২৭ জুন ২০২৬, ১৯:৩২

প্রাথমিকে যোগদান নিয়ে ছিলেন হতাশায়, গভীর রাতে রেললাইনে পাওয়া গেল ঢাবি ছাত্রের লাশ

সাইদুল ইসলাম  © সংগৃহীত

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) ২০১৩ -১৪ সেশনের বিশ্বধর্ম ও সংস্কৃতি বিভাগের শিক্ষার্থী সাইদুল ইসলাম (৩০)। ছিলেন হাজী মুহম্মদ মুহসীন হলের আবাসিক ছাত্র। সহকারী শিক্ষক নিয়োগ-২০২৫ পদে চূড়ান্ত সুপারিশপ্রাপ্ত ১৪ হাজার ৩৮৪ জনের একজন তিনি। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর যখন স্বপ্ন পূরণের দুয়ারে পৌঁছানোর কথা, ঠিক তখনই রেললাইনে হাটতে গিয়ে নিথর দেহ হয়ে ফিরলেন প্রাথমিকের সহাকারী শিক্ষক নিয়োগপ্রত্যাশী। 

গত বৃহস্পতিবার (২৫ জুন) গভীর রাত ৩টার দিকে মালবাহী ট্রেনের ধাক্কায় কুমিল্লার শাসনগাছা এলাকায় মৃত্যু হয় তার। তবে দুর্ঘটনায় মৃত্যু নাকি আত্মহত্যা তা নিয়ে তৈরি হয়েছে ধোঁয়াশা। পরিবার ও স্বজনদের দাবি প্রাথমিকে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েও দীর্ঘদিনেও নিয়োগ না হওয়ায় হতাশ ভুগছিলেন সাইদুল। 

কুমিল্লার বুড়িচং উপজেলার তালুয়া গ্রামের বাসিন্দা সাইদুল ইসলাম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শেষ করেছিলেন। অনেক আগেই বাবাকে হারানো পরিবারে তিন ভাই ও এক বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন মেঝ। পরিবারের আর্থিক দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিতে একটি সরকারি চাকরিই ছিল তার সবচেয়ে বড় স্বপ্ন। সেই স্বপ্নের খুব কাছেও পৌঁছেছিলেন তিনি। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক পদে সুপারিশপ্রাপ্ত হন। কিন্তু নিয়োগ প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হওয়ায় সেই স্বপ্ন আর বাস্তবে রূপ নেয়নি।

সহপাঠী ও স্বজনরা জানান,  দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক চাকরির পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করলেও কাঙ্ক্ষিত সাফল্য না পাওয়ায় মানসিক চাপ ও হতাশার মধ্য দিয়ে সময় পার করছিলেন। সম্প্রতি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক পদে সুপারিশপ্রাপ্ত হলেও দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হওয়ার পরও যোগদান প্রক্রিয়া সম্পন্ন না হওয়ায় তিনি উদ্বিগ্ন ছিলেন।

সুপরিশপ্রাপ্ত ১৪ হাজার শিক্ষকদের নিয়োগ আন্দোলনের প্রতিনিধি দেবব্রত সরকার দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, আমরা তার মৃত্যুর বিষয়টি চিন্তিত। কারণ আত্মহত্যা না দুর্ঘটনা এখনও নিশ্চিত হতে পারিনি। আমাদের কুমিল্লায় যারা আছে তারা খোঁজ নিচ্ছে। নিয়োগ জটিলতার কারণে আমাদের সবার মধ্যেই হতাশা আছে, তারমধ্যেও থাকা স্বাভাবিক। তিনি ঢাকাতেও আন্দোলনে অংশ নিয়েছিল আমাদের সাথে। 

কুমিল্লার লাকসাম রেলওয়ে পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জসিম উদ্দিন দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে জানান, খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহ উদ্ধার করে এবং পরবর্তী তদন্তের জন্য মামলাটি পিবিআই ও সিআইডির কাছে হস্তান্তর করে। নিহতের আঙুলের ছাপ সংগ্রহের মাধ্যমে পরিচয় নিশ্চিত করা হয়। পরে পরিবারের সদস্যদের খবর দিলে তারা এসে মরদেহ শনাক্ত করেন। ময়নাতদন্ত শেষে মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়।

প্রতক্ষদর্শীদের বরাত দিয়ে তিনি বলেন, ঘটনাস্থলে প্রাথমিকভাবে জানা যায়, ওই ব্যক্তি রেললাইন ধরে হেঁটে যাচ্ছিলেন। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, ট্রেনের শব্দ হয়তো তিনি শুনতে পাননি বা সরে যেতে পারেননি। এলাকাটি রেললাইন পারাপারের নির্ধারিত স্থান নয়; বরং তিনি রেললাইন ধরে কুমিল্লার দিকে হাঁটছিলেন। ঘটনাটি আত্মহত্যা নাকি দুর্ঘটনা—এ বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।

নিহত সাইদুল ইসলামের ছোট ভাই কাওসার ইসলাম দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, পুলিশ আমাদের জানিয়েছে, এটি একটি ট্রেন দুর্ঘটনা। ঘটনার সময় কীভাবে দুর্ঘটনা ঘটেছে, সে বিষয়ে পরিবার নিশ্চিত নয়। 
 
তিনি জানান, সাইদুল কিছুদিন ধরে চাকরি নিয়ে হতাশায় ভুগছিলেন। প্রায়ই বন্ধু-বান্ধব ও পরিবারের সদস্যদের কাছে চাকরি না হওয়া নিয়ে দুশ্চিন্তার কথা বলতেন। তবে এর বাইরে তিনি মানসিকভাবে সুস্থ ছিলেন। আমাদের বিশ্বাস এটি আত্মহত্যা নয়, বরং ট্রেনের সঙ্গে ধাক্কা লেগে দুর্ঘটনায় মৃত্যু হয়েছে। আত্মহত্যা করলে ঘটনাস্থলের আলামত ভিন্ন ধরনের হতো। আমাদের কাছে মনে হয়েছে ট্রেনের সঙ্গে ধাক্কা লেগেই তার মৃত্যু হয়েছে।

তিনি আরও জানান, দুর্ঘটনার কোনো সিসিটিভি ফুটেজ পরিবার পায়নি। পুলিশ তাদের জানিয়েছে, ঘটনাস্থলের ক্যামেরা থেকে কার্যকর কোনো ফুটেজ পাওয়া যায়নি। ফলে ঠিক কীভাবে ঘটনাটি ঘটেছে, তা এখনও স্পষ্ট নয়।

সাইদুল শাসনগাছা কেন গিয়েছিলেন জানতে চাইলে কাওসার বলেন, কী কারণে শাসনগাছা এলাকায় গিয়েছিলেন, তা আমরা জানি না। তবে কুমিল্লা শহরে তার বন্ধু-বান্ধব ছিলেন এবং তিনি মাঝে-মধ্যে সেখানে যেতেন। 

কাওসার ইসলাম বলেন, আমরা আমাদের ভাইয়ের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানতে চাই। এটি কীভাবে ঘটেছে, সে বিষয়ে প্রশাসনের কাছে নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু তদন্তের দাবি জানাচ্ছি। কোনো ধরনের গুজব বা অনুমানের ভিত্তিতে নয়, প্রকৃত সত্য উদঘাটন হোক—এটাই আমাদের পরিবারের চাওয়া।