পরকীয়ার জের: প্রধান শিক্ষককে মারধর করে চাকরি হারালেন সহকারী শিক্ষক
শরীয়তপুরের ভেদরগঞ্জে প্রধান শিক্ষককে শারীরিকভাবে আঘাত করার অভিযোগে এক সহকারী শিক্ষককে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) মো. শহীদুল ইসলাম স্বাক্ষরিত এক অফিস আদেশে এ তথ্য জানানো হয়।
আদেশে বলা হয়, উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা, ভেদরগঞ্জের স্মারক নম্বর ৩৮.০১.৮৬১৪.০০০.১৮.০০১.২৬.২৪২, তারিখ ৫ জুলাই ২০২৬-এর প্রতিবেদনের ভিত্তিতে ৮৭ নম্বর আব্বাস আলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক দেলোয়ার হোসেনের বিরুদ্ধে প্রধান শিক্ষক আলী আসাদ মিয়াকে শারীরিকভাবে আঘাত করার অভিযোগের প্রেক্ষিতে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এতে সরকারি কর্মচারী আইন, ২০১৮-এর ৩৯(১) ধারা অনুযায়ী দেলোয়ার হোসেনকে সরকারি চাকরি থেকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়।
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা মোঃ তানভীর মিয়ার পাঠানো এক প্রেস বিজ্ঞপ্তি বলা হয়, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজের নির্দেশে শরীয়তপুর জেলার ভেদরগঞ্জ উপজেলার ৮৭ নং আব্বাস আলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষককে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত ও আহত করার অভিযোগে অভিযুক্ত সহকারী শিক্ষক দেলোয়ার হোসেনের বিরুদ্ধে দ্রুত প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে জারি করা অফিস আদেশ অনুযায়ী, ঘটনার তদন্তে অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়ায় সরকারি কর্মচারী আইন, ২০১৮ অনুযায়ী সহকারী শিক্ষক দেলোয়ার হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।
এ বিষয়ে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, বিদ্যালয়ে উদ্ভূত ঘটনার পরপরই তদন্ত কমিটি গঠন করে ঘটনাস্থলে উপস্থিত ব্যক্তিদের বক্তব্য গ্রহণ, সংশ্লিষ্টদের জিজ্ঞাসাবাদ এবং প্রয়োজনীয় তথ্য-প্রমাণ পর্যালোচনা করা হয়। তদন্তে প্রধান শিক্ষককে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করার অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা প্রতীয়মান হওয়ায় আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করা হয়।
প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ বলেন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কোনো ধরনের সহিংসতা, অসদাচরণ বা শৃঙ্খলাভঙ্গের কোনো সুযোগ নেই। শিক্ষক সমাজের মর্যাদা ও শিক্ষাঙ্গনের সুষ্ঠু পরিবেশ রক্ষায় সরকার জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করছে। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে দ্রুত ও নিরপেক্ষভাবে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
ববি হাজ্জাজ এ ঘটনায় দায়িত্বশীল সংবাদ প্রকাশের জন্য গণমাধ্যমকর্মীদের আন্তরিক ধন্যবাদ জানান। তিনি বলেন, দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা প্রশাসনকে আরও জবাবদিহিমূলক ও কার্যকর হতে সহায়তা করে। গণমাধ্যমের তথ্যের ভিত্তিতে দ্রুত তদন্ত ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ সম্ভব হয়েছে। শিক্ষাঙ্গনে অনিয়ম, সহিংসতা বা দুর্নীতির বিষয়ে তথ্য তুলে ধরতে গণমাধ্যমের গঠনমূলক ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভবিষ্যতেও সরকার গণমাধ্যমের সঙ্গে সমন্বয় রেখে শিক্ষার মানোন্নয়ন ও সুশাসন নিশ্চিত করতে কাজ করবে।
