প্রধান শিক্ষক সংকট, ব্যাহত প্রাথমিকের পাঠদান
বৃষ্টিস্নাত সকাল। ঘড়ির কাঁটায় সকাল ১০ টা। ক্ষুদে শিক্ষার্থীদের পদচারণায় মুখর মহানগরী ঢাকার মোহাম্মদপুরের বরাবো সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রাঙ্গণ। গতরাতে বিদ্যুতের তার চুরি হয়ে যাওয়ায় বিদ্যালয়টির শ্রেণিকক্ষ অন্ধকার হয়ে না যায়, সেজন্য দ্রুততার ভিত্তিতে তার কেনা ও লাগানোর কাজ সারলেন ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক তাসলিমা আক্তার। দৈনন্দিন অ্যাকাডেমিকসহ সার্বিক অবস্থা নিয়ে এমন বিভিন্ন বিষয় ঠিক ভাবে চলছে কি না সহকারী শিক্ষকদের সঙ্গে আলোচনা করে জানার চেষ্টা করছেন তিনি।
এটা শেষ করে পাঠদানের জন্য শ্রেণিকক্ষে গেলেন। দুপুরেই জরুরি ভিত্তিতে শিক্ষা অফিসে যাাওয়ার জন্য বের হলেন। বিদ্যালয়ের নানাবিধ কাজ করতে হয়। কিন্তু অফিস সহকারীর পদও শুন্য। তাই সহকারীর অভাবে নিজেকেই দৌড়াতে হয় সব কাজে।
গত বছরের সেপ্টেম্বরের শেষের দিকে প্রধান শিক্ষক পদ শূন্য হওয়ায় পর থেকেই এমন নানাবিধ কাজ করতে হচ্ছে তাকে। প্রতিদিন ২১৭ জন শিক্ষার্থী সামলানোসহ বাকি কাজের ভারে ন্যুব্জ এ ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক প্রায়ই পাঠদানের কাজটিও সারতে পারেন না । ফলে তার পাঠদানের দায়িত্ব পড়ে সহকারী শিক্ষকদের ওপর। দীর্ঘদিন এ অতিরিক্ত দায়িত্ব নিতে গিয়ে হিমসিম খাচ্ছেন সবাই।
বিদ্যালয়টির ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক তাসলিমা আক্তার বলেন, ‘দিনের শুরুতেই শিক্ষক উপস্থিতির একটি ছবি পাঠাতে হয় গ্রুপে। বিদ্যালয় শুরু হয় সকাল সাড়ে ৭টায়। পরে পাঠদান শুরু হয় ৮টা থেকে এবং শেষ হয় বেলা ২টায়। এক শিফটের ক্লাস চলে। একেক ক্লাসের দৈর্ঘ্য ৫০ মিনিট। এত দীর্ঘ সময় ক্লাস নেওয়াসহ কত ধরনের কাজ যে করতে হয়, বলে শেষ করা যাবে না।
প্রধান শিক্ষক নেই, বাড়ছে শিক্ষার্থী সংকটও
বরাবো সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংকট শুধু শিক্ষকস্বল্পতায় সীমাবদ্ধ নয়। বিদ্যালয়টির শিক্ষার্থীদের বড় একটি অংশ নিম্নআয়ের পরিবারের সন্তান। ফলে অনেক শিক্ষার্থী নিয়মিত বিদ্যালয়ে আসতে পারছে না।
মুখ মলিন করে বিদ্যালয়ের গেটে দাঁড়িয়ে ছিল তৃতীয় শ্রেণির এক শিক্ষার্থী। তার বাবা দর্জির কাজ করেন। এ ক্ষুদে শিক্ষার্থীর চোখে মুখে ক্ষুধার ছাপ স্পষ্ট। বিদ্যালয়ে আসতে ভালো লাগে কি না এমন প্রশ্ন শুনে শুকনো মুখে উত্তর, ‘হু’।
সারাদেশে প্রধান শিক্ষকের পদ রয়েছে ৬৫ হাজার ৫৫৩টি। এর মধ্যে কর্মরত রয়েছেন ৩৭ হাজার ৮১৯ জন। ফলে প্রাথমিকের প্রধান শিক্ষকের ২৭ হাজার ৭৩৪ পদই শূন্য। দেশের অর্ধেক বিদ্যালয় চলছে স্থায়ী প্রাথমিক শিক্ষক ছাড়াই। এদিকে সারাদেশে সহকারী শিক্ষকের পদ রয়েছে ৩ লাখ ৬৭ হাজার ৫৮৪ হাজার। এর মধ্যে কর্মরত আছেন ৩ লাখ ৩২ হাজার ৫৭৮ শিক্ষক। ফলে এখন ৩৫ হাজার ৬ জনের পদ শূন্য রয়েছে।
ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক বলেন, ‘এই বিদ্যালয়ে যারা পড়তে আসে সেই শিক্ষার্থীরা নিন্মবিত্ত পরিবারের সন্তান। দিনে দিনে তাদের অনুপস্থিতি বাড়ছে। প্রতিদিনের উপস্থিতি ৬০ থেকে ৬৫ শতাংশ। কারণ এত সকালে খাবার না খেয়ে ৫০ মিনিট ধরে ক্লাস করা তাদের জন্য কঠিন। প্রতিদিন টিফিন কেনার মতো টাকা দিতেও পারেন না তাদের অভিভাবকেরা। এমনকি ঢাকার ব্যয়বহুল জীবনযাপনের সঙ্গে তাল না মেলাতে পারায় গ্রামে চলে যাচ্ছে। ফলে প্রতিবছরই কমছে শিক্ষার্থী সংখ্যাও।’
