০৭ অক্টোবর ২০২৬, ২১:৪৪

উন্নীত স্কেলের ফাঁদে উচ্চতর গ্রেড, প্রাথমিকে বঞ্চিত লক্ষাধিক শিক্ষক

নানা বৈষম্যে ভুগছেন প্রাথমিকের শিক্ষকরা  © সংগৃহীত ছবি

বছরের পর বছর একই স্কুলে, একই শ্রেণিকক্ষে, একই দায়িত্বে শিক্ষকতা করছেন তারা। অনেকের চাকরির বয়স পেরিয়েছে ১০ বছর, কারও ১৬ বছরও। নিয়ম অনুযায়ী এই সময়ের পর বেতনে এক ধাপ এগিয়ে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু প্রাথমিকের একদল শিক্ষক সেই অপেক্ষাতেই আটকে আছেন। পদের বেতনস্কেল উন্নীত হওয়ার সঙ্গে তাদের প্রাপ্য উচ্চতর গ্রেডকে এক করে দেখার জটিলতায় দীর্ঘ চাকরিজীবনের আর্থিক স্বীকৃতিটুকুও মিলছে না এমন অভিযোগ করছেন প্রাথমিকের শিক্ষকরা।

সরকারি চাকরিতে ‘উন্নীত স্কেল’ এবং ‘উচ্চতর গ্রেড’ এক বিষয় নয়। কোনো পদের দায়িত্ব, মর্যাদা বা প্রশাসনিক কাঠামো অপরিবর্তিত রেখে সরকার ওই পদের বেতনস্কেল পরিবর্তন করলে সেটি উন্নীত স্কেল। অন্যদিকে, পদোন্নতি না পেয়ে নির্দিষ্ট সময় সন্তোষজনকভাবে চাকরি করার পর একজন কর্মীকে আর্থিকভাবে এক বা একাধিক ধাপ এগিয়ে দেওয়ার সুবিধা হলো উচ্চতর গ্রেড। অর্থাৎ একটি মূলত পদের বেতনস্কেল-সংক্রান্ত, অন্যটি ব্যক্তির চাকরিকাল ও আর্থিক অগ্রগতির সঙ্গে সম্পর্কিত।

সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকদের ক্ষেত্রে এই দুই সুবিধার হিসাব একসঙ্গে বিবেচনা করায় দীর্ঘদিন ধরে জটিলতা তৈরি হয়েছে। এতে ২০০৮ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত নিয়োগ পাওয়া বিপুলসংখ্যক শিক্ষক তাদের চাকরির ১০ ও ১৬ বছর পূর্তির উচ্চতর গ্রেড থেকে বঞ্চিত হয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

প্রাথমিক শিক্ষক নেতাদের দাবি, উন্নীত স্কেল এবং উচ্চতর গ্রেড সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয় হলেও অর্থ মন্ত্রণালয়ের ব্যাখ্যায় দুটিকে একসঙ্গে বিবেচনা করা হয়েছে। এর ফলে দীর্ঘ চাকরিকাল পার করেও ওই সময়ের নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষকরা কাঙ্ক্ষিত উচ্চতর গ্রেড পাচ্ছেন না।

প্রাথমিক সহকারী শিক্ষক সংগঠন ঐক্য পরিষদের অন্যতম প্রধান নেতা ও আহ্বায়ক মোহাম্মদ শামছুদ্দীন মাসুদ দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন কাঠামোয় নির্দিষ্ট সময় পর উচ্চতর গ্রেড দেওয়ার বিধান রয়েছে। পদোন্নতি না পেলে সন্তোষজনক চাকরির ১০ বছর পূর্তিতে প্রথম উচ্চতর গ্রেড এবং ১৬ বছর পূর্তিতে দ্বিতীয় উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার সুযোগ রয়েছে। কিন্তু প্রাথমিকের ২০০৮ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত নিয়োগ পাওয়া শিক্ষকেরা ‘উন্নীত স্কেল’-এর কারণে এই সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন।

তিনি বলেন, উন্নীত স্কেল আর উচ্চতর গ্রেড সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয় কারণ একটি হলো পদের বেতনস্কেল উন্নীত হওয়া, অন্যটি হলো নির্দিষ্ট সময় চাকরি করার পর কর্মীর প্রাপ্য আর্থিক সুবিধা।

