প্রাথমিকে সহকারী শিক্ষকের নিয়োগপত্র বিতরণ শুরু, না পাওয়ার অভিযোগ অনেকের
সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক পদে নিয়োগপ্রত্যাশী ১৪ হাজার প্রার্থীর দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান ঘটছে। নির্বাচিত প্রার্থীদের অনুকূলে নিয়োগপত্র জারির পর আজ বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) দেশের বিভিন্ন জেলায় এই নিয়োগপত্র দেওয়া শুরু হয়েছে। যদিও অনেক প্রার্থী কাগজপত্র জমা দেওয়ার পরও নিয়োগপত্র হাতে পায়নি বলে অভিযোগ তুলেছেন।
প্রাথমিক অধিদপ্তর জানিয়েছে, সংশ্লিষ্ট জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কার্যালয়গুলো থেকে এই নিয়োগপত্র বিতরণ করা হয়েছে। সুপারিশপ্রাপ্ত প্রার্থীরা নিজ নিজ জেলা কার্যালয় থেকে সরাসরি নিয়োগপত্র গ্রহণ করছেন। নিয়োগপত্র পাওয়ার পর আগামী ১ অক্টোবর প্রার্থীদের নিজ জেলা শিক্ষা কার্যালয়ে যোগদান করতে হবে। পূর্ব ঘোষণা অনুযায়ী ৪ অক্টোবর তাঁদের পদায়ন শুরুর কথা রয়েছে।
এদিকে নিয়োগপত্র বিতরণ শুরু হলেও এ নিয়ে প্রার্থীদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। অনেক প্রার্থী প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দেওয়ার পরও বৃহস্পতিবার পর্যন্ত নিয়োগপত্র হাতে পাননি বলে অভিযোগ করেছেন। কেউ কেউ জানিয়েছেন, নিয়োগপত্র বিতরণের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তর থেকে এখনও স্পষ্ট নির্দেশনা বা সময়সূচি পাননি। ফলে দীর্ঘ অপেক্ষার পর নিয়োগপত্র পাওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হলেও সব প্রার্থী একই দিনে তা হাতে পাবেন কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
এসব বিষয়ে কথা হয় মুন্সীগঞ্জ জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার (ভারপ্রাপ্ত) মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান মোল্লার সঙ্গে। দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে তিনি জানান, ‘মন্ত্রণালয় থেকে আমরা যাদের নিয়োগপত্র দেওয়ার জন্য নির্দেশনা পেয়েছি, তাদেরই নিয়োগপত্র দিচ্ছি। যাদের দিতে পারব না, তাদের বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে লিখব। নিয়োগের বিষয় খুব কনফিডেনসিয়াল। এর বাইরে আমি কিছু বলতে পারব না।’
একই কথা বলেন ময়মনসিংহ এবং নরসিংদীর জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসারও। বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত কথা বলতেও রাজি হননি তারা।
নিয়োগপত্রগুলো ডাকযোগে পাঠানো হয়েছে। এজন্য অনেক এলাকায় সেগুলো পৌঁছাতে দেরি হতে পারে। এজন্য আমরা যোগদানের তারিখ ১ অক্টোবর পর্যন্ত দিয়েছি। প্রার্থীরা কিছুদিন অপেক্ষা করলে তারাও নিয়োগপত্র পেয়ে যাবেন।-শাহীনা ফেরদৌসী, মহাপরিচালক, প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর
সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক পদে চূড়ান্তভাবে সুপারিশপ্রাপ্ত শিক্ষকদের আন্দোলনের একজন নেতা ও মুখপাত্র দেবব্রত সরকার দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, অনেক জেলার নিয়োগপত্র ওয়েবসাইটে দেওয়া হচ্ছে, আবার কোনো কোনো জেলারটি ডাকযোগেও পাঠানো হবে বলে জেনেছি। কাগজপত্র জমা দেওয়ার পরও অনেকে নিয়োগপত্র পাচ্ছেন না বলে জানতে পেরেছি, যেমন চাঁদপুরে ২৭ জন পাননি, ঝালকাঠিতে ২০-২২ জন। শুনেছি পুলিশ ভ্যারিফিকেশন এবং গোয়েন্দা সংস্থার রিপোর্ট নেগেটিভ আসায় তারা নিয়োগপত্র পাননি। আমি জেলারটি এখনও দেওয়া শুরু না হওয়ায় আমিও নিয়োগপত্র পাইনি।
