২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৩:১১

যে মুখ দিয়ে মাকে চাকরি হয়েছে বলেছিলাম, সেই মুখে কীভাবে বলব— ‘মা ভেরিফিকেশনে আটকাই দিছে’

রাহুল দাস ও তার মা  © টিডিসি সম্পাদিত

‘মা, প্রাইমারিতে চাকরি হয়ে গেছে’—এই কথাটি মাকে বলেছিলেন রাহুল দাস। ভেবেছিলেন, দীর্ঘ সংগ্রামের পর এবার হয়তো বদলে যাবে পরিবারের ভাগ্য। কিন্তু নিয়োগপত্র বিতরণের দিন সেই আনন্দই পরিণত হয়েছে হতাশায়। সব ধাপ পেরিয়েও শেষ মুহূর্তে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক পদে নিয়োগপত্র পাননি তিনি।

নিয়োগপত্র না পাওয়ার কথা মাকে জানাতে পারেননি রাহুল। ফেসবুকে লিখেছেন, ‘যে মুখ দিয়ে মাকে বলছিলাম মা প্রাইমারিতে চাকরি হয়ে গেছে, সেই মুখ দিয়ে এখন মাকে কীভাবে বলব, মা ভেরিফিকেশনে আটকাই দিছে।’

রাহুল দাসের বাড়ি সিলেট জেলার বানিয়াচংয়ে। পড়াশোনা শেষে এলাকায় দীর্ঘদিন ছিলেন রাহুল। দীর্ঘদিন ধরে বেকারত্বের অভিশাপ নিয়ে চলতে গিয়ে হতাশাও চেপে ধরেছিল রাহুলকে। বিষয়টি নিয়ে ফেসবুকেও লিখেছেন তিনি।

তার ভাষায়, ‘জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল সিদ্ধান্ত ছিল ‘প্রাথমিক সহকারী শিক্ষক’ পদে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়ে ঢাকা ছেড়ে বাড়িতে চলে আসা। যে সময়ে শ্রেণিকক্ষে কোমলমতি শিশুদের পাঠদান করার কথা, সেই সময়ে হাওরে মাছ ধরে বেকারত্বের অভিশাপ থেকে মুক্তির চেষ্টা করতে হচ্ছে। সৃষ্টিকর্তা সহায় থাকলে হয়তো এই চাকরি দিয়ে সারাজীবন অতিবাহিত করতে হবে না। কিন্তু দেশের নীতিনির্ধারকরা চূড়ান্তভাবে সুপারিশপ্রাপ্ত শিক্ষকদের এতদিন বেকার বসিয়ে রেখে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত না করলেও পারতেন। ওহে দেশের নীতিনির্ধারকগণ, বেকারত্বের মানসিক যন্ত্রণা ও চাপ আপনাদের ওপর যেন অভিশাপ হয়ে না পড়ে, তার আগেই চূড়ান্তভাবে সুপারিশপ্রাপ্ত শিক্ষকদের এই দীর্ঘ মানসিক যন্ত্রণার অবসান ঘটান।'

এদিকে বিষয়টি নিয়ে রাহুলের পাশে দাঁড়িয়েছেন অনেকেই। লিখেছেন ব্যক্তিগত স্যোশাল মিডিয়াতেও।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কানজিল রায় জীবন লিখেছেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান! ঘুমাতে যাচ্ছি অত্যন্ত দুঃখের একটি সংবাদ শুনে। আজকে ‘পুলিশ ভেরিফিকেশন’ নামক অত্যন্ত প্রশ্নবিদ্ধ এক প্রক্রিয়ার বলি বানিয়ে হবিগঞ্জের প্রত্যন্ত এক গ্রামের নিম্নবিত্ত পরিবার থেকে হাজার বাধা ডিঙিয়ে সত্যিকারের জীবনযুদ্ধে প্রতিনিয়ত লড়াই করে উঠে আসা রাহুল দাসের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগের গেজেট আটকানো হয়েছে। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগে এমন ভেরিফিকেশন এবং নিয়োগ আটকানো নজিরবিহীন!

