মাধ্যমিকে পড়ুয়ারা বসবে প্রাথমিকের বৃত্তি পরীক্ষায়, মিশ্র প্রতিক্রিয়া
আইনি জটিলতা কাটিয়ে আগামী এপ্রিল মাসের মাঝামাঝি সময়ে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ২০২৫ সালের প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষা। ৪০০ নম্বরের সিলেবাসে এ পরীক্ষাটি মূলত খুদে শিক্ষার্থীদের মেধার স্বীকৃতি প্রদান করা হয়। চলতি সপ্তাহে প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষা নীতিমালা প্রকাশ করেছে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর। এর আগে গত সপ্তাহে অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ডিজি) আবু নূর মো. শামসুজ্জামান দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে জানিয়েছিলেন, আগামী ১৬ ও ১৭ এপ্রিল এই পরীক্ষা আয়োজন করা হতে পারে। তবে মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনের পর পরীক্ষার রুটিন প্রকাশ করা হলে তখন চূড়ান্তভাবে জানা যাবে দিনক্ষণ।
খুদে শিক্ষার্থীর মেধার বিকাশ, স্বীকৃতি এবং সংশ্লিষ্ট বিদ্যালয়কে অনুপ্রেরণা, উৎসাহ ও উদ্দীপনা জোগানোর মাধ্যমে মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষার সফল বাস্তবায়নের লক্ষ্যে এই পরীক্ষা নেওয়া হয়। শিক্ষার্থীদের মেধার স্বীকৃতি প্রদান করার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের মেধার বিকাশ ও পৃষ্ঠপোষকতা প্রদানের মাধ্যমে মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা বাস্তবায়নের পথ সুগম করাও এর উদ্দেশ্য।
জানা গেছে, দেশে প্রাথমিক ও মাধ্যমিকের শিক্ষাবর্ষ শুরু হয় বছরের প্রথমদিন থেকে, অর্থাৎ পহেলা জানুয়ারি। প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষা ২০২৫-এ যারা বসবে, তারা এখন মাধ্যমিক পর্যায়ের ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ছে দুই মাসের বেশি সময় ধরে। এরমধ্যে প্রায় দেড় মাসের লম্বা ছুটি চলছে এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে। ফলে নিজেদের শ্রেণির নিয়মিত পড়াশোনার পাশাপাশি তাদের আবার এখন পঞ্চম শ্রেণির বৃত্তি পরীক্ষারও প্রস্তুতি নিতে হবে। যা পড়াশোনার বাড়তি চাপ বলে মনে করেন শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের অভিভাবকরা। যা নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে।
এবারই প্রথম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাশাপাশি বেসরকারি ও কিন্ডারগার্টেন শিক্ষার্থীরাও এই পরীক্ষায় অংশ নেবে। বৃত্তি পরীক্ষা নীতিমালায় বলা হয়েছে, পাঁচটি বিষয়ে চারটি পরীক্ষা মোট ৪০০ নম্বরের ওপর বৃত্তি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে। এগুলোর মধ্যে বাংলা, ইংরেজি ও গণিতে ১০০ নম্বর করে এবং প্রাথমিক বিজ্ঞান ও বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয়ে ৫০ নম্বর করে বরাদ্দ থাকবে। তবে প্রাথমিক বিজ্ঞান ও বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় পরীক্ষা একসঙ্গে অনুষ্ঠিত হবে। পরীক্ষার সময় আড়াই ঘণ্টা করে।
নীতিমালার তথ্য বলছে, ট্যালেন্টপুল বৃত্তি ও সাধারণ বৃত্তি প্রাপ্তির জন্য প্রতি বিষয়ে ন্যূনতম শতকরা ৪০ নম্বর পেতে হবে। সর্বোচ্চ নম্বরের ভিত্তিতে শিক্ষার্থীদের বৃত্তি প্রদান করা হবে। সরকারি ও বেসরকারি বিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের চতুর্থ শ্রেণির সকল প্রাপ্তিকের সামষ্টিক মূল্যায়নের ফলাফলের ভিত্তিতে শতকরা সর্বোচ্চ ৪০ জন শিক্ষার্থী প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে পারবে।
শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন গত ২৬ ফেব্রুয়ারি এক সংবাদ সম্মেলনে জানান, গত বছরের প্রাথমিকের বৃত্তি পরীক্ষা আগামী এপ্রিলে নেওয়া হবে। এ পরীক্ষায় কিন্ডারগার্টেনের শিক্ষার্থীরাও অংশগ্রহণের সুযোগ পাবে ।
শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রাথমিকের সঙ্গে দেশের মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোতেও রমজানের ছুটি চলছে গত ১৯ ফেব্রুয়ারি থেকে। ২৬ মার্চ পর্যন্ত এই ছুটি চলবে। টানা বন্ধে শিক্ষার্থীরা এমনিতেই পড়াশোনা থেকে দূরে থাকে। এর মাঝে ক্লাস শুরুর পরপরই প্রাথমিকের বৃত্তি পরীক্ষা। পঞ্চম ও ষষ্ঠ শ্রেণির পাঠ্য বিষয় সম্পূর্ণভাবে আলাদা। একসঙ্গে দুই ক্লাসের পড়াশোনা নিয়ে প্রচণ্ড চাপে থাকবে এই পরীক্ষায় অংশ নেওয়ারা।
রাজধানীর মিরপুরে সানজিদা আলম নামে এক অভিভাবক বলেন, ষষ্ঠ শ্রেণিতে নিয়মিত ক্লাস-পরীক্ষার পাশাপাশি প্রাথমিকের বৃত্তি পরীক্ষার প্রস্তুতিও নিতে হবে। যা তাদের ওপর অতিরিক্ত মানসিক চাপ সৃষ্টি করবে। ফলে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
বাংলাদেশ প্রাথমিক বিদ্যালয় সহকারী শিক্ষক সমিতির সভাপতি মোহাম্মদ শামছুদ্দীন মাসুদ বলেন, যথাসময়ে এই পরীক্ষা না হওয়ায় পরীক্ষার প্রস্তুতি নিতে গিয়ে শিক্ষার্থীরা প্রেশারে পড়বে। এরমধ্যে টানা স্কুল বন্ধ। ফলে শিক্ষার্থী অংশগ্রহণ কতটুকু করবে তা শঙ্কা থেকে যাবে। কারণ তারা তো হাইস্কুলে চলে গেছে। এখন আবার প্রাথমিকের বৃত্তি পরীক্ষার প্রস্তুতি নিতে হবে।
অভিভাবক ঐক্য ফোরামের সভাপতি জিয়াউল কবির দুলু বলেন, তেমন সমস্যা হবে না। বরং প্রস্তুতি আরও ভালো হবে। কেননা তারা এ পাঠ আগেই সম্পন্ন করেছে। আর যারা বৃত্তি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করছে তারা মূলত ওই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ওই শ্রেণির সব চেয়ে ভালো শিক্ষার্থী। এজন্য তাদের তেমন কোনো বেগ পেতে হবে না।
প্রাথমিকের বৃত্তি পরীক্ষার ইতিহাস
২০০৮ সাল পর্যন্ত পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের আলাদাভাবে এই বৃত্তি পরীক্ষা নেওয়া হতো। তবে ২০০৯ সালে সেটি বন্ধ করে দেওয়া হয়। এর পরিবর্তে ওই বছর থেকেই সারা দেশে অভিন্ন প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষা চালু করা হয়েছিল এবং এই পরীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতেই শিক্ষার্থীদের বৃত্তি দেওয়া হতো।
করোনা মহামারীর কারণে ২০২০ ও ২০২১ সালে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষা হয়নি। পরবর্তীতে ২০২২ সালে পরীক্ষামূলকভাবে আবারও আলাদাভাবে বৃত্তি পরীক্ষা নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু ২০২৩ ও ২০২৪ সালে তা আবারও স্থগিত থাকে।
দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকার পর ২০২৫ সাল থেকে পুনরায় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পঞ্চম শ্রেণিতে বৃত্তি পরীক্ষা নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় অন্তর্বর্তী সরকার। সে অনুযায়ী কেবল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত হলে তা ‘বৈষম্যমূলক’ দাবি করে বেসরকারি ও কিন্ডারগার্টেন–সংশ্লিষ্ট কয়েকজন অভিভাবক ও শিক্ষক হাইকোর্টে রিট করেন।
শুনানি শেষে আদালত প্রথমে সংশ্লিষ্ট সিদ্ধান্তের কার্যক্রম স্থগিত করেন এবং পরে রায়ে সরকারি বিদ্যালয়ের পাশাপাশি বেসরকারি, রেজিস্টার্ড কিন্ডারগার্টেন ও অনুমোদিত অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদেরও পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার সুযোগ দেওয়ার নির্দেশ দেন। এর ফলে নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী পরীক্ষা আয়োজন সম্ভব হয়নি এবং পুরো প্রক্রিয়াটি স্থগিত হয়ে যায়।