ঝুলে যাচ্ছে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের পিএইচডি
দেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পিএইচডি (ডক্টর অফ ফিলোসফি) প্রোগ্রাম চালুর বিষয়ে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা চললেও আলোর মুখ দেখছে না। গত বছর জুন-জুলাইয়ে পিএইচডি প্রোগ্রামের নীতিমালার অনুমোদন হতে পারে জানিয়েছিলো বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি)। তবে সরকার পরিবর্তন হলেও খসড়াতেই আটকে আছে সেই নীতিমালা। বরং সরকার পরিবর্তনে খসড়া অনুমোদনে দীর্ঘসূত্রিতা হতে পারে এমন আশঙ্কা সংশ্লিষ্টদের।
জানা যায়, দেশের উচ্চশিক্ষার ক্রমবর্ধমান চাহিদা মেটাতে ১৯৯২ সাল থেকে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের যাত্রা শুরু হয়। এরপর থেকে প্রায় ৩৩ বছর পার হলেও পিএইচডি প্রোগ্রাম চালুর অনুমোদন পায়নি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো। দীর্ঘদিন আলোচনার পর ২০২৪ সালের ৪ জুন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পিএইচডি প্রোগ্রাম চালু করার জন্য নীতিমালা প্রণয়নে একটি কমিটি গঠন করে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি)। এরপর গত বছর জুলাই ও অক্টোবরে এই নীতিমালা অনুমোদন হতে পারে বলে আশ্বাস প্রকাশ করলেও তা বাস্তবায়ন হয়নি।
ইউজিসি সূত্র বলছে, নীতিমালাটির খসড়া প্রস্তুত রয়েছে। ইউজিসি এখন নতুন সরকারের মতামতের জন্য অপেক্ষা করছে। সরকারের শিক্ষা নীতি অনুযায়ী খসড়াটিতে সংযোজন, বিয়োজন হতে পারে। সরকারের গ্রিন সিগন্যাল পেলে অনুমোদনের জন্য মন্ত্রণালয়ে যাবে খসড়া।
পিএইচডি করানোর জন্য আমরা ৩০ বছর ধরে চেষ্টা করছি। কিউএস র্যাংকিং গত বছরের যে ১৭টা বিশ্ববিদ্যালয় এসেছে, তার ৫০ শতাংশ প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়। তাহলে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় কেন সুযোগ পাবে না পিএইচডি করানোর জন্য? - অধ্যাপক ড. শামস্ রহমান, উপাচার্য, ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটি
নীতিমালার খসড়া অনুমোদনের বিষয়ে জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের সদস্য অধ্যাপক ড. আনোয়ার হোসেন দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, নীতিমালার কাজ আমাদের কিছুদিন আগেই শেষ হয়েছে, আমরা অপেক্ষা করছিলাম নতুন সরকার আসলে তাদের নির্দেশনার জন্য। নিশ্চিতভাবে তারা ৫ বছর থাকবে। শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে তাদের দর্শনের জায়গাটা আমাদের পরিষ্কার হওয়া দরকার, আমাদের মূল কাজটাতো দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া।
সরকার পরিবর্তনে খসড়া অনুমোদনে দীর্ঘসূত্রিতার শঙ্কা
আগ্রহী বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বলছে, পিএইচডি প্রোগ্রাম চালুর জন্য প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছে তারা। সরকারের অনুমোদন মিললেই পিএইচডি প্রোগ্রাম চালু করবেন তারা। তবে সরকার পরিবর্তন হওয়ায়, আনুষ্ঠানিকতা শেষে করে নীতিমালা অনুমোদন সময় সাপেক্ষ হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তারা।
কবে নাগাদ নীতিমালার অনুমোদন আসতে পারে জানতে চাইলে অধ্যাপক ড. আনোয়ার হোসেন বলেন, এক সপ্তাহ হয়নি সরকার গঠন করলো, আমার সাথে হয়ত খুব শীঘ্রই সরকারের শিক্ষা মন্ত্রীর সাথে বৈঠক হবে। সরকারের সঙ্গে সমন্বয় করে করতে হবে, সরকারের কনর্সান ছাড়া মানে ইফেক্টিভলি ডিল না করতে না পারলে সমস্যা থেকে যাবে। তবে এটা আটকে যাচ্ছে না, অবশ্যই হবে। খুব শীঘ্রই এটা নিয়ে আমি বসবো। তো খুব অল্প সময়ের ভিতরে হয়ে যাবে আশা করি।
ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির উপাচার্য অধ্যাপক ড. এম. আর. কবির দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে জানান, বিশ্ববিদ্যালয়টি প্রস্তুত রয়েছে পিএইচডি প্রোগ্রাম চালু করার জন্য। তিনি বলেন, আমাদের এখানে যোগ্য সুপারভাইজার আছেন, পিএইচডি শিক্ষক আছেন, যারা রিসার্চ কাজ করছেন। অনুমতি দিলে তাদেরকে আমরা প্রোগ্রাম আরম্ভ করতে পারি। আমাদের জায়গার সমস্যা নেই, ল্যাব দরকার হলে করে নিতে পারবো।
ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির উপাচার্য অধ্যাপক ড. শামস্ রহমান দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, আমার বিশ্ববিদ্যালয় তো অনেকদিন ধরেই প্রস্তুত পিএইচডি প্রোগ্রাম চালুর জন্য। আমাদের বেশ কয়েকটি বিভাগ আছে যেখানে শিক্ষকরা প্রচণ্ডভাবে ওয়ার্ল্ড র্যাংক জার্নালে পেপার পাবলিশ করছে, রিসার্চ করছে। বলা যায় যে, আমাদের প্রস্তুতিতে কোনো ঘাটতি নেই। এটার মধ্য দিয়ে আমাদের গবেষণা বেশি হবে, আমাদের পাবলিকেশন বেশি হবে, আমাদের যে শিক্ষকের যে সংকট সেটাও আমরা উত্তীর্ণ হতে পারব। বাইরের অনেকে জানে না যে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কীভাবে রিসোর্সেস তৈরি করে এবং সেজন্য কত অর্থ ব্যয় করে। আমরা যদি পিএইচডি করাতে পারতাম তাহলে আমাদের জন্য আরো সুবিধা হতো।
তিনি বলেন, পিএইচডি করানোর জন্য আমরা ৩০ বছর ধরে চেষ্টা করছি। কিউএস র্যাংকিং গত বছরের যে ১৭টা বিশ্ববিদ্যালয় এসেছে, তার ৫০ শতাংশ প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়। তাহলে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় কেন সুযোগ পাবে না পিএইচডি করানোর জন্য? আমি মনে করি, যত তাড়াতাড়ি এটা করানো যাবে সেটা প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়তো বটেই, দেশের জন্য এটা একটা মঙ্গলকর জিনিস।
তিনি আরও বলেন, আমার মনে হয় বিষয়টা গুরুত্ব পাচ্ছে না। কেন যেন যে পর্যায়ের গুরুত্ব পাওয়া উচিত, সেই গুরুত্বটা হয়ত পাচ্ছে না। আমি যখন ইউজিসির সঙ্গে কথা বলি, তারা বলে যে, হ্যাঁ এটা তো আমরা এটা দেখছি, এটা হবে, এটা খুব শিগগির হয়ে যাবে। তবে যে কোনো কারণেই হোক, দেশের অবস্থা, রাজনৈতিক পরিস্থিতির জন্যও হতে পারে যে এটা গুরত্বের মধ্যে এখনো আসতে পারেনি। এটা যত তাড়াতাড়ি করা যাবে তত জাতির জন্য মঙ্গলকর।
অবশ্যই সিনিয়র প্রফেসররা অগ্রাধিকার পাবে, জুনিয়ররা যদি ভালো করে তারাও সুযোগ পাবে। পাবলিকেশন, পিএইচডি, রিসার্চ এবং অ্যাকাডেমিক বিষয়গুলো এখানে মূল গুরুত্ব পাবে। - অধ্যাপক ড. আনোয়ার হোসেন, সদস্য, ইউজিসি
বাংলাদেশ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় সমিতির (এপিইউবি) পরিচালক (জনসংযোগ) বেলাল আহমেদ দ্য ডেইলি ক্যম্পাসকে বলেন, নতুন এক সরকার দায়িত্ব নিয়েছে, নতুন অ্যাডমিনিস্ট্রেশন এবং নানান ধরনের কার্যক্রম গ্রহণ করা হচ্ছে। প্রাথমিক, গণশিক্ষা এবং মাধ্যমিক নিয়ে নতুন সরকারের নতুন মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রী কাজ শুরু করেছেন। আমরা আশাবাদী উচ্চ শিক্ষা নিয়েও উনারা কাজ শুরু করবেন। বিশেষভাবে এই উচ্চ শিক্ষার অংশীজন, যারা, সরকারি পর্যায়ের হোক বা বেসরকারি পর্যায়ের হোক, সবার সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে পলিসিগত সিদ্ধান্তগুলো গ্রহণ করবে। তাতে করে যেটা হবে যে, মাঠ পর্যায়ের যে সমস্যাগুলো বা বর্তমান পলিসির যে দুর্বলতাগুলো যথাযথভাবে চিহ্নিত করা যাবে। সেই অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাগুলো গ্রহণ করা সম্ভব হবে।
