২৫ আগস্ট ২০২৬, ১৬:০৬

প্রাথমিকে ৩২ হাজার প্রধান শিক্ষকের পদ পূরণে তিন মাসের পরিকল্পনায় এগোচ্ছে অধিদপ্তর

প্রাথমিকত শিক্ষা অধিদপ্তর  © টিডিসি সম্পাদিত

দীর্ঘদিনের আইনি জটিলতায় আটকে থাকা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ৩২ হাজারের বেশি প্রধান শিক্ষক পদ পূরণের পথ খুলেছে। এখন মাঠপর্যায়ে গ্রেডেশন তালিকা তৈরির কাজ শুরু করেছে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর। তালিকা যাচাই-বাছাই ও অভিযোগ নিষ্পত্তির পর তা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে সরকারি কর্ম কমিশনে (পিএসসি) পাঠানো হবে। পিএসসির অনুমোদন পাওয়া গেলে সহকারী শিক্ষকদের প্রধান শিক্ষক পদে পদোন্নতির প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া হবে। পুরো প্রক্রিয়াটি প্রায় তিন মাসের মধ্যে এগিয়ে নেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে অধিদপ্তর।

প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের পলিসি অ্যান্ড অপারেশন বিভাগের পরিচালক মীর আব্দুল আউয়াল আল মেহেদী দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষকদের একটি বিষয় নিয়ে মামলা ছিল। সেই মামলার জটিলতা এখন নিষ্পত্তি হয়েছে। এখন মাঠপর্যায়ে পদোন্নতির জন্য একটি গ্রেডেশন তালিকা তৈরি করা হচ্ছে।

এদিকে আদালতের রায় হওয়ার পরই সরাসরি প্রধান শিক্ষক পদে পদোন্নতি দেওয়া হচ্ছে না। প্রথমে জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে গ্রেডেশন তালিকা তৈরি হবে। এরপর তালিকা নিয়ে কারও আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে তা নিষ্পত্তির সুযোগ থাকবে। অভিযোগ না থাকলে তালিকা অধিদপ্তরে আসবে। গ্রেডেশন তালিকা হাতে পাওয়ার পর পরবর্তী ধাপে মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে সরকারি কর্ম কমিশনে (পিএসসি) পাঠানো হবে।

সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে প্রায় তিন মাস লাগতে পারে। কারণ সব জেলা থেকে গ্রেডেশন তালিকা আসতে হবে। সবগুলো তালিকা হাতে পাওয়ার পরই আমরা পরবর্তী প্রক্রিয়া শুরু করতে পারব।- মীর আব্দুল আউয়াল আল মেহেদী, পরিচালক, পলিসি অ্যান্ড অপারেশন, প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর

এ নিয়ে অধিদপ্তরের পলিসি অ্যান্ড অপারেশন বিভাগের এই পরিচালক বলেন, গ্রেডেশন তালিকা আমরা অনলাইনে উন্মুক্ত করে দিয়েছি। এখন বিভিন্ন ইউনিটে এটি প্রস্তুত করা হচ্ছে। তালিকা তৈরির পর একটি নোটিশ দেওয়া হবে এবং ৩০ কর্মদিবস সময় দেওয়া হবে। এই সময়ের মধ্যে কোনো অভিযোগ না এলে তালিকাটি আমাদের কাছে পাঠানো হবে। এরপর আমরা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে বিষয়টি সরকারি কর্ম কমিশনে (পিএসসি) পাঠাব। সেখান থেকে অনুমোদন পাওয়া গেলে প্রধান শিক্ষকের পদে পদোন্নতির প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া যাবে।

এই পুরো প্রক্রিয়া কত দিনে শেষ হতে পারে তা জানিয়ে মীর আব্দুল আউয়াল আল মেহেদী বলেন, এসব প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে প্রায় তিন মাস লাগতে পারে। কারণ সব জেলা থেকে গ্রেডেশন তালিকা আসতে হবে। সবগুলো তালিকা হাতে পাওয়ার পরই আমরা পরবর্তী প্রক্রিয়া শুরু করতে পারব।

তিন মাসের মধ্যে প্রধান শিক্ষক সংকটের সমাধান হবে কি না এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এই মুহূর্তে এভাবে বলা যাবে না। একটি ডেডলাইন নিয়ে কাজ করতে হচ্ছে। আমরা কাজ করছি। প্রায় তিন মাসের মধ্যে প্রক্রিয়াটি এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছি। তবে সুনির্দিষ্ট সময়সীমা বলতে হলে আরও কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে। সব জেলার তথ্য হাতে আসার পরই আমরা নির্দিষ্ট সময় বলতে পারব।