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আশপাশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রতিযোগিতা। এই এরিয়ায় ঢাকার অন্যতম বড় মাদ্রাসা জামিয়া রাহমানিয়া আরাবিয়া রয়েছে। বিদ্যালয়ের সামনের গলিতেই রয়েছে কয়েকটি কিন্ডার গার্টেন। এছাড়াও এই এলাকার প্রায় প্রতি গলিতেই মাদ্রাসা ও কিন্ডারগার্টেন থাকার কারণে এই সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী পেতে কষ্ট হয়। এর মধ্যে প্রধান শিক্ষকের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদ দীর্ঘদিন শূন্য থাকায় বিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ও একাডেমিক কার্যক্রমে বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে।
তাসলিমা আক্তার জানান, ‘এত সংকটের পরও ভর্তিকৃত যেসব শিক্ষার্থী রয়েছে তাদেও সামলানোও কঠিনতর হয়ে ওঠেছে। এক বছর হতে চললো প্রধান শিক্ষক ম্যাডাম নেই। কবে নতুন প্রধান শিক্ষক দেওয়া হবে তাও ঠিক হয়নি।’ এমন চিত্র শুধু মহানগরী ঢাকায়ই নয় বরং দেশজুড়ে প্রধান শিক্ষক সংকটে ন্যুব্জ প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলো।
প্রধান শিক্ষক সংকট, সহকারী শিক্ষকেও ঘাটতি
প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য থাকায় এসব বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকদেরই ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে। ফলে একদিকে তাঁদের প্রশাসনিক ও দাপ্তরিক কাজ সামলাতে হচ্ছে, অন্যদিকে নিয়মিত পাঠদানও চালিয়ে যেতে হচ্ছে। ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক দাপ্তরিক কাজে ব্যস্ত থাকলে তার নিয়মিত ক্লাসের দায়িত্বও নিতে হচ্ছে অন্য সহকারী শিক্ষকদের। অথচ সহকারী শিক্ষক পদেও রয়েছে বড় ঘাটতি।
প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের দেওয়া সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, সারাদেশে প্রধান শিক্ষকের পদ রয়েছে ৬৫ হাজার ৫৫৩টি। এর মধ্যে কর্মরত রয়েছেন ৩৭ হাজার ৮১৯ জন। ফলে প্রাথমিকের প্রধান শিক্ষকের ২৭ হাজার ৭৩৪ পদই শূন্য। দেশের অর্ধেক বিদ্যালয় চলছে স্থায়ী প্রাথমিক শিক্ষক ছাড়াই। এদিকে সারাদেশে সহকারী শিক্ষকের পদ রয়েছে ৩ লাখ ৬৭ হাজার ৫৮৪ হাজার। এর মধ্যে কর্মরত আছেন ৩ লাখ ৩২ হাজার ৫৭৮ শিক্ষক। ফলে এখন ৩৫ হাজার ৬ জনের পদ শূন্য রয়েছে।
নতুন সহকারী শিক্ষক নিয়োগ হলেও পুরো সংকট কাটছে না
সহকারী শিক্ষক সংকট কমাতে এরই মধ্যে নতুন নিয়োগপ্রক্রিয়া এগিয়েছে। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক পদে সুপারিশপ্রাপ্ত ১৪ হাজার ৩৮৪ জন প্রার্থী আগামী ১ অক্টোবর নিজ নিজ জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসে যোগদান করবেন। পরে ৪ অক্টোবর তাঁদের পদায়ন করা হবে। এরপর নতুন নিয়োগপ্রাপ্তদের দুই মাসের বিশেষ পেশাগত প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। প্রশিক্ষণ শেষে নিয়মিত পাঠদানে যুক্ত হতে পারবেন নতুন শিক্ষকরা।
