২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৮:২১

১ অক্টোবর জয়েনিং জন্য আব্বা মসজিদে মিলাদ দিছে, কিন্তু উনি জানে না আমার নিয়োগপত্র আসে নাই

প্রাথমিকে নিয়োগবঞ্চিত জবির সাবেক ছাত্র আমজাদ হোসেন ফাহিম  © টিডিসি সম্পাদিত

‘মাগরিবের পর আব্বা কল দিয়ে বলল, মসজিদে মিলাত দিছি ১ তারিখে জয়েন তাই। আব্বা তখনো জানেনা আমার অ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটার আসে নাই’। শুক্রবার (২৬ সেপ্টেম্বর) ফেসবুকে দেওয়া এক পোস্টে এভাবেই লিখেছেন প্রাথমিকের সহকারী শিক্ষক পদে চূড়ান্ত সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েও শেষ মুহূর্তে নিয়োগপত্র না পাওয়া আমজাদ হোসেন ফাহিম। তিনি জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী। 

 তার ওই ফেসবুক পোস্টটি দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসের পাঠকদের জন্য হুবহু তুলে ধরা হলো: 

‘মাগরিবের পর আব্বা কল দিয়ে বলল,মসজিদে মিলাত দিছি ১ তারিখে জয়েন তাই।আব্বা তখনো জানেনা আমার অ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটার আসে নাই। সারাদিন একটু পর পর মা,আব্বা, ভাইয়া কল দিয়ে যাচ্ছে, কখন দিবে? আব্বারে এখন কী জবাব দেব? এলাকার অনেকেই তাদের ছেলেপেলেদের পড়াইবে বলে অনেকদিন ধরেই বারবার আব্বা- আম্মার কাছে জিজ্ঞেস করছিলো, আমজাদ কবে আইবে বাড়িতে?ঐদিন চাচাতো বোন হাসিনা আপা কল দিয়ে বলল, বাড়ি কবে আবি? তোর জন্য ছাত্র জোগাড় করছি,পড়বে তোর কাছে,বাড়িত আইলে কল দিছ আমারে।এখন আপারে কী বলবো?

বইগুলো সব গুছাইছি কুরিয়ারে বাড়ি পাঠাবো বলে ।বাড়ি যাবো বলে গতকাল ক্যাভিটি যুক্ত দাঁত ফালাইয়া প্রচুর যন্ত্রনায় সারারাত ঘুমাইতে পারিনি, প্রচুর ব্লাড গেছে,যন্ত্রণায় এখনো কথা বলতে  পারিনা ঠিকমতো ।সেই ফেব্রুয়ারিতে নিয়োগ হওয়ার কথা!

প্রাইমারির জন্য ইতিমধ্যে ঢাকার উত্তরায় ৩ বার বাসা ছাড়ছি আবার বাসা নিছি।এই বলে ওমুক তারিখে জোগদান, আবার শুনি ট্রেনিং আগে হেনত্যান এরকম নানা কাহিনী করে সময় ক্ষেপণ করছে।এভাবে ৮ মাস জীবন থেকে খেয়ে দিছে! আবার গত ২/৩ মাস উত্তরা থেকে পুরান ঢাকা দৈনিক ৪-৫ ঘন্টা যাতায়াত করে এসে যেয়ে টিউশনি করাইছি।আমার টিউশনির সব গার্ডিয়ানরাও জানে আমি ১ তারিখে যোগদান দিবো।ভোলা চলে যাবো।এই বুড়ো বয়সে ঢাকা বাসায় বাসায় গিয়ে টিউশনি আর ভালো লাগছেনা,ভাবছি ১ তারিখ থেকে টিউশন থেকে মুক্তি পাবো।কিন্তু মুক্তি হলো আর কই??

এই নিয়া প্রাইমারিতে তিন তিনবার ভাইভা দিছি।এবারই ভাইভায় চূড়ান্তভাবে টিকছি।আরো অনেকগুলো সরকারি চাকুরীতে ভাইভা দিছি।এরমধ্যে PDBF field officer ১২ গ্রেডে১ টা জব হইছিলো,জয়েন দিয়েও ছেড়ে দিছি সুদের কাজ কারবার তাই। কুর্মিটোলা মেডিকেলেও হইছিল, জয়েন দেই নি প্রাইমারির কারণে। ভাবছি প্রাইমারিতে জয়েন দিলে আরো ভালো জবের প্রস্তুতি নিতে সহজ হবে।

আমার বড় ভাই প্রাইমারি চাকরিটা হওয়ার পর সুদূর কঙ্গো থেকে ভিডিও কলে কাঁদছে, নিয়োগপত্র না পাওয়াতে ভাইয়া আইজ আবার ফুঁফিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। ভাইয়ার কাছে এই চাকরিটা অনেক অনেক অনেক বড়। বারবার বুঝাইতো ভাই এখন দেশের পরিস্হিতি খারাপ ,মানুষ লাখ লাখ টাকা দিয়েও সরকারি চাকরি নিতে পারছে না আর তুই মেধায় পেয়েও করতে চাস না!