প্রধান শিক্ষক পদ পূরণের ক্ষেত্রে বর্তমান নিয়োগবিধিতেও পদোন্নতিকে বড় অংশ দেওয়া হয়েছে। ২০২৫ সালের সংশোধিত নিয়োগবিধি অনুযায়ী, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক পদের ৮০ শতাংশ পদ পদোন্নতির মাধ্যমে এবং ২০ শতাংশ সরাসরি নিয়োগের মাধ্যমে পূরণ করার বিধান করা হয়েছে। পদোন্নতির ক্ষেত্রে সহকারী শিক্ষক পদে অন্তত ১২ বছরের চাকরির অভিজ্ঞতাসহ নির্দিষ্ট যোগ্যতা পূরণের শর্ত রয়েছে। তাই বর্তমানে যে ৩২ হাজারের বেশি শূন্য প্রধান শিক্ষক পদ পূরণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তার বড় অংশই কর্মরত সহকারী শিক্ষকদের পদোন্নতির মাধ্যমে পূরণ করার প্রক্রিয়া।

সরকারের পক্ষ থেকেও প্রাথমিকের প্রধান শিক্ষক সংকট নিরসনের লক্ষ্যে দ্রুত কাজ করা হচ্ছে বলে জানা গেছে।

এর আগে গত সোমবার ঢাকায় একটি অনুষ্ঠান শেষে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, অনেক সময় ধরে আমাদের শিক্ষক নেই। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ৩২ হাজার হেডমাস্টার নেই। সেটার মামলা আমরা নিষ্পত্তি করেছি। পাবলিক স্কুলগুলোতে প্রতিষ্ঠানপ্রধানের রিটেন পরীক্ষা শেষ করার পর মামলার সম্মুখীন হয়েছিলাম, সেটাও শেষ হয়েছে। কিছুদিনের মধ্যেই সেটার ভাইভার ব্যবস্থা করবো।

এদিকে গত বুধবার চট্টগ্রামের প্রাইমারি টিচার্স ট্রেনিং ইনস্টিটিউটের এক কর্মশালায় প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ বলেন, দীর্ঘদিনের আইনি জটিলতা কাটিয়ে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ৩২ হাজারের বেশি প্রধান শিক্ষক নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।

তিনি আরও জানান, প্রধান শিক্ষক পদে নিয়োগের পর সহকারী শিক্ষকদের যেসব পদ শূন্য হবে, সেসব পদেও নতুন করে নিয়োগ দেওয়া হবে।

দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের পর গত ২ জুলাই আপিল বিভাগ জাতীয়করণকৃত প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের জ্যেষ্ঠতা ও পদোন্নতি-সংক্রান্ত বিধানের বিষয়ে রাষ্ট্রপক্ষের আপিল মঞ্জুর করেন। এর ফলে আগে হাইকোর্টের দেওয়া রায়ের কারণে তৈরি হওয়া আইনি জটিলতার অবসান হয় এবং প্রধান শিক্ষক পদে পদোন্নতির পথ খুলে যায়।

যে মামলায় আটকে ছিল পদোন্নতি
প্রাথমিকের প্রধান শিক্ষক পদে শূন্যতা দীর্ঘদিনের। তবে শূন্য পদ থাকলেও এসব পদে বড় পরিসরে পদোন্নতি দেওয়া যাচ্ছিল না। এর পেছনে ছিল জাতীয়করণকৃত প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের জ্যেষ্ঠতা ও পদোন্নতি নিয়ে আইনি জটিলতা।

২০১৩ সালে সারা দেশে বিপুলসংখ্যক বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় জাতীয়করণ করা হয়। জাতীয়করণকৃত বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সরকারি চাকরিতে অন্তর্ভুক্ত করার পর তাদের চাকরিকাল, জ্যেষ্ঠতা এবং পদোন্নতি কীভাবে নির্ধারণ করা হবে তা নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়। এ-সংক্রান্ত বিধিমালার জ্যেষ্ঠতা ও পদোন্নতির বিধান চ্যালেঞ্জ করে আদালতে মামলা হয়।

মামলার কারণে কারা জ্যেষ্ঠ হিসেবে বিবেচিত হবেন এবং সেই জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে কারা প্রধান শিক্ষক পদে পদোন্নতির সুযোগ পাবেন এ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। ফলে প্রধান শিক্ষক পদে পদোন্নতির প্রক্রিয়াও আটকে ছিল।

দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের পর গত ২ জুলাই আপিল বিভাগ জাতীয়করণকৃত প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের জ্যেষ্ঠতা ও পদোন্নতি-সংক্রান্ত বিধানের বিষয়ে রাষ্ট্রপক্ষের আপিল মঞ্জুর করেন। এর ফলে আগে হাইকোর্টের দেওয়া রায়ের কারণে তৈরি হওয়া আইনি জটিলতার অবসান হয় এবং প্রধান শিক্ষক পদে পদোন্নতির পথ খুলে যায়।