প্রাথমিকের বৃত্তির ফল প্রকাশে বিলম্ব, উদ্বেগ-অপেক্ষায় ৬ লাখের বেশি শিক্ষার্থী-অভিভাবক
প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষা শেষ হওয়ার আড়াই মাস পার হলেও এখনো ফলাফল প্রকাশ করতে পারেনি প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর। কবে নাগাদ ফল প্রকাশ করা হবে, সে বিষয়ে নিশ্চিত কোনো তথ্য না থাকায় অপেক্ষার প্রহর দীর্ঘ হচ্ছে প্রায় ৬ লাখেরও বেশি শিক্ষার্থীর। ফল প্রকাশে দেরির কারণ নিয়েও স্পষ্ট ব্যাখ্যা না থাকায় ক্ষোভ ও হতাশা বাড়ছে শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও শিক্ষকদের মধ্যে।
গত এপ্রিল মাসে সারা দেশে একযোগে এই বৃত্তি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। পার্বত্য তিন জেলা ছাড়া দেশের অন্যান্য জেলায় ১৫ থেকে ১৮ এপ্রিল পর্যন্ত পরীক্ষা নেওয়া হয়। আর পার্বত্য তিন জেলা—রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবানে বিশেষ সময়সূচিতে ১৭ থেকে ২০ এপ্রিল পর্যন্ত পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। পরীক্ষা শেষ হওয়ার এক মাসের মধ্যে ফল প্রকাশের কথা থাকলেও এখনো তা সম্ভব হয়নি প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের পক্ষে।
শুরুতে মে মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে ফল প্রকাশের সম্ভাব্য সময় নির্ধারণ করা হয়েছিল। তবে সেই সময় পেরিয়ে গেলেও কোনো অগ্রগতি হয়নি। এরপর মে ও জুন মাস পার হলেও ফল প্রস্তুত ও প্রকাশের কাজ শেষ হয়নি। অন্যদিকে এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার ফল সাধারণত ৬০ দিনের মধ্যেই প্রকাশ করা হয়ে থাকে।
ক্ষোভ ও হতাশা বাড়ছে অভিভাবক ও শিক্ষকদের
অভিভাবক ও শিক্ষকরা বলছেন, নির্ধারিত সময়ের প্রায় চার মাস দেরিতে বৃত্তি পরীক্ষা হওয়ায় শিক্ষার্থীরা শুরু থেকেই মানসিক চাপে ছিল। ষষ্ঠ শ্রেণির পড়াশোনার পাশাপাশি পঞ্চম শ্রেণির সিলেবাস অনুযায়ী অতিরিক্ত প্রস্তুতি নিয়ে তাদের পরীক্ষা দিতে হয়েছে। এখন ফল প্রকাশেও দেরি হওয়ায় সেই চাপ আরও বেড়েছে বলে মনে করছেন তারা। এতে শিক্ষার্থীদের স্বাভাবিক পড়াশোনার গতি ব্যাহত হচ্ছে এবং ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষাজীবনেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক অভিভাবক বলেন, পরীক্ষা শেষ হওয়ার পর ফল প্রকাশে এত দেরি হওয়ায় সন্তানদের মধ্যে এক ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। তারা স্বাভাবিক পড়াশোনায় পুরোপুরি মনোযোগ দিতে পারছে না। ফল কখন আসবে—এই অপেক্ষাটাই এখন শিশুদের জন্য চাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিষয়টি দ্রুত সমাধান হলে ভালো হতো।
প্রাথমিক সহকারী শিক্ষক সমিতির কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি মোহাম্মদ শামসুদ্দিন বলেন, প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষার ফল প্রকাশে দীর্ঘ সময় লাগায় শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে এক ধরনের উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ফল প্রকাশে বিলম্বের কারণে অভিভাবকরা নিয়মিতভাবে তাদের কাছে জানতে চাইছেন, কবে ফল প্রকাশ হবে। আমরা শিক্ষকরাও আমাদের শিক্ষার্থীদের ফলাফলের অপেক্ষায় রয়েছি।
অভিভাবক ঐক্য ফোরামের সভাপতি মো. জিয়াউল কবির দুলু দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, সরকারের কাছে দাবি থাকবে দ্রুত প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষার ফল প্রকাশ করা হোক। দীর্ঘসময়েও ফল প্রকাশ না হওয়ার কারণে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সব ধরনের পরীক্ষার ফলই সাধারণত দুই মাসের মধ্যে প্রকাশ করা হয়ে থাকে। তাই এই ফলও দ্রুত প্রকাশ করা উচিত ছিল।