এ বিষয়ে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় উপসচিব (বিদ্যালয়-২) রাজীব কুমার সরকার বলেন, ‘নিয়োগপত্র প্রদানের তালিকা প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরে রয়েছে। নির্বাচিত সবাই নিয়োগপত্র পাবে কি না এই বিষয়ে জানা নেই।
যদিও বিষয়গুলো মানতে নারাজ প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক শাহীনা ফেরদৌসী। আজ বৃহস্পতিবার দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে তিনি বলেন, নিয়োগপত্রগুলো ডাকযোগে পাঠানো হয়েছে। এজন্য অনেক এলাকায় সেগুলো পৌঁছাতে দেরি হতে পারে। এজন্য আমরা যোগদানের তারিখ ১ অক্টোবর পর্যন্ত দিয়েছি। প্রার্থীরা কিছুদিন অপেক্ষা করলে তারাও নিয়োগপত্র পেয়ে যাবেন।
নতুন করে এনএসআই ভেরিফিকেশনের কারণে কোনো প্রার্থী বাদ পড়েছেন কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বলেন, ‘কোন প্রার্থী বাদ গেছেন সেটি নির্দিষ্ট করে বলার সময় এখনও হয়নি। আপনি (প্রতিবেদক) নির্দিষ্ট করে তথ্য দিতে পারলে বিষয়টি খোঁজ নিয়ে বলা যেত। কেউ বাদ পড়েছেন এমন কোনো তথ্য আমার কাছে এখনও আসেনি।’
নিয়োগ স্থগিত/বাতিল হতে পারে ১০ কারণে
এর আগে এক চিঠিতে নির্বাচিত প্রার্থীদের অনুকূলে নিয়োগপত্র জারির আগে বয়স, শিক্ষাগত যোগ্যতা, জাতীয়তা, স্বাস্থ্যগত উপযুক্ততা, ডোপ টেস্ট, পুলিশ ভেরিফিকেশন ও গোয়েন্দা প্রতিবেদনসহ বিভিন্ন বিষয় যাচাই করতে নির্দেশ দেয় প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়। বলা হয়, এসব যাচাইয়ে কোনো ধরনের অসংগতি পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট প্রার্থীর নিয়োগপত্র ইস্যু স্থগিত রাখা হবে। এছাড়া নির্দিষ্ট কিছু কারণে নিয়োগ বাতিল বা চাকরি থেকে অপসারণের বিধানও রাখা হয়।
তথ্য বা সনদে জালিয়াতি হলে সরাসরি বাতিল
আবেদনের সময় বা পরবর্তীতে দেওয়া কোনো তথ্য, শিক্ষাগত সনদ বা প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ভুয়া, মিথ্যা কিংবা ত্রুটিপূর্ণ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট প্রার্থীর নিয়োগ আদেশ সরাসরি বাতিল করা হবে। শুধু চাকরি বাতিল নয়, এ ধরনের ঘটনায় প্রচলিত আইনে ফৌজদারি মামলা দায়েরের কথাও নিয়োগের শর্তে উল্লেখ করা হয়েছে। এ কারণে নিয়োগপত্র জারির আগে মূল আবেদনপত্রে দেওয়া সব তথ্য ও সনদপত্র যথাযথভাবে যাচাই করে নিশ্চিত হওয়ার নির্দেশ দিয়েছে মন্ত্রণালয়। বিশেষ করে শিক্ষাগত যোগ্যতা ও জাতীয়তার তথ্য যাচাই করতে বলা হয়েছে।
বয়সে অনিয়ম ধরা পড়লে নিয়োগ বাতিল
শর্ত অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ৩০ নভেম্বর সাধারণ প্রার্থীদের বয়স ২১ থেকে ৩২ বছরের মধ্যে হতে হবে। বয়স নির্ধারণের ক্ষেত্রে কোনো অ্যাফিডেভিট গ্রহণযোগ্য হবে না। নিয়োগপত্র জারির আগে বয়সের তথ্য যাচাই করে নিশ্চিত হতে বলা হয়েছে। বয়সের ক্ষেত্রে নির্ধারিত শর্তের ব্যত্যয় বা কোনো ধরনের অনিয়ম পাওয়া গেলে নিয়োগ বাতিল হতে পারে।
স্বাস্থ্য সনদ না থাকলে নিয়োগ স্থগিত
নির্বাচিত প্রার্থীদের জেলা সিভিল সার্জন দপ্তর থেকে দেওয়া স্বাস্থ্যগত উপযুক্ততার প্রত্যয়নপত্র নিয়োগপত্র জারির আগে যাচাই করতে হবে। কোনো প্রার্থীর স্বাস্থ্যগত উপযুক্ততার প্রত্যয়ন না থাকলে তার নিয়োগপত্র ইস্যু স্থগিত রাখতে হবে। পরে বিষয়টি প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরে জানাতে হবে।