আরেক চিঠিতে বলা হয়, শরীয়তপুর জেলার ভেদরগঞ্জ উপজেলার সখিপুর থানাধীন ৮৭ নং আব্বাস আলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক দেলোয়ার হোসেন উক্ত বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক জনাব আলী আসাদ মিয়াকে গত ২ জুলাই বিদ্যালয়ের অফিস কক্ষে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করেন মর্মে ফেসবুকে সংবাদ প্রচারিত হয়। প্রচারিত সংবাদের প্রেক্ষিতে নিম্নস্বাক্ষরকারী ৫ জুলাই সরেজমিনে ঘটনার তদন্ত করি। তদন্তে সহকারী জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার, উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার, সংশ্লিষ্ট ক্লাস্টারের উপজেলা সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার, বিদ্যালয়ের ১০ জন শিক্ষক, সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান, স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত ছিলেন। উপস্থিত ব্যক্তিবর্গের লিখিত এবং মৌখিক বর্ণনায় ঘটনার প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া যায়।
ঘটনার বিবরণে জানা যায় যে, সহকারী শিক্ষক দেলোয়ার হোসেন নৈমিত্তিক ছুটির আবেদন করলে প্রধান শিক্ষক তার আবেদন অনুমোদনে অসম্মতি জ্ঞাপন করেন। ফলে উক্ত সহকারী শিক্ষক দেলোয়ার হোসেন প্রধান শিক্ষক জনাব আলী আসাদ মিয়ার উপর ক্ষুদ্ধ হয়ে তার নিকট তেড়ে আসেন এবং শারীরিকভাবে তাকে আঘাত করেন।
তদন্তে আরো জানা যায়, সহকারী শিক্ষক দেলোয়ার হোসেন এর স্ত্রী জনাব শাহানাজ এর সাথে পারিবারিক ঝগড়া কলহ লেগে থাকতো। প্রধান শিক্ষক আলী আসাদ মিয়া সহকারী শিক্ষক দেলোয়ার হোসেন এবং তার স্ত্রীর ঝগড়া কলহ মিমাংসার দায়িত্ব নিয়ে সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন। এ বিষয়টি নিয়ে প্রধান শিক্ষক আলী আসাদ মিয়া এবং সহকারী শিক্ষক জনাব দেলোয়ার হোসেন এর মধ্যে মতবিরোধ ও দ্বন্দ্বের সৃষ্টি হয়। ফলশ্রুতিতে দেলোয়ার হোসেন প্রধান শিক্ষক জনাব আলী আসাদ মিয়ার বিরুদ্ধে এ দপ্তরে অভিযোগ দাখিল করেন। উক্ত অভিযোগের তদন্ত প্রতিবেদন বিভাগীয় উপপরিচালক, প্রাথমিক শিক্ষা, ঢাকা বিভাগ, ঢাকা মহোদয়ের দপ্তরে প্রেরণ করা হয়। উক্ত অভিযোগের বিষয়ে প্রধান শিক্ষক আলী আসাদ মিয়ার বিরুদ্ধে বিভাগীয় উপপরিচালকের কার্যালয়ে বিভাগীয় মামলা চলমান রয়েছে।
উল্লিখিত বিষয়ের আলোকে প্রতীয়মান হয় যে, ৮৭ নং আব্বাস আলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক দেলোয়ার হোসেন উক্ত বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক জনাব আলী আসাদ মিয়াকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত ও আঘাত করার বিষয়টির প্রাথমিক সত্যতা প্রমানিত হয়। তবে প্রধান শিক্ষক জনাব আলী আসাদ মিয়ার সাথে সহকারী শিক্ষক জনাব দেলোয়ার হোসেন এর স্ত্রীর সম্পর্কের জের ধরে সৃষ্ট মতবিরোধ ও দ্বন্দ্বের কারণে এঘটনা ঘটেছে বলে প্রতীয়মান হয়।
অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা প্রমানিত হওয়ায় দেলোয়ার হোসেন, সহকারী শিক্ষক, ৮৭ নং আব্বাস আলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ভেদরগঞ্জকে অত্রাফিসের স্মারক নং ৩৮.০১.৮৬০০,০০০,০৪,০৬৪.২৬-৫৯৭, তারিখ: ০৫/০৭/২০২৬ খ্রি. মুলে সাময়িক বরখাস্ত করা হয় এবং তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা প্রক্রিয়াধীন।