SSC তে পড়া অবস্থায় ই স্টুডেন্টস পড়াই, এখনো পড়াচ্ছি। তাই ১২ গ্রেডের ১ টা সরকারি চাকরি ছেড়ে দিছি প্রাইমারিতে যোগ দেব বলে। সাংবাদিকতায় পড়েও সাংবাদিকতা না করে অনার্স থেকেই Varsity admission, academic English পড়াচ্ছি। শিক্ষকতার প্রতি আমার সবসময়ই প্যাসন কাজ করে আসছে। তবে প্রাইমারি চাকরি করব, এই ইচ্ছে আমার কোনোদিন ই ছিল না।অনার্সে সিজি ভালো না থাকাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হওয়ার স্বপ্ন শেষ হয়ে গেছে। সাংবাদিকতা সাবজেক্ট তাই নিবন্ধন শিক্ষকতায়ও সুযোগ নেই। ইচ্ছে ছিলো বিসিএস কিংবা/৯ম, ১০ম গ্রেডের ১ টা সরকারি চাকরি আল্লাহ যেনো কপালে রাখে, ব্যাংক বাদে। আল্লাহ তায়ালা বান্দার জন্য যা মঙ্গল তাই করেন বলে বিশ্বাস করি।

বিসিএসের পিছে ছুটে জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সময়গুলো শেষ করেছি, তবে বিসিএসের জন্য যেভাবে পড়াশোনা করা দরকার সেভাবে কখনোই সময় দিতে পারিনি। টিউশনি করে পুরো অনার্স লাইফে পরিবার চালিয়েছি ও নিজে চলছি। পারিবারিক অভাব-অনাটন আর নানা প্রতিকুলতার কারণে আগাতে পারিনি, কেন পারিনি সবচেয়ে ভালো জানে আমার পরিবার। অবশ্য নিজেরও হয়ত ঘাটতি ছিল। আর যারা বর্তমানে চাকরিপ্রার্থী তারা জানে বর্তমানে বাংলাদেশে নন সায়েন্স থেকে জেনারেল ১ টা সাবজেক্টে পড়ে ১ টা যেকোনো গ্রেডের সরকারি চাকরিতে টিকা এভারেস্ট জয়ের চেয়েও কোনো অংশে কম নয়। 

পারিবারিক প্রতিকূলতা আর ভাগ্যে সহায় না হওয়ার কারণে  ৯ম/১০ গ্রেডের ১ টা চাকরি এখনো পাইনি। আজকে সারাদিন মা,আব্বা ছোট ভাই বারবার কল দিয়ে জিজ্ঞেস করছে ভোলার নিয়োগপত্র কখন দেবে?

এই যে, আমাদের  জীবন থেকে  ৮/৯ টা মাস নিয়ে নিলো ,কী যে ট্রমা দিছে এই প্রাইমারি! এরপর শেষমেশ যোগদানপত্র থেকে বাদ দি
লো। ঠিক কী কারণে বাদ দিল? এখনো তা জানতে পারিনি। আমাদের সাথে আজ যা করা হইছে তা চরম লেভেলের যুলুম ও অন্যায় করা হইছে।এ অন্যায় কোনোভাবে মেনে নিতে পারছিনা।আমার পরিবারকে ভীষণভাবে আশাহত করলো।

এই নিয়োগ প্রহসনের সাথে জড়িত প্রত্যেকের যেনো আল্লাহ দুনিয়া ও আখিরাতে কঠিন থেকে কঠিন শাস্তি দেয়।আমার পরিবার যে কষ্ট পাইছে, যে ট্রমা দিছে এদের কখনো ই ক্ষমা করবো না,কখনো ই না। সামর্থ্য থাকলে পরবর্তী প্রজন্মকে বলবো, দেশ ছাড়ো! আবারো বলছি, দেশ ছাড়ো! দেশ ছাড়ো! এদেশ মেধাবিদের জন্য নয়,এ দেশ সৎ মানুষদের জন্য নয়।

আমার নামে কোনো মামলা নাই, রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা নাই, সার্টিফিকেটে সমস্যা নেই,বাবা-মায়ের এনআইডি/স্হায়ী ঠিকানায়ও সমস্যা নেই। স্বাস্হ্য পরীক্ষার ডোপটেস্ট রিপোর্ট জমা দিছি,তাহলে বাদ পড়ার কারণটা আসলেই কী? জাস্ট জামায়াত- শিবির সমর্থন করি, এজন্যই?

নির্বাচনের সময়ে বিভিন্ন সময়ে জাশি নিয়ে ফেইসবুক পোস্ট দিছি,তবে কোন পদ/পদবি নাই,আমার চৌদ্দ গোষ্ঠীর কোনো রাজনীতির সাথে সংশ্লিষ্টতা ও নেই, এটাই যদি হয় অপরাধ আর তার কারণেই কি এনএসআই রিপোর্ট নেগেটিভ আসলো! আমি কি কোনো দলের সমর্থন করতেও পারিনা?আমার কি স্বাধীনভাবে রাজনৈতিক এই অধিকারটুকুও কি নাই? ফ্যাসিবাদ আমলেও তো এভাবে গণহারে সবাইকে বাদ দিতে দেখিনি যা এই নিয়োগে দেখলাম। সবকিছু দুমরেমচড়ে দিছে, অভিশাপে আসমান কাঁপে। এই অভিশাপ কোথায় গিয়ে লাগবে আল্লাহ তায়ালা ই ভালো জানেন। হায়রে ভেরিফিকেশন, হায়রে বাংলাদেশ!’