পদত্যাগ হঠাৎ করে করিনি, আমার ওপর চাপ ছিল: সামান্তা শারমিন
জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) থেকে পদত্যাগের সিদ্ধান্ত হঠাৎ করে নেননি বলে জানিয়েছেন দলটির সদ্য পদত্যাগী যুগ্ম আহ্বায়ক সামান্তা শারমিন। তিনি বলেন, পদত্যাগের জন্য দলের ভেতর থেকে যেমন চাপ ছিল, তেমনি বাইরের বিভিন্ন পক্ষ থেকেও তাঁকে চাপ দেওয়া হয়েছে। পদত্যাগের ঘোষণা দেওয়ার পর একটি গণমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেন সামান্তা শারমিন।
সাক্ষাৎকারে তিনি অভিযোগ করেন, এনসিপি তার মূল লক্ষ্য থেকে সরে গিয়ে একটি প্রথাগত রাজনৈতিক দলে পরিণত হয়েছে। প্রায় এক বছর ধরে দলের ভেতরে থেকে নিজের অবস্থান তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন তিনি। তবে শেষ পর্যন্ত দলের সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের মতো কার্যকর কোনো ফোরাম না থাকায় পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিয়েছি। দলের হাত ছেড়ে দিয়ে পদত্যাগ করা, এটার পক্ষপাতি আমি কখনোই ছিলাম না।... কিন্তু আমার কাছে মনে হয়েছে যে, আমার যতটুকু সাধ্য, সামর্থ্য, শক্তি ছিল, ততটুকু আসলে ফুরিয়েছে এই পার্টিকে আসলে ওই পথ থেকে টেনে বের করে আনার জন্য।’
সামান্তা শারমিন বলেন, আপাতত নতুন কোনো রাজনৈতিক দল গঠনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন না। আগামী দুই-তিন মাস বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, প্ল্যাটফর্ম ও ব্যক্তির সঙ্গে আলোচনা করে নিজের পরবর্তী রাজনৈতিক ভূমিকা ঠিক করবেন। সিদ্ধান্তটি তার জন্য সুখকর ছিল না। কারণ এনসিপি গড়ে ওঠার প্রক্রিয়ার সঙ্গে তিনি শুরু থেকেই যুক্ত ছিলেন। দল প্রতিষ্ঠার আগে নাগরিক কমিটির মুখপাত্র হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। নাগরিক কমিটিই এনসিপির ভিত্তি। সেই ইতিহাস বাদ দিলে দলটির অস্তিত্বের ভিত্তিও দুর্বল হয়ে পড়বে।
তিনি বলেন, ‘নিজের হাতে গড়ে তোলা দল কেউই ছাড়তে চায় না, এটা আসলে আমার জন্য কোনো সুখকর অনুভূতি না। আর প্লাস এনসিপি তো আমাকে অনেক কিছু দিয়েছে। পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিতে দীর্ঘ সময় ধরে রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক বিরোধের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। দলের সঙ্গে সামান্তার মতবিরোধের বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছিল গত নির্বাচনের আগে এনসিপি যখন জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে জোট গড়ল, তখন থেকেই।
তাহলে পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিতে এত দীর্ঘ সময় কেন লাগল, এমন প্রশ্নের জবাবে সামান্তা শারমিন বলেন, ‘নিজের রাজনৈতিক বোঝাপড়া ও যুক্তি প্রয়োগের সক্ষমতা যত দিন ছিল, তত দিন দলকে ভুল পথ থেকে ফেরানোর চেষ্টা করেছি। পদত্যাগ কোনো সমাধান নয়। দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীরাও যখন পদত্যাগের কথা ভেবেছেন, তখন তাদের নিরুৎসাহিত করেছি। তবে দল পুনর্গঠনের পর ভিন্নমত তুলে ধরার মতো ফোরাম আর অবশিষ্ট ছিল না। এখন যখন আর কোনো ফোরাম নেই, তো মানে আমি আসলে কোথায় ফাইটটা করব?’
