা ও নিয়মকানুন আছে, সেগুলো তাদের মানতে হবে। তারা আমাদেরই শিক্ষার্থী। তাদের মানুষ করে গড়ে তুলতে হবে। বিষয়টি আমি খতিয়ে দেখব।'