অফিস ফাঁকি দিয়ে ব্যবসা পরিচালনা ও ঘুষ-অনিয়মের অভিযোগ শিক্ষা কর্মকর্তা বিরুদ্ধে
চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জ উপজেলার সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. শাহাদাত হোসেনের বিরুদ্ধে নিয়মিত অফিস না করা, সরকারি দায়িত্ব পালনের পরিবর্তে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে সময় দেওয়া, বিদ্যালয় পরিদর্শনে অনিয়ম, বিভিন্ন সুপারিশ ও স্বাক্ষরের বিনিময়ে টাকা নেওয়া এবং বিদ্যালয়ের বিভিন্ন বরাদ্দ থেকে শতাংশ হারে অর্থ নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
অভিযোগ রয়েছে, ফরিদগঞ্জ উপজেলায় কর্মরত হলেও শাহাদাত হোসেন নিয়মিত অফিসে উপস্থিত থাকেন না। তার বাড়ি লক্ষ্মীপুরের রামগঞ্জ উপজেলায় হওয়ায় কর্মস্থলের কাছাকাছি অবস্থান করলেও অফিসে অনিয়মিত উপস্থিতির অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয় সূত্রের দাবি, রামগঞ্জ শহরে ‘এক্সপোর্ট ফ্যাশন কর্নার’ নামে একটি পোশাকের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে তার। সরকারি দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি তিনি ওই প্রতিষ্ঠানে উল্লেখযোগ্য সময় দেন বলেও অভিযোগ করেছেন কয়েকজন শিক্ষক।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন শিক্ষক অভিযোগ করেন, শাহাদাত হোসেন নিয়মিত বিদ্যালয় পরিদর্শন করেন না। তবে পরিদর্শনে গেলে প্রতি ভিজিটে ১ হাজার ৫০০ থেকে ২ হাজার টাকা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। চিকিৎসাজনিত ছুটির সুপারিশ করাতে ৫ হাজার থেকে ৮ হাজার টাকা এবং মাতৃত্বকালীন ছুটির সুপারিশের জন্য ২ হাজার থেকে ৩ হাজার টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয়।
এছাড়া শিক্ষকরা অভিযোগ করেন, বিভিন্ন নথিতে স্বাক্ষর করাতেও তাকে টাকা দিতে হয়। এমনকি টাকা হাতে না থাকলে পরে তার বিকাশ নম্বরে টাকা পাঠানোর কথাও কয়েকজন শিক্ষক জানিয়েছেন।
অভিযোগকারীদের দাবি, ৫ আগস্টের পর থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত বিভিন্ন বিদ্যালয়ের এডহক কমিটির মাধ্যমে কার্যক্রম পরিচালিত হওয়ার সময়ে সংশ্লিষ্ট ক্লাস্টারের উপজেলা সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা হিসেবে শাহাদাত হোসেন সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। বিদ্যালয়ের ব্যাংক হিসাব থেকে বরাদ্দের অর্থ উত্তোলনের ক্ষেত্রে সভাপতির স্বাক্ষর প্রয়োজন হওয়ায় তিনি প্রতিটি চেকে ২ হাজার ৫০০ থেকে ৩ হাজার টাকা নিতেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
শিক্ষকদের আরও অভিযোগ, প্রাক-প্রাথমিক, রুটিন মেইনটেন্যান্স, ওয়াশব্লক মেইনটেন্যান্সসহ বিভিন্ন বরাদ্দ থেকে তিনি ২০ শতাংশ পর্যন্ত অর্থ দাবি করতেন। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ফরিদগঞ্জ উপজেলার নয়টি বিদ্যালয় ক্ষুদ্র মেরামতের জন্য দেড় লাখ টাকা করে বরাদ্দ পায়। শাহাদাত হোসেনের দায়িত্বাধীন ক্লাস্টারের বরাদ্দ পাওয়া বিদ্যালয়গুলোর কাছ থেকেও ২০ শতাংশ হারে অর্থ নেওয়া হয়েছে। কেউ এতে আপত্তি করলে তাকে বিভিন্নভাবে হয়রানির শিকার হতে হয়েছে বলেও কয়েকজন শিক্ষক দাবি করেছেন।
