প্রাথমিক শিক্ষার উপকরণে কর মওকুফ প্রয়োজন: রাশেদা কে চৌধুরী
প্রাথমিক শিক্ষার ব্যয় কমাতে শিক্ষা খাতে কর মওকুফের বিষয়টি বিবেচনা করা প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেছেন গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধুরী। মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি) আয়োজিত একটি ডিসেমিনেশন ওয়ার্কশপে তিনি এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে সূচনা বক্তব্য দেন ইউনিসেফের শিক্ষা বিশেষজ্ঞ জয় মিলান মালের।
শিক্ষায় কর আরোপের বিষয়ে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে রাশেদা কে. চৌধুরী বলেন, শিক্ষার জন্য কর ব্যবস্থার বিষয়টি নিয়ে আমাদের ভাবতে হবে। কিডনি চিকিৎসার মতো কিছু ক্ষেত্রে কর কমানো হয়েছে। কিন্তু শিক্ষা বিশেষ করে প্রাথমিক শিক্ষা তো মৌলিক অধিকার। তাহলে শিক্ষার প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ও উপকরণের ক্ষেত্রে করের বিষয়টি কেন বিবেচনা করা হবে না?
তিনি বলেন, আমি একজন শিক্ষা অধিকারকর্মী হিসেবে মনে করি, শিক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রে করের বিষয়টি আলাদাভাবে দেখা দরকার। কৃষক কার্ড বা ফ্যামিলি কার্ডের মতো ব্যবস্থার মাধ্যমে যদি সুবিধা দেওয়া সম্ভব হয়, তাহলে শিক্ষার ক্ষেত্রেও প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করার জন্য এমন ব্যবস্থা নিয়ে ভাবা যেতে পারে।’
পিপিআরসির নির্বাহী পরিচালক ও গবেষণাটির প্রধান দলের সদস্য ড. হোসেন জিল্লুর রহমানও প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বরাদ্দ অর্থের প্রকৃত ব্যবহারযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে বলেন, বিদ্যালয়ের জন্য যে অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয়, ভ্যাট, কর ও পরিবহন ব্যয়ের মতো বিভিন্ন খাতে অর্থ কমে যাওয়ায় কাগজে-কলমে বরাদ্দের সঙ্গে বাস্তবে ব্যবহারের উপযোগী অর্থের পার্থক্য তৈরি হচ্ছে।
হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, একটি বিদ্যালয়কে এক লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হলেও ভ্যাট, কর ও অন্যান্য বাধ্যতামূলক ব্যয় বাদ দেওয়ার পর বিদ্যালয়ের হাতে প্রকৃত অর্থ অনেক কম থাকে। ফলে মাঠপর্যায়ে বরাদ্দের পরিমাণ নিয়ে যে প্রত্যাশা তৈরি হয়, বাস্তবে তা পূরণ করা সম্ভব হয় না। এতে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের ওপরও চাপ তৈরি হয়।
তিনি বলেন, স্কুল পর্যায়ে অর্থ দেওয়ার ক্ষেত্রে শুধু মোট বরাদ্দের পরিমাণ বিবেচনা করলে হবে না। বিদ্যালয়ের হাতে প্রকৃতপক্ষে কত টাকা পৌঁছাচ্ছে এবং সেই অর্থ দিয়ে কতটুকু কাজ করা সম্ভব, সেটিও বিবেচনায় নিতে হবে। শিক্ষক ও প্রধান শিক্ষকদের কাছ থেকে নামমাত্র বরাদ্দ ও ব্যবহারযোগ্য বাজেটের এই পার্থক্য বোঝার প্রত্যাশা করাও ঠিক নয়।
গবেষণার তথ্য তুলে ধরে অর্থনীতিবিদ ও সাবেক এই উপদেষ্টা আরও বলেন, বিদ্যালয় পর্যায়ে বরাদ্দের অর্থ থেকে ভ্যাট-কর ও পরিবহন ব্যয় বাদ যাওয়ায় প্রকৃত অর্থের পরিমাণ কমে যায়। এর ফলে আর্থিক ব্যবস্থাপনা ও হিসাব-নিকাশও জটিল হয়ে পড়ে। তাই বিদ্যালয়ের জন্য নির্ধারিত অর্থের প্রকৃত মূল্য অক্ষুণ্ন রাখতে কর ও অন্যান্য বাধ্যতামূলক ব্যয়ের বিষয়টি নীতিগতভাবে পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন।
পিপিআরসির গবেষণায় প্রাথমিক বিদ্যালয়ে স্কুল লেভেল ইমপ্রুভমেন্ট প্ল্যান (স্লিপ) ব্যবস্থার বিভিন্ন দিক পর্যালোচনা করে হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, স্লিপের মাধ্যমে বিদ্যালয় পর্যায়ে অর্থ ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা দেওয়ার উদ্দেশ্যই হলো স্থানীয় প্রয়োজন অনুযায়ী শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করা। কিন্তু বরাদ্দের অর্থের একটি অংশ কর, ভ্যাট ও অন্যান্য ব্যয়ে চলে গেলে সেই অর্থের কার্যকর ব্যবহার বাধাগ্রস্ত হয়। তাই বিকেন্দ্রীকরণের পাশাপাশি বিদ্যালয়ের হাতে প্রকৃত ব্যবহারযোগ্য অর্থ নিশ্চিত করাও জরুরি।
এ বিষয়ে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ বলেন, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ বলেন, আজকে শিক্ষায় কর-ভ্যাট নিয়ে কয়েকটি প্রস্তাব এসেছে। এনবিআর বা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো ভ্যাট আরোপ করে। এ বিষয়টি আমরা এনবিআরের সঙ্গে আলোচনা করবো।
তিনি আরও বলেন, আজকের এই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ইউনিসেফসহ বিভিন্ন সংস্থার প্রতিনিধি, প্রাথমিক শিক্ষা পরিবারের সদস্য এবং গণমাধ্যমকর্মীদের আমি আশ্বস্ত করতে চাই যে আগামী দিনগুলোতে অর্থ মন্ত্রণালয় ও এনবিআরের সঙ্গে আমরা এসব বিষয় নিয়ে জোরালোভাবে আলোচনা করব। শিক্ষার্থীদের শিক্ষার পথে যেসব বাধা রয়েছে, সেগুলো দূর করতে আমরা অবশ্যই কাজ করব।
অনুষ্ঠানে ইউনিসেফ বাংলাদেশের শিক্ষা বিভাগের প্রধান দীপা শংকরসহ প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।