নতুন করে সহকারী শিক্ষক নিয়োগ হলেও প্রাথমিক শিক্ষার সামগ্রিক শিক্ষক সংকট রাতারাতি কাটছে না। কারণ বর্তমানে সারাদেশে সহকারী শিক্ষকের ৩৫ হাজার ৬টি পদ শূন্য রয়েছে। নতুন নিয়োগের পরও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক পদ শূন্য থাকবে।
শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রধান শিক্ষক সংকটের সমাধান না হলে সহকারী শিক্ষক নিয়োগের সুফলও পুরোপুরি পাওয়া যাবে না। কারণ প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য থাকায় অনেক বিদ্যালয়ে একজন সহকারী শিক্ষককে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে। ফলে নিয়মিত পাঠদানের পাশাপাশি তাঁকে প্রশাসনিক ও দাপ্তরিক নানা কাজ সামলাতে হচ্ছে। শিক্ষা অফিসে যাওয়া, বিভিন্ন প্রতিবেদন ও তথ্য পাঠানো, শিক্ষক উপস্থিতি ও ছুটির বিষয় দেখা, বিদ্যালয়ের আর্থিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনা থেকে শুরু করে নানা ধরনের দায়িত্ব তাঁকেই পালন করতে হচ্ছে।
এর ফলে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক যদি প্রশাসনিক কাজে ব্যস্ত থাকেন বা জরুরি প্রয়োজনে বিদ্যালয়ের বাইরে যেতে হয়, তাঁর নির্ধারিত ক্লাসের দায়িত্বও অন্য সহকারী শিক্ষকের ওপর পড়ে। অর্থাৎ একজন শিক্ষকের ওপর অতিরিক্ত প্রশাসনিক দায়িত্ব চাপলে তার প্রভাব গিয়ে পড়ছে অন্য শিক্ষকদের ওপরও। এতে শিক্ষক স্বল্পতার কারণে এমনিতেই চাপের মধ্যে থাকা বিদ্যালয়গুলোতে পাঠদানের সময়সূচি ও শ্রেণি কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে।
নিদারুণ কষ্টে পিষ্ট প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলো
মহানগরী থেকে প্রত্যন্ত অঞ্চল সব জায়গায় প্রধান শিক্ষক সংকটে ভুগছে দেশ। তবে প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলো বেশি দুর্ভোগ পোহাচ্ছে। এরমধ্যে অন্যতম কুড়িগ্রাম জেলা। এটি মূলত ১৬টি নদ-নদী দ্বারা পরিবেষ্টিত একটি চর ও দ্বীপসমৃদ্ধ সীমান্তবতী জেলা। ব্রহ্মপুত্র, ধরলা, তিস্তা, দুধকুমার এবং ফুলকুমার এই জেলার প্রধান নদী। নদীবেষ্টিত ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে জেলাটিতে প্রতি বছর বন্যা ও নদীভাঙনের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের মুখোমুখি হতে হয়। অতি দুর্গম এলাকা থেকে শিক্ষার্থীরা পড়তে বিদ্যালয়ে যায়। অথচ সেই বিদ্যালয়গগুলো অধিকাংশই প্রধান শিক্ষক নেই। সহকারী শিক্ষকও সংকটে।
এছাড়াও ৪৪ এটিইও পদের মধ্যে ২১ জন্য কর্মরত। ফলে ২৩টি পদ শূন্য রয়েছে। এমনকি উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তাদেরও একটি পদ খালি। তাই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো সঠিকভাবে তদারকির সমস্যাও ভুগছে জেলাটি। কুড়িগ্রাম জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের তথ্য অনুযায়ী, কুড়িগ্রাম জেলায় প্রধান শিক্ষকের অনুমদিত পদ ১২৩৮। এরমধ্যে কর্মরত রয়েছেন মাত্র ৭৭২ জন। ফলে ৪৬৬ টি পদ খালি রয়েছে। এছাড়া সহকারী শিক্ষকের পদ রয়েছে ৬ হাজার ৮৫৭টি পদ। এরমধ্যে ৪৮১ জন নিয়োগের অপেক্ষায় রয়েছেন। এই হিসেবে ৬ হাজার ৬৬৮ জন কর্মরত রয়েছেন। ফলে ১৮৯টি পদ শূন্য রয়েছে।