যে কারণে ফল প্রকাশে বিলস্ব
প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক শাহীনা ফেরদৌসী জানিয়েছিলেন, বৃত্তি পরীক্ষার ফল দ্রুত প্রকাশের লক্ষ্যে কাজ চলছে। তবে কবে নাগাদ ফল প্রকাশ হবে তা নিয়ে কিছু বলেননি তিনি।
সবশেষ গত রোববার (২৮ জুন) উপপরিচালক (সংস্থাপন) এ. এস. এম. সিরাজুদ্দোহা দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, “এ সপ্তাহে ফল প্রকাশ হচ্ছে না। আমরা চেষ্টা করছিলাম, কিন্তু আরও কিছু সময় লাগবে। জুলাইয়ের দ্বিতীয় সপ্তাহে ফল প্রকাশের সম্ভাবনা রয়েছে।”
জানা গেছে, আগামীকাল বুধবার (১ জুলাই) মন্ত্রণালয়ে প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশ নিয়ে একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। সেখানে এবিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত আসতে পারে।
ফল প্রকাশে দেরির কারণ সম্পর্কে জানতে চাইলে অধিদপ্তরের একাধিক কর্মকর্তা দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে জানান, বিভিন্ন কারণে ফল প্রকাশে বিলম্ব হচ্ছে। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, আইটি-নির্ভর কারিগরি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে সময় লাগছে। পাশাপাশি সতর্কতার সঙ্গে কাজ করায় সময় বেশি লাগছে বলেও জানান তারা।
এছাড়া অধিদপ্তরের চলমান বিভিন্ন কর্মসূচিও সময়সূচিতে প্রভাব ফেলেছে বলে জানান কর্মকর্তারা। তাঁদের মতে, জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা পদক প্রতিযোগিতা, পিটিআই সাংস্কৃতিক ও ক্রীড়া প্রতিযোগিতা এবং প্রাথমিক বিদ্যালয় গোল্ড কাপ ফুটবল টুর্নামেন্টের কারণে ফল প্রকাশের কাজ পিছিয়ে যায়।
ফল জানা যাবে অনলাইনে ও এসএমএসে
অধিদপ্তর জানিয়েছে, ফল প্রকাশের পর শিক্ষার্থীদের অভিভাবকেরা অনলাইন ও মোবাইল এসএমএসের (SMS) মাধ্যমে ফল জানতে পারবেন। অনলাইনে ফল দেখার জন্য ‘আইপিইএমআইএস’ (IPEMIS) পোর্টাল ব্যবহার করতে হবে।
বৃত্তি পাবে ৮২ হাজার ৫০০ শিক্ষার্থী
শিক্ষামন্ত্রী জানান, এ বছর মোট ৮২ হাজার ৫০০ শিক্ষার্থী বৃত্তি পাবে। এর মধ্যে মেধাবৃত্তি পাবে ৩৩ হাজার শিক্ষার্থী। মেধাবৃত্তির ক্ষেত্রে সরকারি বিদ্যালয়ের জন্য ২৭ হাজার ৫০০ এবং বেসরকারি বিদ্যালয়ের জন্য ৫ হাজার ৫০০টি বৃত্তি নির্ধারণ করা হয়েছে। অন্যদিকে সাধারণ বৃত্তি পাবে ৪৯ হাজার ৫০০ শিক্ষার্থী, যার মধ্যে সরকারি বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য ৪১ হাজার ২৫০ এবং বেসরকারি বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য ৮ হাজার ২৫০টি বৃত্তি বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
তিনি আরও জানান, মেধাবৃত্তিপ্রাপ্ত শিক্ষার্থীরা এককালীন ২২৫ টাকা এবং প্রতি মাসে ৩০০ টাকা করে পাবে। সাধারণ বৃত্তিপ্রাপ্ত শিক্ষার্থীদেরও এককালীন ২২৫ টাকা দেওয়া হবে এবং তারা মাসিক ২২৫ টাকা করে ভাতা পাবে। আগামী বছর এই বৃত্তির পরিমাণ বাড়ানোর বিষয়টি বিবেচনা করা হবে বলেও জানান তিনি। বিদ্যালয়ভর্তি
নীতিমালা অনুযায়ী, বৃত্তি দেওয়া হবে দুটি ক্যাটাগরিতে— ‘ট্যালেন্টপুল’ ও ‘সাধারণ’। উভয় ক্যাটাগরিতেই ৫০ শতাংশ ছাত্র এবং ৫০ শতাংশ ছাত্রীর জন্য কোটা সংরক্ষিত থাকবে। ট্যালেন্টপুল বৃত্তির ক্ষেত্রে উপজেলা বা থানাভিত্তিক মেধাক্রম অনুসরণ করা হবে। অন্যদিকে সাধারণ বৃত্তির ক্ষেত্রে ইউনিয়ন বা ওয়ার্ডভিত্তিক মেধার ভিত্তিতে শিক্ষার্থী নির্বাচন করা হবে।
উল্লেখ্য, প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের বৃত্তি পরীক্ষায় মোট ৬ লাখ ৪০ হাজার শিক্ষার্থী অংশগ্রহণ করেছে। এর মধ্যে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রায় সাড়ে ৫ লাখ এবং বেসরকারি বিদ্যালয়ের প্রায় ৯০ হাজার শিক্ষার্থী রয়েছে।