০৬ নভেম্বর ২০২৬, ১৮:৫৯

১৭ বছর পর রাষ্ট্রীয় আয়োজনে আগামীকাল পালিত হবে, আওয়ামী লীগ সরকার বাতিল করেছিল কেন?

৭ নভেম্বর সংগঠিত সিপাহি-জনতার বিপ্লব ও জিয়াউর রহমান  © সংগৃহীত

দীর্ঘ ১৭ বছর পর আগামীকাল শনিবার (৭ নভেম্বর) রাষ্ট্রীয়ভাবে পালিত হতে যাচ্ছে ‘জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস’। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর দিবসটির রাষ্ট্রীয় মর্যাদা ও সরকারি ছুটি বাতিল করা হয়েছিল। এরপর থেকে দলীয় ও রাজনৈতিক পর্যায়ে দিবসটি পালিত হলেও রাষ্ট্রীয়ভাবে এর আনুষ্ঠানিকতা বন্ধ থাকে। দীর্ঘ বিরতির পর এবার ২০২৬ সালে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের সময়ে দিবসটি আবার রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ও মর্যাদায় ফিরে আসছে।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট শেখ মুজিবুর রহমান হত্যাকাণ্ডের পর বাংলাদেশের রাজনীতিতে একের পর এক নাটকীয় পরিবর্তন ঘটে। ৩ নভেম্বর কারাগারে জাতীয় চার নেতাকে হত্যার ঘটনা এবং সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরে পাল্টাপাল্টি অবস্থানের মধ্য দিয়ে দেশ এক অস্থির পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়। এরই ধারাবাহিকতায় ৭ নভেম্বর সেনাবাহিনীর মধ্যে সংঘটিত অভ্যুত্থান-পাল্টা অভ্যুত্থান এবং সিপাহি-জনতার অভ্যুত্থান বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হয়।

এই ঘটনার মধ্য দিয়ে তৎকালীন সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান বন্দিদশা থেকে মুক্ত হন। পরবর্তী সময়ে তিনি দেশের রাজনৈতিক নেতৃত্বের কেন্দ্রে উঠে আসেন। বিএনপি দিবসটিকে জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস হিসেবে পালন করে। অন্যদিকে, বাংলাদেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক পক্ষ ৭ নভেম্বরের ঘটনাপ্রবাহকে ভিন্ন ভিন্ন ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিতে মূল্যায়ন করে।

৭ নভেম্বরের সরকারি ছুটি আওয়ামী লীগ সরকার প্রথম বাতিল করে ১৯৯৬ সালে। বিএনপি ২০০১ সালে ক্ষমতায় এসে ছুটি পুনর্বহাল করে। পরে সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ২০০৭ সালের ২৮ নভেম্বর ৭ নভেম্বরের সরকারি ছুটি বাতিল করে। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় থাকাকালে দিবসটি নিয়ে রাজনৈতিক বিরোধ আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। 

আওয়ামী লীগ সরকার বাতিল করেছিল কেন?
দীর্ঘ ১৭ বছর আওয়ামী লীগ শাসন আমলে দিবসটি পালন করা হয়নি। এ বিষয়ে কথা বলেছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। জুলাই অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনার সরকার ৭ নভেম্বরের চেতনার প্রতি ভীত হয়ে দিবসটি রাষ্ট্রীয়ভাবে পালন বন্ধ করে দিয়েছিল বলে তিনি মন্তব্য করেছেন।

 আজ শুক্রবার (৬ নভেম্বর) দুপুরে নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে ‘জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস’ ঘিরে দলের বিস্তারিত কর্মসূচি তুলে ধরতে গিয়ে এ মন্তব্য করেন তিনি।

রিজভী বলেন, শেখ হাসিনার সরকার ৭ নভেম্বরের চেতনার প্রতি ভীত হয়ে দিবসটি রাষ্ট্রীয়ভাবে পালন বন্ধ করেছিল। তবে বিএনপি এবং সমমনা দলগুলো এতদিন দিবসটি পালন করে আসছে। এবার দীর্ঘদিন পর আবারও রাষ্ট্রীয় ও জাতীয়ভাবে দিবসটি পালন করা হবে।

৭ নভেম্বর জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবসে নানা কর্মসূচি
আগামীকাল শনিবার ৭ নভেম্বর ‘জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস-২০২৬’। যথাযোগ্য মর্যাদা ও উৎসাহ-উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে দিবসটি উদযাপনে সরকার দেশব্যাপী ব্যাপক কর্মসূচি গ্রহণ করেছে।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা (পরিচালক) ফয়সল হাসান স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে আজ শুক্রবার এ তথ্য জানানো হয়েছে।