কুড়িগ্রাম জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার স্বপন কুমার রায় চৌধুরী দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, এখানে নদীবেষ্টিত হওয়ার কারণে বিভিন্ন ধরনের সমস্যায় পড়তে হয়। অতি দুর্গম এলাকায় রয়েছে ২৪৩টি বিদ্যালয়। ফলে প্রাকৃতিকভাবেই আমরা এত কষ্টের মুখে আছি। সেখানে প্রধান শিক্ষক, সহকারী শিক্ষকের পাশাপাশি এটিইও কম। উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা একজন নেই। এসব পরিদর্শনকারী কর্মকর্তা কম থাকার কারণে অল্প লোকবল দিয়ে দেখভাল করতে হচ্ছে। মূল পরিদর্শনকারী এটিওর পদ খালি থাকায় বেশি সমস্যা হচ্ছে। এসব কারণে পড়ালেখা ব্যহত হচ্ছে ভীষণভাবে।
যে জটিলতায় সংকটের শুরু
প্রধান শিক্ষক সংকটের অন্যতম বড় কারণ দীর্ঘদিনের নিয়োগ ও পদোন্নতিসংক্রান্ত আইনি জটিলতা। প্রায় ৩২ হাজার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক পদে নিয়োগ ও পদোন্নতির প্রক্রিয়া এ জটিলতায় আটকে ছিল। ২০১৭ সালে জাতীয়করণ করা বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা অধিগ্রহণ করা বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক (চাকরির শর্তাদি) বিধিমালার জ্যেষ্ঠতা ও পদোন্নতিসংক্রান্ত ৯(১) বিধির অংশবিশেষ চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট করেন।
রিটের শুনানি শেষে ২০১৯ সালের ১১ মার্চ হাইকোর্ট ওই বিধির অংশবিশেষকে সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক ঘোষণা করে রায় দেন। পরে রাষ্ট্রপক্ষ ওই রায়ের বিরুদ্ধে লিভ টু আপিল করলে আপিল বিভাগ তা মঞ্জুর করেন এবং হাইকোর্টের রায়ের কার্যকারিতা স্থগিত করা হয়। ২০২৩ সালে রাষ্ট্রপক্ষ আপিল করে। এদিকে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সরাসরি নিয়োগ পাওয়া শিক্ষকরাও এ বিষয়ে আপিল বিভাগে আবেদন করেন।
দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ার পর চলতি বছরের ২ জুলাই হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষের করা আপিল মঞ্জুর করেন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ। এর ফলে জ্যেষ্ঠতা ও পদোন্নতি-সংক্রান্ত দীর্ঘদিনের আইনি জটিলতার অবসান ঘটে। অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল জানান, আপিল বিভাগের এ রায়ের ফলে সারাদেশের প্রায় ৩২ হাজার প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক নিয়োগের জটিলতা নিরসনের পথ খুলেছে।
এক প্রধান শিক্ষকের কাঁধে যত কাজ
প্রধান শিক্ষক শুধু বিদ্যালয়ের প্রশাসনিক প্রধান নন, বিদ্যালয়ের সার্বিক কার্যক্রমের মূল সমন্বয়কারীর দায়িত্বও পালন করতে হয় তাঁকে। প্রশাসনিক ও সাংগঠনিক কাজ থেকে শুরু করে অ্যাকাডেমিক কার্যক্রম, শিক্ষক তদারকি, আর্থিক ব্যবস্থাপনা, প্রশিক্ষণ, বিদ্যালয়ভিত্তিক উন্নয়ন পরিকল্পনা এবং তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর নানা কাজসহ সবকিছুর সঙ্গেই যুক্ত থাকতে হয় একজন প্রধান শিক্ষককে।