ছেলেটিকে আমি ব্যক্তিগতভাবে চিনি এবং তার জীবনে সততার সঙ্গে পরিশ্রম করে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার যে কণ্টকযাত্রা, তার প্রত্যক্ষদর্শীদের একজন। আজকে এমন একটি নিরীহ ছেলেকে তার বহুল কষ্টার্জিত চাকরি থেকে বাদ দিয়ে এতটাই বড় এক অন্যায় হয়েছে যে, আমি নিজে সরকারি চাকরি করেও বিবেকের তাড়নায় বর্তমান সরকার সংশ্লিষ্টদের এমন অবিবেচক সিদ্ধান্তের তীব্র নিন্দা জানাতে বাধ্য হচ্ছি।

আপনাকে বিনয়ের সহিত জানাতে চাই, 'ভেরিফিকেশন' নামক প্রশ্নবিদ্ধ পদ্ধতির ইতি টানুন। রাহুল দাস এবং তার মতোদের নিজেদের মেধায় অর্জিত সরকারি চাকরি করতে দিন। এমন নিরীহ সন্তানের সতী মায়ের যে আর্তনাদ, তা আসমান কাঁপিয়ে তোলার শক্তি রাখে। মহান সৃষ্টিকর্তা এত বড় অন্যায় নিশ্চিতভাবেই মেনে নেবেন না।

প্লিজ, ছেলেটাকে তার কষ্টার্জিত চাকরিটা করতে দেন। ওদের সুইস ব্যাংকে টাকা নেই, লন্ডন-দুবাই-নিউইয়র্কে মামা-চাচা বা ফ্ল্যাট নেই। ওদের আছে শুধু স্বপ্ন আর সেই স্বপ্ন তাড়া করার বাসনা। এই স্বপ্নগুলোর সঙ্গে অবিচার জাতি হিসেবে আমাদের পতনকে শুধু ত্বরান্বিতই করবে।

হাওড়ের সন্তান রাহুল

সজল দাস নামে একজন লিখেছেন, রাহুলকে আজ প্রাইমারি শিক্ষক নিয়োগের গেজেট থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। Is it some kind of joke? ওকে আমি খুব কাছ থেকে দেখেছি। আমরা দুজন একসাথে রিডিং রুমে কত শত রাত পার করেছি। এত পরিশ্রমী একটা ছেলেকে চাকরি পাওয়ার পরেও কোন ইনভেস্টিগেশনের বলে বাদ দিলেন? সেইসব ... ইনভেস্টিগেশন কারা করে, তাও একটু জানতে চাই। আমি আমার চাকরি নিয়ে দুইবার সন্দিহান হতে পারি, কিন্তু রাহুলের চাকরি নিয়ে আমি কোনো রকম সন্দিহান না। না ওর কোনো পলিটিক্যাল ব্যাকগ্রাউন্ড আছে, না মাদক সেবন করে, না অন্যকিছু।

পঙ্কজ দাস লিখেছেন, ‘রাহুল দা অনেক ভালো মনের মানুষ। দাদার সঙ্গে ৩টা দিন একসঙ্গে থাকছি ঢাকা। নিজের চোখে দেখছি, সারারাত ধরে পড়াশোনা করছেন, আবার সকাল হলে ঠিকই টিউশনিতে বের হয়ে যেতেন। উনার মতো একটা পরিশ্রমী লোকের কেন চাকরি বাদ পড়বে? সবসময় ভালো মনের মানুষদের সঙ্গেই কেন বারবার এমন অন্যায়-অবিচার করা হয়? হায়রে বাংলাদেশ।’

বিষ্ণু রায় লিখছেন, ‘তাঁর সাথে আমার ব্যক্তিগতভাবে তেমন কথা না হলেও আমি আমার প্রথম বর্ষ থেকেই ওনাকে হলের রিডিং রুমে প্রায় সময়ই দেখতাম। এরকম একজন পরিশ্রমী মানুষের সাথে এমন অন্যায় মেনে নেওয়া যায় না । কোন মূর্খরা এসব ইনভেস্টিগেশনের নাম করে বেকারদের নিয়ে খেলছে?

নাসিম লিখেছেন, ‘পুলিশ ও এনএসআই ভেরিফিকেশনের বাহানায় শত শত যোগ্য ও মেধাবী প্রার্থীকে নিয়োগ বঞ্চিত করা হয়েছে যা স্পষ্ট জুলুম। মার খেলো সৎ ও পরিশ্রমী প্রার্থীরা। অবিলম্বে এই জুলুমের অবসান হোক, বঞ্চিত মেধাবীদের দ্রুত নিয়োগপত্র দেওয়া হোক!’

রাহুলের কষ্টের গল্প ফেসবুকে লিখেছেন অনেকেই। লিমন হালদার নামে একজন লিখেছেন, তার দাদা রুবেল একদিন ভোরে ফোন করে কাঁদতে কাঁদতে বলেছিলো, ‘দাদা হাওড়ের বাঁধ ভেঙে আমাদের সব ফসল তলিয়ে গেছে, আমরা কীভাবে বাঁচবো?’  সেদিন বুঝেছিলাম হাওড় অঞ্চলের মানুষ মুখে হাসি ফোটাতে গিয়ে কতটা অশ্রু আর ঘাম বিসর্জন দেয়।