এতে বলা হয়, গত ২৮ অক্টোবর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সম্মেলনকক্ষে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মনজুর মোর্শেদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক উচ্চপর্যায়ের পর্যালোচনা সভায় এই কর্মসূচিগুলো সর্বসম্মতিক্রমে অনুমোদিত হয়।

দিবসটি উদযাপন উপলক্ষ্যে গৃহীত কর্মসূচির অংশ হিসেবে জাতির উদ্দেশ্যে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী পৃথক বাণী প্রদান করেছেন।  

দেশব্যাপী সাধারণ ছুটি পালিত হবে এবং দেশের সকল সরকারি ও বেসরকারি ভবন এবং বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসসমূহে যথাযথ মর্যাদায় জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা হবে। 

এছাড়া গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়, স্থানীয় সরকার বিভাগ এবং সকল সিটি কর্পোরেশন ও পৌরসভার যৌথ উদ্যোগে দেশের প্রধান প্রধান সড়ক ও সড়ক দ্বীপসমূহ জাতীয় পতাকা দ্বারা সুসজ্জিত করা হবে।

বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, জাতির শান্তি, সমৃদ্ধি ও অগ্রগতি কামনা করে সুবিধাজনক সময়ে দেশের সকল মসজিদে মিলাদ-মাহফিল ও বিশেষ মোনাজাত এবং মন্দির, গির্জা, প্যাগোডা ও অন্যান্য উপাসনালয়সমূহে বিশেষ প্রার্থনা অনুষ্ঠিত হবে। 

দেশের সকল হাসপাতাল, কারাগার, এতিমখানা, শিশুকেন্দ্র, শিশু পরিবার, শিশুসদন, কিশোর সংশোধনী কেন্দ্র, শান্তি নিবাস ও ভবঘুরে প্রতিষ্ঠানে সুবিধাজনক সময়ে উন্নতমানের খাবার পরিবেশন করা হবে।

এতে বলা হয়, সকল সিটি কর্পোরেশন ও পৌরসভার ব্যবস্থাপনায় দেশের সকল শিশু পার্ক শিশুদের জন্য দিনব্যাপী বিনা টিকেটে উন্মুক্ত থাকবে। নারী ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং স্থানীয় প্রশাসনের সহযোগিতায় জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে শিশুদের চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বিশেষ আলোচনা ও রচনা প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হবে।

সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের ব্যবস্থাপনায় জাতীয় দৈনিক সংবাদপত্রসমূহে বিশেষ নিবন্ধ, সাহিত্য-সাময়িকী ও ক্রোড়পত্র প্রকাশ করা হবে।

পাশাপাশি বাংলাদেশ টেলিভিশন, বেসরকারি টিভি চ্যানেল ও রেডিওতে বিশেষ অনুষ্ঠানমালা সম্প্রচার এবং সিনেমা হল ও ভ্যানযোগে প্রামাণ্য চলচ্চিত্র প্রদর্শনী করা হবে। 

বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির আয়োজনে দেশাত্মবোধক গানের আসর, সকল জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে দিবসের তাৎপর্য তুলে ধরে আলোচনা সভা এবং জেলা সদর ও উপজেলা পর্যায়ে প্রদর্শনী ফুটবল ম্যাচের আয়োজন করা হবে।

বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, শহীদ মুক্তিযোদ্ধা পরিবার ও যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাসহ বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সমন্বয়ে বিশেষ স্মারক আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হবে। 

সশস্ত্র বাহিনী কর্তৃক জাতীয় পতাকা উত্তোলন, মিলাদ মাহফিল, প্রীতিভোজ ও বিশেষ দরবার অনুষ্ঠিত হবে এবং বাংলাদেশ ক্যাডেট কোরের তত্ত্বাবধানে ঢাকার আর্মি স্টেডিয়ামে বর্ণাঢ্য ডিসপ্লে প্রদর্শিত হবে।

এছাড়াও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন বাংলাদেশ পুলিশ, বিজিবি, আনসার ও ভিডিপি, বহিরাগমন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তর, কোস্ট গার্ড, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর, কারা অধিদপ্তর, ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তর, এনটিএমসি এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সদর দপ্তরসমূহে মিলাদ মাহফিল, প্রীতিভোজ ও বিশেষ দরবারের আয়োজন করা হবে।