প্রাথমিক অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকদের বেতনস্কেল বিভিন্ন সময়ে উন্নীত হয়েছে। বিশেষ করে ২০০৮ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে নিয়োগ পাওয়া শিক্ষকদের একটি অংশের ক্ষেত্রে পদের স্কেল উন্নীত হওয়ার বিষয়টি তাঁদের উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার সময় গণনার সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। ফলে আগের সময়ে নিয়োগ পাওয়া শিক্ষকদের সঙ্গে পরবর্তী সময়ে নিয়োগ পাওয়া শিক্ষকদের বেতন ব্যবধানও কমে গেছে।

এদিকে শিক্ষক নেতাদের দাবি, এই সময়ের আগে নিয়োগ পাওয়া শিক্ষকরা চাকরির মেয়াদ অনুযায়ী কয়েক ধাপ উচ্চতর স্কেলে বেতন পেলেও ২০০৮ থেকে ২০২০ সময়ে নিয়োগ পাওয়া অনেক শিক্ষক বর্তমানে ২০২৫ সালে নিয়োগ পাওয়া শিক্ষকদের কাছাকাছি একই স্কেলে বেতন পাচ্ছেন। অথচ তাঁদের চাকরির মেয়াদ অনেক বেশি।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের ব্যাখ্যায় জটিলতা
উচ্চতর গ্রেড নিয়ে জটিলতার কেন্দ্রে রয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়ের ব্যাখ্যা। গতবছর অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক চিঠিতে বলা হয়, কোনো পদের মূল বেতনস্কেল উন্নীত হলে ওই উন্নীতকরণের তারিখ থেকে পরবর্তী ১০ বছর পূর্তিতে উচ্চতর গ্রেড বিবেচনা করা হবে।

এই ব্যাখ্যার ফলে প্রাথমিক শিক্ষকদের একটি অংশের ক্ষেত্রে প্রথম নিয়োগের তারিখ থেকে উচ্চতর গ্রেডের সময় গণনার পরিবর্তে পদের বেতনস্কেল উন্নীত হওয়ার তারিখকে ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করার বিষয়টি সামনে আসে। শিক্ষক নেতাদের আপত্তি এখানেই। তাদের বক্তব্য, কোনো শিক্ষকের পদ বা দায়িত্ব পরিবর্তন না করে শুধু পদের বেতনস্কেল উন্নীত করা হলে সেটিকে তাঁর চাকরির ১০ বা ১৬ বছর পূর্তির উচ্চতর গ্রেডের বিকল্প হিসেবে বিবেচনা করা যুক্তিসঙ্গত নয়।

দুই মন্ত্রণালয়ের পাল্টা অবস্থান
এই সমস্যাটি নিয়ে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের কাছে পুনর্বিবেচনার বিষয় তুলেছে। মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে যুক্তি দেওয়া হয়েছে, সহকারী শিক্ষকদের ১৩তম গ্রেডে উন্নীত করার ফলে তাঁদের পদ বা শ্রেণির পরিবর্তন হয়নি। ফলে আগের চাকরিকাল বিবেচনায় নিয়ে ১০ ও ১৬ বছর পূর্তিতে উচ্চতর গ্রেড দেওয়ার বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করা যেতে পারে।

এতে স্পষ্ট হয়, দুই মন্ত্রণালয়ের ব্যাখ্যার মধ্যেও এ নিয়ে মতপার্থক্য রয়েছে। মোহাম্মদ শামছুদ্দীন মাসুদ বলেন, ‘অর্থ মন্ত্রণালয়ের ভুল ব্যাখ্যায় উচ্চতর গ্রেড থেকে বঞ্চিত হয়েছেন প্রাথমিকের প্রায় ৩ লক্ষাধিক শিক্ষক।’

শুধু বেতন নয়, হারাচ্ছেন অন্যান্য আর্থিক সুবিধাও
উচ্চতর গ্রেড কার্যকর না হওয়ার প্রভাব শুধু মূল বেতনের ওপর সীমাবদ্ধ থাকছে না বলে মনে করছেন শিক্ষক নেতারা। এর সঙ্গে বেতননির্ভর বিভিন্ন আর্থিক সুবিধাও কমে যাচ্ছে। এমনকি কিছু সুবিধার ক্ষেত্রে পরে বকেয়া হিসেবে সমন্বয় করার সুযোগও নেই।

বাংলাদেশ প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক খায়রুন নাহার লিপি দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকদের চাকরির ১০ ও ১৬ বছর পূর্তিতে উচ্চতর গ্রেড না পাওয়া নিছক একটি প্রশাসনিক জটিলতা নয়; এটি শিক্ষকদের প্রাপ্য আর্থিক অধিকার থেকে দীর্ঘমেয়াদি বঞ্চিত করার বাস্তবতা।

