যোগ্য শিক্ষকের তালিকায় দক্ষিণ এশিয়ায় তলানিতে বাংলাদেশ
বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা বহুদিনের পুরনো। গুনগত শিক্ষা নিশ্চিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর হচ্ছেন শিক্ষকেরা। কিন্তু মাঠ পর্যায়ের বাস্তব পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে দেখা যাচ্ছে, ঢাকা, সিলেট বা রাজশাহীর কোনো একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রতি তিনজন শিক্ষকের মধ্যে প্রায় একজন সরকারনির্ধারিত ন্যূনতম যোগ্যতার মানদণ্ড পূরণ করতে পারছেন না। যদিও পাশ্ববর্তী দেশগুলোতে সংখ্যাটা প্রতি ১০ জনে একজন। বিশ্লেষকরা বলছেন, সংকটটি ‘গুরুতর’। অভিযোগ, গত এক দশকের শিক্ষা ব্যবস্থার এই গুরুতর সংকটটি নিয়ে বলতে গেলে কোন আলোচনায় হয়নি।
২০১৫ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে করা ইউনেস্কোর পরিসংখ্যান ইনস্টিটিউটের ওয়ার্ল্ড এডুকেশন স্ট্যাটিস্টিকস-২০২৫ প্রতিবেদনে দেখা যায়, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর তুলনায় প্রতিটি স্তরেই বাংলাদেশ নিচের দিকে অবস্থান করছে। প্রাথমিক, নিম্ন মাধ্যমিক, মাধ্যমিক কিংবা উচ্চ মাধ্যমিক সব ক্ষেত্রেই একই চিত্র পাওয়া গেছে। বাংলাদেশের এই নিম্ন অবস্থান নীতিনির্ধারক ও অভিভাবকদের জন্য উদ্বেগজনক।
২০২২ থেকে ২০২৪ সালের সাম্প্রতিক আঞ্চলিক তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ভারতে প্রতিটি স্তরে ৯০ শতাংশের বেশি শিক্ষক ন্যূনতম যোগ্যতা পূরণ করেছেন। সীমিত সম্পদ থাকা সত্ত্বেও নেপালে প্রাথমিক থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পর্যন্ত এই হার ৯২ শতাংশের বেশি। জনসংখ্যায় অনেক ছোট দেশ ভুটানও প্রাথমিক ও নিম্ন মাধ্যমিকে শতভাগ যোগ্য শিক্ষক নিশ্চিত করেছে।
অন্যদিকে বাংলাদেশে ২০২২-২৪ সময়ে উচ্চ মাধ্যমিকে যোগ্য শিক্ষকের হার মাত্র ৫৯.২ শতাংশ। অর্থাৎ প্রায় ৪০ শতাংশ শিক্ষকই প্রয়োজনীয় ন্যূনতম যোগ্যতা ছাড়াই পাঠদান করছেন। প্রাথমিক স্তরে এই হার কিছুটা ভালো, ৭৬.৩ শতাংশ। তবুও সেখানে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিক্ষার্থী কম যোগ্য শিক্ষকের কাছে থেকে শিখছেন।
এমনকি শিক্ষাখাতে তুলনামূলক পিছিয়ে থাকা পাকিস্তানও উচ্চ মাধ্যমিকে বাংলাদেশকে ছাড়িয়ে গেছে। সেখানে যোগ্য শিক্ষকের হার ৭৩.৪ শতাংশ, যেখানে বাংলাদেশে ৫৯.২ শতাংশ। মালদ্বীপে সাম্প্রতিক সময়ে প্রাথমিক স্তরে কিছুটা পতন দেখা গেলেও মাধ্যমিক পর্যায়ে তারা এখনও বাংলাদেশের চেয়ে এগিয়ে। শ্রীলঙ্কায় সামান্য নিম্নমুখী প্রবণতা থাকলেও প্রাথমিক স্তরে তাদের হার এখনও আশির ঘরে।
এক দশকের ধারাবাহিক দুর্বলতা
অনেকেই বলছেন, একটি নির্দিষ্ট সময়ের তথ্য পুরো বাস্তবতাকে তুলে ধরে না। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি গড় হিসাব বলছে ভিন্ন কথা। ২০১৫ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে সব স্তর মিলিয়ে যোগ্য শিক্ষকের হার গড়ে ৬০ থেকে ৬৩ শতাংশের মধ্যে ছিল। একই সময়ে ভারতে এই হার ৮৩ থেকে ৮৬ শতাংশে পৌঁছেছে। নেপালেও গড় হার ৮৬ শতাংশের বেশি। ভুটান প্রায় পুরো সময়জুড়েই শতভাগের কাছাকাছি অবস্থান ধরে রেখেছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এর ফলে বাংলাদেশের এই পরিস্থিতি কোনো সাময়িক সমস্যার প্রতিফলন নয়। এক-দুই বছরের ব্যতিক্রমও নয় এটি। বরং এ পরিস্থিতি বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার কাঠামোগত দুর্বলতাকে নির্দেশ করছে। তারা বলছেন, এই পরিসংখ্যান ইঙ্গিত করে যে সরকার বিভিন্ন নীতি এবং শিক্ষা পরিকল্পনা করলেও অবস্থা খুব বেশি পরিবর্তন হয়নি।
শিক্ষকের যোগ্যতা শুধু প্রশাসনিক বিষয় নয়। শিক্ষা অর্থনীতির দীর্ঘ গবেষণায় দেখা গেছে, শিক্ষার্থীর শেখার মান নির্ধারণে শিক্ষকের গুণগত মান সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি। যে শিক্ষক ন্যূনতম যোগ্যতা পূরণ করেন না, তিনি রাষ্ট্র নির্ধারিত মৌলিক জ্ঞান ও প্রশিক্ষণের মানদণ্ডেই উত্তীর্ণ নন।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাংলাদেশ ইতোমধ্যে বিদ্যালয়ে ভর্তির হার ও লিঙ্গসমতায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। কিন্তু শিক্ষকের যোগ্যতার এই ঘাটতি শিক্ষার মান উন্নয়নে একটি বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। শিক্ষার প্রকৃত মান নির্ভর করে বিদ্যালয়ে গিয়ে শিশুরা কি শিখছে, তাদের সামনে দাড়িয়ে কে পড়াচ্ছে তাদের মানের ওপর। শিক্ষা ব্যবস্থার এই সংকট থেকে কিভাবে উত্তরণ করা হবে, কতদ্রুত হবে সেই প্রশ্ন এখন বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকের ভাবনার কেন্দ্রে চলে এসেছে। তথ্য উপাত্ত পরিষ্কারভাবে দেখিয়ে দিচ্ছে চ্যালেঞ্জটি বড় এবং তা উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।