তিনি আরও বলেন, প্রাইভেট সেক্টর সবসময় একটা গতিতে থাকতে হয়, চলতে হয় সুতরাং এইখানে আমি মনে করি না যে কোন ধীরগতির বিষয় আছে। মন্ত্রী মহোদয় বা ইউজিসি যদি কালকে ডাকে বা মতবিনিময় করেন তাহলে আমাদের তরফ থেকে কোন সমস্যা নাই, আমরা তৈরি। এখন কতটা দ্রুত সেটা করবে তার উপর নির্ভর করছে সবকিছু।
যে-সব বিশ্ববিদ্যালয় পিএইচডি চালুর অনুমতি পেতে পারে
ইউজিসি সূত্র বলছে, বর্তমানে দেশে ১১৬ টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। তবে পিএইচডি প্রোগ্রামের অনুমতি দেওয়ার ক্ষেত্রে স্থায়ী ক্যামপাসের বিষয়টি প্রাধান্য পাবে। বর্তমানে নিজস্ব ক্যামপাসের সনদপ্রাপ্ত বিশ্ববিদ্যালয় মাত্র ২০ টি। এছাড়াও, দক্ষ সুপারভাইজার ও অন্যান্য বিষয়ে নীতিমালাতে জোর দিতে চায় ইউজিসি।
কোন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে অনুমোদন দেওয়ার পরিকল্পনা আছে জানতে চাইলে অধ্যাপক ড. আনোয়ার হোসেন বলেন, আশা করছি, যাদের স্থায়ী ক্যাম্পাস আছে এবং র্যাংকিংয়ে যাদের অবস্থান ভালো সেই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে সুযোগ দেওয়া হবে। যাদের ভালো মানের ফ্যাকাল্টি স্ট্রেন্থ আছে, যেমন দেশের বাইরে পিএইচডি করা ফ্যাকাল্টি। দুর্নাম নেই এমন বিশ্ববিদ্যালয়গুলো।
সুপারভাইজার হওয়ার যোগ্যতা নিয়ে তিনি বলেন, যে সব অধ্যাপক আন্তর্জাতিকভাবে কন্ট্রিবিউট করছেন, আমার জানা অনেকেই হারভার্ড ইউনিভার্সিটি, ইউনিভার্সিটি অব নিউ সাউথ ওয়েলস, অস্ট্রেলিয়া, ইউবিসি, কানাডার মতো বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে কাজ করছেন, এরকম যারা সব ইউনিভার্সিটি গুলোতে অলরেডি কাজ করছে, কো সুপারভাইজার হিসেবে কাজ করছে, মানে এমন পর্যায়ের স্কলার। তিনি কোথা থেকে পিএইচডি করেছেন, ইন্টারন্যাশনাল রিসার্চ করে, রিসার্চ সুপারভাইজার হিসেবে কাজ করে, ওই লেভেলের স্কলার না হলে এসব জায়গায় যুক্ত করা যায় না। সেক্ষেত্রে অবশ্যই সিনিয়র প্রফেসররা অগ্রাধিকার পাবে, জুনিয়ররা যদি ভালো করে তারাও সুযোগ পাবে। পাবলিকেশন, পিএইচডি, রিসার্চ এবং অ্যাকাডেমিক বিষয়গুলো এখানে মূল গুরুত্ব পাবে।
আছে ভুয়া ডিগ্রি ও বাণিজ্যের শঙ্কাও
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পিএইচডি প্রোগ্রাম চালুর বিষয়ে ভুয়া ডিগ্রি ও বাণিজ্যের আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। সেই জায়গা থেকে নীতিমালায় জোর দেওয়ার পক্ষে ইউজিসি এবং অংশীদ্বাররা।
অধ্যাপক ড. আনোয়ার হোসেন বলেন, আমাদের মূল ভয়ের জায়গা হচ্ছে, এটা কীভাবে কতটা ফাংশন করানো যাবে। ভুয়া পিএইচডি বা পিএইচডি বাণিজ্য মানে বিশৃঙ্খলাটা আসলে মূল শঙ্কার জায়গা। এই শঙ্কার জায়গাটা কীভাবে কাটানো যায় সেটা নিশ্চিত করতে চাই আমরা। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় অনেক ভালো শিক্ষক আছেন, যারা অন্যান্য দেশের অনেকেরই পোস্ট সুপারভাইজার। ওনাদের যে মেধা, জ্ঞান, দক্ষতা তা আমরা দেশের জন্য ব্যয় করতে পারছি না ওই সমস্যাগুলোর কারণে। সামনে যাতে সার্টিফিকেট বাণিজ্য না হয়, আমাদের ভালো উদ্দেশ্যটা যাতে ব্যাহত না হয়।
ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির উপাচার্য অধ্যাপক ড. এম. আর. কবির শঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, শুরুতে বেসরাকরি বিশ্ববিদ্যালয় কনসেপ্টটা নিয়ে অনেক বিতর্ক হয়েছে। সার্টিফিকেট বাণিজ্য, মান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তবে ইউজিসি চাইলে যদি নির্দিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়কে কতগুলো কন্ডিশন দিয়ে চালু করতে পারে। আমার মনে হয়, পিএইচডির জন্য সবচেয়ে বড় জিনিস হলো সুপারভাইজার এবং ল্যাব ফ্যাসিলিটি বা আপনার রিসার্চ বা লিটারেচার রিভিউ করবে, জার্নালগুলোর সাথে কানেক্টেড আছে কিনা।