তিনি বলেন, উচ্চতর গ্রেড কার্যকর না হওয়ায় শিক্ষকরা শুধু প্রতি মাসে কম বেতনই পাচ্ছেন না, এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন আর্থিক সুবিধাও হারাচ্ছেন। শ্রান্তি ও বিনোদন ভাতা, উৎসব ভাতাসহ কিছু ভাতার বকেয়া পরবর্তীতে বিল করা বা সমন্বয়ের সুযোগ থাকে না।

লিপি বলেন, আজ উচ্চতর গ্রেড না দেওয়ার যে ক্ষতি হচ্ছে, সেটি শুধু পরে বকেয়া বেতন দিয়ে পূরণ করা সম্ভব নয়। প্রশাসনিক সিদ্ধান্তহীনতার আর্থিক বোঝা শিক্ষকদেরই বহন করতে হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, একজন শিক্ষক তার প্রাপ্য সুবিধা সময়মতো না পাওয়ার কারণে যে অর্থ হারাচ্ছেন, সেটি চাকরিজীবনের শেষে গিয়ে আর ফেরত পাওয়ার সুযোগ নেই। তাই ১০ ও ১৬ বছর পূর্তিতে উচ্চতর গ্রেড বাস্তবায়ন কোনো অতিরিক্ত সুবিধার দাবি নয়; বরং দীর্ঘদিনের আর্থিক বঞ্চনার অবসান ঘটিয়ে শিক্ষকদের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করার প্রশ্ন।

দীর্ঘ সময় চাকরি করেও বেতন ব্যবধান কম
উন্নীত স্কেলকে উচ্চতর গ্রেডের সঙ্গে সমন্বয় করার ফলে জ্যেষ্ঠ ও নবীন শিক্ষকদের বেতনের ব্যবধান অনেক ক্ষেত্রে কমে গেছে। এতে দীর্ঘদিন চাকরি করেও অনেক শিক্ষক তুলনামূলকভাবে কম বেতন পাচ্ছেন বলে অভিযোগ শিক্ষক নেতাদের।

শিক্ষক নেতাদের মতে, আগে নিয়োগ পাওয়া একজন শিক্ষক চাকরির মেয়াদ অনুযায়ী একাধিক ধাপ এগিয়ে থাকার কথা থাকলেও উন্নীত স্কেলের হিসাবের কারণে ২০০৮ থেকে ২০২০ সময়ের নিয়োগপ্রাপ্তদের একটি অংশ সেই আর্থিক অগ্রগতি থেকে বঞ্চিত হয়েছেন।

সমাধান কোথায়
শিক্ষক নেতাদের দাবি, উন্নীত স্কেল ও উচ্চতর গ্রেডের হিসাব আলাদা করে দেখতে হবে। কোনো পদের বেতনস্কেল উন্নীত হলে সেটি এক ধরনের প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত। অন্যদিকে নির্দিষ্ট সময় সন্তোষজনক চাকরি পূর্ণ করার পর উচ্চতর গ্রেড পাওয়া একজন কর্মীর চাকরিকালভিত্তিক সুবিধা।

তাদের মতে, এ দুটি বিষয় এক করে দেখলে দীর্ঘদিন চাকরি করা শিক্ষকদের সঙ্গে নবীন শিক্ষকদের বেতন বৈষম্য তৈরি হবে এবং উচ্চতর গ্রেডের মূল উদ্দেশ্যই ব্যাহত হবে। তাদের প্রশ্ন হলো, পদের বেতনস্কেল উন্নীত হওয়ার তারিখ থেকে উচ্চতর গ্রেডের হিসাব শুরু হবে, নাকি শিক্ষকের প্রথম নিয়োগের তারিখ থেকে চাকরিকাল গণনা করা হবে? আর এই প্রশ্নের সুরাহাই  ২০০৮ থেকে ২০২০ সময়ের নিয়োগপ্রাপ্ত প্রাথমিক শিক্ষকদের উচ্চতর গ্রেডের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে বলে মনে করেন তারা।

শিক্ষক নেতারা বলছেন, বিষয়টি দ্রুত নিষ্পত্তি করে দীর্ঘদিনের আর্থিক বঞ্চনা দূর করতে হবে। একই সঙ্গে উচ্চতর গ্রেডের ক্ষেত্রে সারা দেশের প্রাথমিক শিক্ষকদের জন্য একটি স্পষ্ট, অভিন্ন ও লিখিত নির্দেশনা জারি করা প্রয়োজন, যাতে একই বিষয়ে ভবিষ্যতে নতুন করে প্রশাসনিক জটিলতা তৈরি না হয়।