চলতি বছরের ২ জুলাই হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষের করা আপিল মঞ্জুর করেন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ। এর ফলে জ্যেষ্ঠতা ও পদোন্নতি-সংক্রান্ত দীর্ঘদিনের আইনি জটিলতার অবসান ঘটে। অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল জানান, আপিল বিভাগের এ রায়ের ফলে সারাদেশের প্রায় ৩২ হাজার প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক নিয়োগের জটিলতা নিরসনের পথ খুলেছে।
কুমিল্লার মুরাদনগর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের দেয়া তথ্যমতে প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পর্কে জানা যায়, একজন প্রধান শিক্ষকের বিপুল দায়িত্ব রয়েছে। সেগুলো পরিমার্জিত ও সংক্ষেপে দেওয়া হলো।
প্রধান শিক্ষকের দায়িত্বের বড় একটি অংশ জুড়ে রয়েছে বিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ও সাংগঠনিক কার্যক্রম। বিদ্যালয়ের যাবতীয় রেকর্ড, রেজিস্ট্রার ও ফাইল সংরক্ষণ, বিদ্যালয়ে গমনোপযোগী শিশুদের জরিপ, শিক্ষার্থীদের নিয়মিত উপস্থিতি নিশ্চিত করা, বার্ষিক পাঠ পরিকল্পনা ও সাপ্তাহিক রুটিন প্রণয়ন, বিভিন্ন অনুষ্ঠান আয়োজন এবং সরকারি আদেশ ও আইন সম্পর্কে শিক্ষক ও সংশ্লিষ্টদের অবহিত করার দায়িত্বও তার।
বিদ্যালয়ের ভবন, আসবাবপত্র ও অন্যান্য সম্পদের নিরাপত্তা ও সংরক্ষণ, প্রয়োজনীয় প্রতিবেদন ও রিটার্ন তৈরি করে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে পাঠানো, শিক্ষার্থীদের ট্রান্সফার সার্টিফিকেট দেওয়া, বিভিন্ন পরীক্ষা ও কর্মসূচিতে শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা, শিক্ষক-অভিভাবক সমিতি ও স্কুল ম্যানেজমেন্ট কমিটির কার্যক্রম পরিচালনাও প্রধান শিক্ষকের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। সহকারী শিক্ষকদের ছুটি, বদলি ও অন্যান্য আবেদনপত্র ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো এবং নিয়মিত সভার আয়োজন করে সেসব সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের দায়িত্বও তাকেই পালন করতে হয়।
অ্যাকাডেমিক ক্ষেত্রেও প্রধান শিক্ষকের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষার্থীরা কার্যকরভাবে শিখছে কি না, শিক্ষকরা যথাযথভাবে পাঠদান করছেন কি না এবং বিদ্যালয়ের মূল্যায়ন ও ইভালুয়েশন প্রক্রিয়া ঠিকভাবে চলছে কি না—এসব তদারক করতে হয় তাকে। শিক্ষকদের পেশাগত দক্ষতা বাড়ানো, শিক্ষার্থীদের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ, অভিভাবক ও স্থানীয় কমিউনিটিকে শিক্ষার্থীদের উন্নয়নে সম্পৃক্ত করা এবং প্রয়োজনীয় শিক্ষা উপকরণ নিশ্চিত করার দায়িত্বও রয়েছে প্রধান শিক্ষকের।
এর পাশাপাশি রয়েছে নিয়মিত তদারকির কাজ। সহকারী শিক্ষকদের উপস্থিতি নিশ্চিত করা, প্রতিদিন অন্তত দুটি শিখন-শেখানো কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করা, শিক্ষকদের দৈনিক পাঠ পরিকল্পনা ও শিক্ষা উপকরণ প্রস্তুতের বিষয়টি দেখা এবং তাঁরা অর্পিত দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করছেন কি না তা নিশ্চিত করতে হয়। নিয়মিত সভায় এসব পর্যবেক্ষণ তুলে ধরে বিদ্যালয়ের শিক্ষার মানোন্নয়নে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার দায়িত্বও প্রধান শিক্ষকের।