ডোপ টেস্টে নেতিবাচক ফলেও আটকে যাবে নিয়োগ
নিয়োগের আগে নির্বাচিত প্রার্থীর ডোপ টেস্ট রিপোর্টও পর্যালোচনা করতে হবে। ডোপ টেস্টের রিপোর্ট নেতিবাচক হলে সংশ্লিষ্ট প্রার্থীর নিয়োগপত্র ইস্যু স্থগিত রাখার নির্দেশনা রয়েছে। অর্থাৎ স্বাস্থ্যগত উপযুক্ততার প্রত্যয়ন থাকলেও ডোপ টেস্টের ফল নেতিবাচক হলে নিয়োগপ্রক্রিয়া চূড়ান্ত করা যাবে না।
পুলিশ ভেরিফিকেশন ও গোয়েন্দা প্রতিবেদনে সমস্যা থাকলে
নিয়োগের আগে পুলিশ ভেরিফিকেশন প্রতিবেদন এবং জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থার (এনএসআই) গোয়েন্দা প্রতিবেদনও যাচাই করা হবে। এসব প্রতিবেদনে কোনো প্রার্থীর বিরুদ্ধে অসন্তুষ্ট বা বিরূপ মন্তব্য থাকলে তার অনুকূলে নিয়োগ আদেশ জারি না করার নির্দেশ দিয়েছে মন্ত্রণালয়।
নির্ধারিত দিনে যোগ না দিলে নিয়োগ বাতিল
নিয়োগপ্রাপ্ত সহকারী শিক্ষকদের ১ অক্টোবর ২০২৬ সংশ্লিষ্ট জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসে স্বশরীরে যোগদান করতে হবে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে যোগদান করতে ব্যর্থ হলে সংশ্লিষ্ট প্রার্থী চাকরি গ্রহণে সম্মত নন বলে গণ্য হবেন এবং তাঁর নিয়োগপত্র বাতিল বলে বিবেচিত হবে।
নিয়োগপত্র জারির আগেই ভুল ধরা পড়লে স্থগিত
নিয়োগপত্র ইস্যুর আগে কোনো প্রার্থীর তথ্য, সনদ বা যোগ্যতায় ভুলত্রুটি কিংবা অসংগতি পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট প্রার্থীর নিয়োগপত্র ইস্যু স্থগিত রাখতে হবে। এ ধরনের প্রার্থীদের তালিকা এবং নিয়োগপত্র জারি না করার কারণ উল্লেখ করে কোটা ও সংশ্লিষ্ট মতামতসহ ২৮ সেপ্টেম্বরের মধ্যে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরে প্রতিবেদন পাঠাতে বলা হয়েছে।
প্রথম দুই বছরেই অসদাচরণে জড়ালে
নিয়োগের পর প্রথম দুই বছর শিক্ষানবিশকাল হিসেবে গণ্য হবে। এ সময়ে কোনো শিক্ষকের কর্মদক্ষতা ও আচরণ সন্তোষজনক না হলে অথবা তিনি কোনো ধরনের অসদাচরণে জড়ালে চাকরি থেকে অপসারণের সুযোগ থাকবে। নিয়োগের শর্ত অনুযায়ী, এ ক্ষেত্রে কারণ দর্শানোর সুযোগ ছাড়াই চাকরি থেকে অপসারণ করা যেতে পারে।
শিশু নির্যাতন করলেও অপসারণ
কর্মক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের শারীরিক বা মানসিক নির্যাতন করলে সংশ্লিষ্ট শিক্ষকের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। গুরুতর ক্ষেত্রে চাকরি থেকে অপসারণের সুযোগও থাকবে। ফলে নিয়োগের পর শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আচরণ ও পেশাগত শৃঙ্খলা বজায় রাখাকেও চাকরি বহাল থাকার অন্যতম শর্ত হিসেবে রাখা হয়েছে।
প্রশিক্ষণে ব্যর্থ হলেও স্থায়ী হবে না চাকরি
যোগদানের পর অনধিক চার বছরের মধ্যে নির্ধারিত বিষয়ভিত্তিক ও মৌলিক প্রশিক্ষণ ডিপিএড/সিইনএড গ্রহণ করতে হবে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রশিক্ষণ নিতে ব্যর্থ হলে অথবা প্রশিক্ষণে অকৃতকার্য হলে চাকরি স্থায়ী হবে না। এ ক্ষেত্রে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এদিকে নির্বাচিত প্রার্থীদের অনুকূলে ২৪ সেপ্টেম্বরের মধ্যে নিয়োগপত্র জারি করতে হবে। তবে যাচাই-বাছাইয়ে কোনো অসংগতি পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট প্রার্থীর নিয়োগপত্র স্থগিত রেখে ২৮ সেপ্টেম্বরের মধ্যে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরে প্রতিবেদন পাঠাতে হবে।