সামান্তা বলেন, আগে দলের সাধারণ সভা ও নির্বাহী কমিটির বৈঠকে নিজের বক্তব্য তুলে ধরার সুযোগ ছিল। রাজনৈতিক পর্ষদের সঙ্গেও আলোচনা করেছি। কিন্তু তার উত্থাপিত আপত্তিগুলো দল আর ভুল বলে মনে করেনি। এখন সাধারণ সভা কবে হবে, আদৌ হবে কি না, তা নিয়েও সংশয় প্রকাশ করেন তিনি।
উনি (নাহিদ ইসলাম) কীসের ভিত্তিতে আহ্বায়ক হলেন এমন প্রশ্ন রেখে এনসিপির সাবেক এই নেত্রী বলেন, শুধু তার নয়, আরও অনেকের সাংগঠনিক গুরুত্ব কমে যাওয়ার ঘটনা এক দিনে ঘটেনি। একই সঙ্গে যারা নতুন করে গুরুত্বপূর্ণ পদ পেয়েছেন, তাদের যোগ্যতা নির্ধারণের মানদণ্ডও প্রকাশ করা হয়নি।
তিনি বলেন, একজনকে কোনো দায়িত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে কী কী যোগ্যতা প্রয়োজন, তা দলের পক্ষ থেকে স্পষ্ট করা উচিত। কিন্তু এনসিপিতে দায়িত্ব বণ্টনের ক্ষেত্রে এমন কোনো প্রকাশ্য মানদণ্ড অনুসরণ করা হয়নি। রাজনৈতিক পর্ষদ নিজেদের বিবেচনা মতো পদ বণ্টন করেছে। কোনো দায়িত্ব আপনি যখন কাউকে অর্পণ করেন, আপনি যখন নিয়োগ দেন, তখন কিন্তু সেটার ক্রাইটেরিয়াটা একটা প্রকাশ্য ক্রাইটেরিয়া থাকে।... কিন্তু এরকম কোনো ক্রাইটেরিয়া দলের পক্ষ থেকে ওপেন করা হয়নি।
সামনে কাউন্সিল আয়োজনের কথা থাকলেও তার আগে আহ্বায়ক কমিটিতে বড় ধরনের পরিবর্তন কেন আনা হলো, সেই প্রশ্ন তুলে সামান্তা বলেন, ‘একদম টপ টু বটম পুরোটাই পরিবর্তন করে ফেলা হলো, কীসের ভিত্তিতে পরিবর্তন করে ফেলা হলো? কোনো ধরনের জবাবদিহিতা নেই।’
সামান্তা শারমিন বলেন, ১৯৬ সদস্যের কমিটিতে ১৬০ জনকে পদায়ন করা হয়েছে। পদ বণ্টনের এ প্রক্রিয়া স্বচ্ছ পদ্ধতিতে হয়নি। আপনি দেখেন, আমার যুগ্ম আহ্বায়ক পদ, আমি কেন যুগ্ম আহ্বায়ক, আমি তো সদস্যও থাকতে পারতাম, কীসের ভিত্তিতে আমাকে যুগ্ম আহ্বায়ক পদ দেওয়া হলো? আমাকে সদস্য কেন করা হলো না? আরগুমেন্টটা আসছে যে, আমাকে কেন সিনিয়র পোস্ট দেওয়া হলো না? আমি আরগুমেন্ট করতে চাই আমাকে কেন জুনিয়র পোস্ট দেওয়া হলো না? এরকম তো সব পোস্টের ব্যাপারেই আপনি প্রশ্নগুলো করতে পারেন। যিনি আহ্বায়ক হয়েছেন, উনি কীসের ভিত্তিতে আহ্বায়ক হলেন? কোন ক্রাইটেরিয়ার ভিত্তিতে আহ্বায়ক হলেন? উনি তো নির্বাচিত না।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন থেকে গড়ে ওঠা এনসিপি পুরোনো রাজনৈতিক বন্দোবস্ত বদলানোর লক্ষ্য থেকে সরে এসেছে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে সামান্তা শারমিন বলেন, ‘দলটি শেষ পর্যন্ত প্রচলিত রাজনৈতিক ধারার দিকে ঝুঁকেছে। জাতীয় ঐকমত্য কমিশনে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ও উপদেষ্টা পরিষদ নির্বাচন করার ক্ষেত্রে বিরোধী দলের মতামত রাখার প্রস্তাব দিয়েছিল এনসিপি। সেজন্য সাত বা আট সদস্যের একটি ফোরামের কথা বলা হয়েছিল, যেখানে বিরোধী দলের প্রতিনিধিত্বের সুযোগ রাখা হয়েছিল।’