আর্থিক ব্যবস্থাপনাও তার দায়িত্বের বাইরে নয়। সরকারি ও স্থানীয়ভাবে পাওয়া অর্থ, আসবাবপত্র, শিক্ষা উপকরণসহ বিদ্যালয়ের সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহার নিশ্চিত করতে ক্যাশবুক ও স্টক রেজিস্টার সংরক্ষণ করতে হয়। শিক্ষক ও কর্মচারীদের মাসিক বেতন বিল তৈরি করে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে পাঠানো এবং সরকার বা স্থানীয় প্রশাসনের বিভিন্ন অর্পিত দায়িত্ব পালনও করতে হয় তাঁকে।
প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের ক্ষেত্রেও প্রধান শিক্ষককে সক্রিয় থাকতে হয়। সাব-ক্লাস্টার প্রশিক্ষণের তারিখ ও বিষয় শিক্ষকদের জানানো, প্রশিক্ষণের আয়োজন সম্পন্ন করা, প্রয়োজনীয় শিক্ষা উপকরণ ও বসার ব্যবস্থা করা এবং প্রশিক্ষণের দিন শিক্ষকদের উপস্থিতি নিশ্চিত করার দায়িত্বও তাঁর।
‘বিদ্যালয়গুলোতে সহকারী শিক্ষকের ঘাটতি তো রয়েছেই অনেক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষকও নেই। অথচ বিপুল জনসংখ্যাসমৃদ্ধ দেশের জন্য মানসম্মত স্কুলের চাহিদা রয়েছে। মানসম্মত স্কুলের জন্য প্রয়োজন মানসম্মত শিক্ষক’ -অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ বিলাল হোসাইন,জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়
বিদ্যালয়ভিত্তিক উন্নয়ন পরিকল্পনাতেও প্রধান শিক্ষকের ভূমিকা রয়েছে। এসএমসি ও শিক্ষক-অভিভাবক সমিতি গঠন, পরিকল্পনা কমিটি তৈরি, শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও স্থানীয় জনগণকে উন্নয়ন পরিকল্পনার সঙ্গে সম্পৃক্ত করা, পরিকল্পনার অর্থায়নে স্থানীয় জনগণকে উৎসাহিত করা এবং ব্যয়ের ভাউচার ও হিসাব সংরক্ষণ করতে হয় তাকে।
বর্তমানে এসব দায়িত্বের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে প্রযুক্তিনির্ভর নানা কাজও। হোয়াটসঅ্যাপ, মেসেঞ্জার, গুগল ফর্ম ও অফিসিয়াল পোর্টালের মাধ্যমে বিভিন্ন তথ্য পাঠানো, নিয়মিত অফিসের অনলাইন গ্রুপ ও ওয়েবসাইটের আপডেট দেখা, অনলাইন সভায় অংশ নেওয়া এবং বিদ্যালয়ের ল্যাপটপ, রাউটার, মডেম ও প্রজেক্টরসহ আইসিটি সরঞ্জামের ব্যবহার নিশ্চিত করতে হয় প্রধান শিক্ষককে। উপবৃত্তি, ইউনিক আইডি ও অন্যান্য অনলাইন কার্যক্রমও তাঁর তত্ত্বাবধানে সম্পন্ন করতে হয়। বিদ্যালয়ের তথ্য, শিক্ষার্থী ও শিক্ষকসংক্রান্ত বিভিন্ন তথ্যও নিয়মিত হালনাগাদ করতে হয়।
এতসব প্রশাসনিক, অ্যাকাডেমিক ও প্রযুক্তিগত দায়িত্বের মধ্যেও প্রধান শিক্ষককে নিয়মিত শ্রেণিকক্ষে পাঠদান করতে হয়। অনুমোদিত রুটিন অনুযায়ী সহকারী শিক্ষকের মতোই তাঁকে ক্লাস নিতে হয় এবং পাশাপাশি শ্রেণি পর্যবেক্ষণও করতে হয়। বিদ্যালয়ের কার্যক্রম চলাকালে অপ্রয়োজনে বাইরে না যাওয়ার নির্দেশনাও রয়েছে।
এই বিশাল দায়িত্বের বিপরীতে যখন প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য থাকে, তখন এসব কাজের বড় অংশই ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের ওপর গিয়ে পড়ে। আর তিনি নিজে সহকারী শিক্ষক হওয়ায় প্রশাসনিক দায়িত্বের পাশাপাশি নিয়মিত পাঠদানের কাজও চালিয়ে যেতে হয়। ফলে শিক্ষক সংকটের চাপ শেষ পর্যন্ত সরাসরি গিয়ে পড়ে শ্রেণিকক্ষে।