চির্কা ক্লাস্টারের কয়েকজন শিক্ষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, বিভিন্ন কাজে উপজেলা শিক্ষা অফিসে গেলে তারা অনেক সময় শাহাদাত হোসেনকে পান না। তিনি রামগঞ্জে নিজের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে সময় দেন বলে তারা শুনেছেন।
শিক্ষকদের অভিযোগ, বার্ষিক গোপনীয় অনুবেদন (এসিআর) সংক্রান্ত কাজেও অর্থ নেওয়া হয়। অভিযোগ অনুযায়ী, এসিআর প্রতিটি পাতার জন্য ১০০ টাকা করে নেওয়ার দাবি করা হয়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন শিক্ষক আরও অভিযোগ করেন, শাহাদাত হোসেন এর আগে লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলায় কর্মরত ছিলেন এবং সেখানে কিছু সময় ভারপ্রাপ্ত শিক্ষা কর্মকর্তার দায়িত্বও পালন করেন। ওই সময়ও তার বিরুদ্ধে শিক্ষকদের হয়রানি এবং বিভিন্ন কাজে অর্থ নেওয়ার অভিযোগ ছিল।
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে উপজেলা সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. শাহাদাত হোসেন দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, আমাদের পারিবারিক একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান আছে। এটি আমার বাবার নামে ছিল। তিনি গত জানুয়ারিতে মারা গেছেন। বর্তমানে আমার ছোট ভাইসহ পরিবারের অন্যরা ব্যবসাটি দেখাশোনা করছে। তবে ব্যবসার অবস্থা ভালো নয়। যেকোনো সময় এটি ছেড়ে দেওয়া হতে পারে। অফিস সময়ে ব্যবসাটি আমি পরিচালনা করি না।
তিনি বলেন, ‘আমার বিরুদ্ধে ঘুষ-বাণিজ্য কিংবা শিক্ষকদের বদলি ও বিভিন্ন সুপারিশের ক্ষেত্রে অর্থ নেওয়ার যে অভিযোগ করা হয়েছে, তার কোনো সত্যতা নেই। এ ধরনের কোনো কর্মকাণ্ডের সঙ্গে আমি জড়িত নই। তবে আমার কর্তৃপক্ষ চাইলে বিষয়টি তদন্ত করতে পারে। এতে আমার কোনো আপত্তি নেই। আল্লাহর রহমতে এ ধরনের কোনো বিষয়ের সঙ্গে আমি জড়িত নই।’
শিক্ষকদের বদলির বিষয়ে তিনি বলেন, ‘বদলির জন্য একটি কমিটি রয়েছে। সেখানে আমার কোনো সম্পৃক্ততার সুযোগ নেই। আমি এখানে যোগ দেওয়ার পর এক বছর দুই মাস হয়েছে। এখন পর্যন্ত কোনো শিক্ষকের এসি (এসিআর)-তে আমি একটি স্বাক্ষরও দিইনি।’
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে ফরিদগঞ্জ উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার শিরিন সুলতানা দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তা শাহাদাত হোসেনের বিরুদ্ধে আমার কাছে কখনো এসব অভিযোগ কেউ দেয়নি। কোনো শিক্ষক আমাকে এ বিষয়ে বলেননি। ব্যবসা প্রতিষ্ঠান কারও ব্যক্তিগত বিষয় হতে পারে। সেটিও আমাকে কেউ জানায়নি। একবার এ ধরনের একটি কথা উঠেছিল। তখন জিজ্ঞেস করে জানতে পেরেছিলাম, ব্যবসাটি তার বাবার নামে।’
অফিস সময়ে ব্যবসা পরিচালনার সুযোগ আছে কি না—এ বিষয়ে শিরিন সুলতানা বলেন, ‘অফিসে কাজের অনেক চাপ থাকে। এখানে সারাক্ষণ ব্যস্ত থাকতে হয়। অফিসের দায়িত্ব রেখে অন্য কোনো কাজ করার সুযোগ থাকার কথা নয়। তবে যে ব্যবসার কথা বলা হচ্ছে, সেটি তার নিজের নামে নয়। তার বাবার নামে লাইসেন্স রয়েছে বলে জানতে পেরেছি।’
অভিযোগ পেলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘অবশ্যই অভিযোগ পেলে বিষয়টি দেখা হবে। কাজ করতে গেলে কারও ত্রুটি, ভুল, অন্যায় বা অনিয়ম হতেই পারে। কেউ যদি বিষয়টি আমাকে জানান, তাহলে আমি সেটি আমার কর্তৃপক্ষের সঙ্গে শেয়ার করব।'