তিনি বলেন, ‘লাইক মাইন্ডেড পিপল দিয়ে গণতন্ত্র এস্টাব্লিশ করা যায় না, বিরোধী মতকে সঙ্গে নিয়ে গণতন্ত্র এস্টাব্লিশ করতে হয়। কিন্তু দলের ভেতরে কমিটি পুনর্গঠনের সময় বিরোধী মতের প্রতি একই ধরনের মনোভাব দেখা যায়নি। রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে বিরোধী দলের মতামতকে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণে যুক্ত করার কথা বললেও নিজেদের দলের ভেতরে ভিন্নমতকে উপেক্ষা করেছে এনসিপি। এনসিপি তার যে রাষ্ট্রীয় প্রস্তাবনা, সেখানে তার প্রস্তাবনা একরকম, নিজের পার্টির ভিতরে অন্যরকম।’
এ সময় ভবিষ্যতে রাষ্ট্র পরিচালনার সুযোগ পেলে এনসিপিবিরোধী মতকে জায়গা দেওয়ার ক্ষেত্রে একই ধরনের অসংগতি দেখাতে পারে বলেও শঙ্কা প্রকাশ করেন সামান্তা শারমিন। এনসিপির নেতৃত্ব দল পরিচালনায় ব্যক্তিকেন্দ্রিক হয়ে উঠেছিল কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে সামান্তা বলেন, ‘বিষয়টিকে শুধু একজন ব্যক্তির নেতৃত্বের সমস্যা হিসেবে দেখলে তা সরলীকরণ হবে। বরং দলের মধ্যে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক চিন্তার আধিপত্য তৈরি হয়েছিল। দলের শেষ পর্যায়ে আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের রাজনৈতিক ধারার বিপরীতে আমি ও নাহিদা সারোয়ার নিভা অবস্থান নিয়েছিলাম। কিন্তু ধীরে ধীরে দলের অন্যদের একমত হতে বাধ্য করা হয়েছে। পার্টির মধ্যে একটা প্রচণ্ড প্রেশার আছে যে একমত হওয়ার, বাধ্য করা হবে একমত হতে।’
তিনি জানান, জোট গঠন ও দলের রাজনৈতিক নীতির বিষয়ে তিনি প্রকাশ্যে ভিন্নমত প্রকাশ করেছিলেন। এমনকি সংসদে এনসিপির একজন সংসদ সদস্যের প্রত্যেক উপজেলায় দলীয় কার্যালয় স্থাপনের বক্তব্যেরও বিরোধিতা করেছিলেন। কিন্তু এসব বিরোধিতা দলের নেতৃত্ব সহজভাবে গ্রহণ করেনি।
এ সময় দায়িত্ব বণ্টনের ক্ষেত্রে গোপন ব্যালট ও অনানুষ্ঠানিক বোঝাপড়ার চর্চা থাকায় নেতাকর্মীরা নিজেদের পদ নিশ্চিত হওয়ার আগে ভিন্নমত প্রকাশ করতে চাইতেন না বলেও জানান সামান্তা শারমিন। তিনি বলেন, ‘রাজনৈতিক দলগুলোর সংস্কার এবং ঔপনিবেশিক রাজনৈতিক কাঠামোর পরিবর্তনকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। তবে নতুন রাজনৈতিক শক্তির সাংগঠনিক ও আদর্শিক কাঠামো কেমন হবে, তার সব উত্তর আমার কাছে নেই। আগামী দুই-তিন মাস নতুন ও পুরোনো রাজনৈতিক দল, বিভিন্ন প্ল্যাটফর্ম এবং ব্যক্তিদের সঙ্গে মতবিনিময় করব। এমনকি এনসিপির সঙ্গেও আবার বসতে চাই। আমার এখন পথ ওপেন, আমি সবার সাথেই কথা বলতে চাই।’
এরপর পরিস্থিতি বুঝে নিজের রাজনৈতিক ভূমিকা নির্ধারণ করবেন জানিয়ে সামান্তা বলেন, ‘আমি হুট করে কোনোকিছুই সিদ্ধান্ত নেওয়ার পক্ষপাতি না, আমি পদত্যাগের সিদ্ধান্ত হুট করে নিইনি।’