সংকট সমাধানের যে পরিকল্পনা সরকারের
শিক্ষকসংকট নিরসনে সরকার নিরলস কাজ করে যাচ্ছে বলে। ফলে বর্তমান শিক্ষক সংকট খুব শিগগীরই সমাধান হবে। ঢাকার মিরপুর-১-এ প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের সম্মেলন কক্ষে ‘কমিউনিটি এনগেজমেন্ট ইন প্রাইমারি এডুকেশন’ শীর্ষক মতবিনিময় সভায় প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ এসব জানান।
আরও খবর: ৬৪ হাজার ইয়াবাসহ দুই মাদক ব্যবসায়ী গ্রেপ্তার
সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক পদে সুপারিশপ্রাপ্ত ১৪ হাজার ৩৮৪ জন প্রার্থী আগামী ১ অক্টোবর সংশ্লিষ্ট জেলার জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসে যোগদান করবেন। সে বিষয়টি মনে করিয়ে ববি হাজ্জাজ বলেন, ‘ইতিমধ্যে সাড়ে ১৪ হাজার নিয়োগ পেয়ে তারা ট্রেনিং এ চলে যাচ্ছে অক্টোবরের শুরুতে।’
এদিকে প্রায় ৩২ হাজার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক নিয়োগ ও পদোন্নতির প্রক্রিয়া দীর্ঘ আইনি জটিলতা ও মামলাজটের কারণে দীর্ঘদিন আটকে থাকার পর চলতি বছরের জুলাই মাসে দেশের সর্বোচ্চ আদালতের রায়ে নিয়োগের পথ খুলেছে। এ প্রসঙ্গ উল্লেখ করে তিনি বলেন,' প্রথমত, ৩২ হাজার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক নিয়োগও দেওয়া শুরু করব। ফলে ওই সমস্যাও সমাধান হয়েছে। দ্বিতীয়ত, শিক্ষক ট্রান্সফারের যে প্রবলেম এটা শিক্ষকদের নতুন নীতিমালার উপরে ডিপিই এই মুহূর্তে কাজ করছে। আমরা আশাবাদী হয়তো এক মাস দু মাস ভেতরে এটারও একটা সমাধানে আসতে সক্ষম হবো।'
তিনি আরও বলেন, ‘যে দুটো কারণে টিচার ক্লাসরুমে মিসিং ওই দুটো কারণ খুব সর্বোচ্চ ১ এক বছরের মধ্যে সমাধান হবে। তাহলে টিচার নাই এই প্রবলেমটা আর থাকে না।’
অবিলম্বে সংকট দূর করার তাগিদ
শিক্ষক সংকট অবিলম্বে দূর করার তাগিদ দিয়েছেন শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা এ বিষয়ে শিক্ষক নেতা ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ বিলাল হোসাইন দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, বাংলাদেশের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক সংকটের কথা ছোটবেলাই থেকে শুনে আসছি। আজও একই কথা শুনা যায় বরং পরিস্থিতির আরো অবনতি হয়েছে। মানুষ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে অনেকটা মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে, যা আমাদের স্কুল জীবনের ঐ সময়টাতে ছিল না।
তিনি বলেন, বিদ্যালয়গুলোতে সহকারী শিক্ষকের ঘাটতি তো রয়েছেই অনেক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষকও নেই। অথচ বিপুল জনসংখ্যাসমৃদ্ধ দেশের জন্য মানসম্মত স্কুলের চাহিদা রয়েছে। মানসম্মত স্কুলের জন্য প্রয়োজন মানসম্মত শিক্ষক।
তিনি আরও বলেন, বিগত ফ্যাসিবাদী সরকারের সময়ে প্রাথমিক শিক্ষা যথাযথ গুরুত্ব পায়নি। এই অবস্থার পরিবর্তন জরুরি। দ্রুত শিক্ষক নিয়োগের পাশাপাশি অবকাঠামোগত ঘাটতি পূরণের জন্যও জোর দিতে হবে। এছাড়াও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়কে মানসম্মত ও আকর্ষণীয় করে তুলতে হবে, যাতে মানুষের আস্থা ও আগ্রহ পুনরুদ্ধার হয়।