আরও কঠোর নজরদারিতে আসছেন প্রাথমিক শিক্ষকরা
অনলাইনে হাজিরা বাধ্যতামূলক করার পর এবার প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের আরও কঠোর নজরদারিতে আনছে সরকার। এ লক্ষ্যে ১১ ধাপের বিদ্যালয় পরিদর্শন পদ্ধতি এবং ডিজিটাল তথ্যব্যবস্থা উন্নয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সোমবার (২০ অক্টোবর) রাজধানীর শেরাটন হোটেলে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়, প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর ও ইউনিসেফের যৌথ আয়োজনে ‘ফ্রম দ্য ফিল্ড টু রিফর্ম: অ্যাডভান্সিং প্রাইমারি এডুকেশন ইন বাংলাদেশ (মাঠপর্যায় থেকে সংস্কার: বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষার অগ্রযাত্রা) শীর্ষক জাতীয় সংলাপ ও অভিজ্ঞতা বিনিময় কর্মশালায় সভাপতির বক্তব্যে এ তথ্য জানান প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, প্রাথমিক শিক্ষার গুণগত মান উন্নয়ন ও কাঙ্ক্ষিত সংস্কার বাস্তবায়নে কারিকুলাম, শিক্ষক, মনিটরিং, অবকাঠামো ও প্রযুক্তি—এই পাঁচটি বিষয়কে অগ্রাধিকার দিয়ে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। প্রাথমিক শিক্ষার প্রতিটি ক্ষেত্র একে অপরের সঙ্গে নিবিড়ভাবে সম্পর্কিত। একটি ক্ষেত্রে উন্নয়ন ঘটিয়ে অন্য ক্ষেত্রগুলোকে উপেক্ষা করলে কাঙ্ক্ষিত সাফল্য অর্জন সম্ভব নয়। তাই মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের মতামতের ভিত্তিতে সমন্বিত সংস্কার কার্যক্রম এগিয়ে নিতে হবে।
তিনি বলেন, মাঠপর্যায়ে জনবলসংকট ও অতিরিক্ত প্রশাসনিক কাজের চাপ কমিয়ে বিদ্যালয় তদারকি আরও কার্যকর করতে হবে। এ লক্ষ্যে ১১ ধাপের বিদ্যালয় পরিদর্শন পদ্ধতি এবং ডিজিটাল তথ্যব্যবস্থা উন্নয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। মনিটরিংয়ের মূল লক্ষ্য হবে শুধু প্রতিবেদন তৈরি নয়, বরং শিক্ষকদের উপস্থিতি, নিয়মিত পাঠদান এবং শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের প্রকৃত শিখন নিশ্চিত করা।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্রাথমিক শিক্ষার ভবিষ্যৎ লক্ষ্য ও দিকনির্দেশনা স্পষ্ট করেছেন। সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নে সরকার কাজ করছে। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী, প্রতিটি শিশুর শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করার পাশাপাশি শিক্ষার মানোন্নয়ন, নৈতিক মূল্যবোধের বিকাশ এবং ভবিষ্যৎ কর্মজীবনের উপযোগী দক্ষতা অর্জনের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে ববি হাজ্জাজ বলেন, গত কয়েক মাসে প্রাথমিক শিক্ষার সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত কর্মকর্তা, মনিটরিং কর্মকর্তা, বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকসহ সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে ৬০ ঘণ্টার বেশি আলোচনা হয়েছে। তিন হাজারের বেশি অংশীজনের মতামত ও অভিজ্ঞতা পর্যালোচনা করা হয়েছে। এর মধ্যে ১ হাজার ৭০০-এর বেশি মনিটরিং কর্মকর্তার সঙ্গে সরাসরি আলোচনা এবং দেড় হাজারের বেশি প্রধান শিক্ষকের কাছ থেকে অভিজ্ঞতা ও মতামত নেওয়া হয়েছে। এসব আলোচনা ও মতামত থেকে প্রাথমিক শিক্ষার বিদ্যমান সমস্যা, অগ্রাধিকার এবং সম্ভাব্য সমাধানের বিষয়ে একটি বাস্তবভিত্তিক ধারণা পাওয়া গেছে।
প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, ২০২৮ সালে নতুন কারিকুলাম চালুর লক্ষ্যে শিখনফলভিত্তিক ও শিশুবান্ধব শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলা হচ্ছে। বাংলা, গণিত ও ইংরেজিতে দক্ষতা বৃদ্ধি, খেলনাভিত্তিক শিক্ষা, ডিজিটাল কনটেন্ট এবং ব্যবহারিক শিখন কার্যক্রমে গুরুত্ব দেওয়া হবে। পাশাপাশি বিদ্যালয়ের শিখন-সময়ের বৈষম্য কমানো এবং সরকারি-বেসরকারি সব প্রাথমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য প্রয়োজনীয় মানদণ্ড নির্ধারণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
ববি হাজ্জাজ বলেন, মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করতে শিক্ষক নিয়োগ, প্রাক্-চাকরি প্রশিক্ষণ, পদায়ন, পেশাগত উন্নয়ন ও মূল্যায়নকে সমন্বিত করে শিক্ষক নীতিমালা প্রণয়নের কাজ চলছে। যথাযথ প্রশিক্ষণ ছাড়া শ্রেণিকক্ষে পাঠদান না করা, বিষয়ভিত্তিক দক্ষতা বৃদ্ধি এবং শিক্ষকদের নিয়মিত পেশাগত উন্নয়ন নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি। পাশাপাশি শিক্ষক ও বিদ্যালয়ের মূল্যায়ন পৃথক রাখা এবং উপজেলা পর্যায়ের শিক্ষক প্রশিক্ষণকেন্দ্রগুলোকে আরও কার্যকর করার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অবকাঠামো শুধু ভবননির্ভর হলে চলবে না; শ্রেণিকক্ষ, আসবাবপত্র, শৌচাগার ও নিরাপদ পানির ব্যবস্থা শিশুদের উপযোগী করতে হবে। শিক্ষার্থীদের জন্য নিরাপদ ও শিশুবান্ধব শিখন পরিবেশ নিশ্চিত করার পাশাপাশি নদীভাঙনপ্রবণ ও পাহাড়ি অঞ্চলসহ বিভিন্ন এলাকার ভৌগোলিক বাস্তবতা বিবেচনায় উপযোগী অবকাঠামো নির্মাণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
প্রযুক্তির ব্যবহার প্রসঙ্গে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ডিজিটাল কনটেন্ট, তথ্য ব্যবস্থাপনা ও প্রযুক্তিনির্ভর মনিটরিংকে সমন্বিতভাবে কাজে লাগাতে হবে, যাতে শিক্ষকদের কাজ সহজ হয় এবং শিক্ষার্থীদের শিখন উন্নত হয়। তিনি জানান, জাতীয় সংলাপে উঠে আসা সুপারিশগুলো সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, অধিদপ্তর ও উন্নয়ন সহযোগীদের কাছে উপস্থাপন করা হবে। প্রতিটি শিশুর প্রকৃত শিখন, দক্ষতা ও নৈতিক মূল্যবোধের বিকাশ নিশ্চিত করতে কারিকুলাম, শিক্ষক, মনিটরিং, অবকাঠামো ও প্রযুক্তিতে সমন্বিত উদ্যোগের ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।