গণভোটের রায় বাস্তবায়ন না হলে কর্তৃত্ববাদ ফিরে আসবে
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, গণভোটের রায় ও জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন না হলে দেশে আবার কর্তৃত্ববাদী শাসন ফিরে আসবে। তিনি বলেন, জনগণের সঙ্গে প্রতারণা না করে গণভোটের রায় বাস্তবায়ন করতে হবে। অন্যথায় জনগণের প্রত্যাশা উপেক্ষার পরিণতি ইতিহাসে আবারও ফিরে আসবে।
শুক্রবার (৬ নভেম্বর) জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস উপলক্ষে রাজধানীর আল-ফালাহ মিলনায়তনে জামায়াতে ইসলামী ঢাকা মহানগরী উত্তর আয়োজিত আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ৭ নভেম্বরের চেতনা অন্যায়-অবিচার, একনায়কতন্ত্র ও স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার চেতনা। এই চেতনা ধারণ করে দেশে গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার ও জনগণের প্রকৃত অধিকার প্রতিষ্ঠায় সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে।
গণভোটের রায় বাস্তবায়ন না করার অভিযোগ তুলে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, নির্বাচনের আগে জনগণকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী সরকারের উচিত গণভোটের রায় মেনে নেওয়া। অন্তর্বর্তী সরকার ১৩৩টি অধ্যাদেশ জারি করেছিল। সংসদের প্রথম অধিবেশনের প্রথম দিন সেগুলো উত্থাপন করা হলেও গুরুত্বপূর্ণ অনেক অধ্যাদেশ নিয়ে যথাযথ আলোচনা হয়নি। বরং ২০টি অধ্যাদেশ বাতিল করা হয়েছে। এসব অধ্যাদেশ বহাল থাকলে ফ্যাসিবাদ ফিরে আসার পথ বন্ধ করা যেত বলে তিনি মনে করেন।
দলীয়করণ ও সংসদের ভূমিকা নিয়ে অভিযোগ
সরকার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে দলীয় লোকজনকে দায়িত্ব দিচ্ছে বলে অভিযোগ করেন শফিকুর রহমান। তাঁর ভাষ্য, বিশ্ববিদ্যালয়, জেলা পরিষদ, সিটি করপোরেশনসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সাংবিধানিক কাঠামোয় দলীয় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চলছে। দুর্নীতি দমন কমিশনের মতো প্রতিষ্ঠানে নিরপেক্ষ ও যোগ্য ব্যক্তিদের পরিবর্তে বিতর্কিত ব্যক্তিদের দায়িত্ব দিয়ে দুর্নীতি দমন সম্ভব নয়।
সরকারি চাকরিতে দলীয়করণের অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, শিক্ষার্থীরা মেধার ভিত্তিতে চাকরি ও ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবিতে আন্দোলন করেছিলেন। অথচ এখন সরকারি কর্মকমিশনের চেয়ারম্যানকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে এবং অন্য সদস্যদেরও চাপের মুখে বিদায় করার অভিযোগ উঠেছে। দলীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে নিয়োগ ও সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার মনোভাব যুবসমাজের প্রতি অবিচার।
সংসদে বিরোধী দলের ভূমিকা প্রসঙ্গে জামায়াত আমির বলেন, তাঁরা সংসদকে কার্যকর ও অর্থবহ করতে চান। ন্যায়সংগত বিষয়ে সহযোগিতা করবেন, অন্যায় হলে প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ করবেন—এটাই তাঁদের নীতি। কিন্তু সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে ন্যায়-অন্যায় বিবেচনা না করে একের পর এক সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে।
র্যাব বিলুপ্তির দাবি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, নির্বাচনের আগে ক্ষমতাসীনরা এ বাহিনী বিলুপ্ত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। কিন্তু পরে নাম পরিবর্তন করে নতুন কাঠামো গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আগের বাহিনীর লোকবল ও কাঠামো বহাল রেখে শুধু নাম পরিবর্তন করলে সমস্যার সমাধান হবে না। প্রয়োজনে আলোচনা করে নতুন বাহিনী গঠন এবং বর্তমান সদস্যদের নিজ নিজ বাহিনীতে ফিরিয়ে দেওয়ার প্রস্তাব দেন তিনি।
বিরোধী দল হিসেবে দায়িত্ব পালনের অংশ হিসেবেই তাঁরা সাত দফা দাবি নিয়ে মাঠে নেমেছেন বলে জানান শফিকুর রহমান। তাঁর দাবি, এসব কোনো দলের একক দাবি নয়, জনগণের দাবি। সংস্কার বাস্তবায়ন ছাড়া বাংলাদেশের মানুষের মুক্তির পথ খোলা নেই। ফ্যাসিবাদ কোনো নির্দিষ্ট দলের নাম নয়, এটি একটি মানসিকতা। যে কেউ ক্ষমতায় গিয়ে এ মানসিকতায় আক্রান্ত হতে পারে।
৭ নভেম্বর ও গণ-অভ্যুত্থানের প্রসঙ্গ
৭ নভেম্বরের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট তুলে ধরে জামায়াত আমির বলেন, ১৯৭২ সালে ক্ষমতায় আসার পর তৎকালীন সরকার দেশের প্রায় সব ইসলামী সংগঠন নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। পরে রক্ষীবাহিনী গঠন করে তাদের ব্যাপক ক্ষমতা দেওয়া হয়। এ বাহিনীর হাতে ৩৪ হাজার মানুষ নিহত হয়েছিলেন, যাঁদের মধ্যে অন্তত ১০ হাজার মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন বলে অভিযোগ করেন তিনি।
তাঁর ভাষ্য, হত্যা, নির্যাতন, লুটপাট ও দুর্নীতির বিচার না হওয়া এবং বিরোধী মত দমনের মধ্য দিয়ে দেশে একদলীয় শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি বাকশাল প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে গণতন্ত্রের অবসান ঘটানো হয়।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট থেকে ৭ নভেম্বর পর্যন্ত রাজনৈতিক ও সামরিক ঘটনাপ্রবাহের বর্ণনা দিয়ে শফিকুর রহমান বলেন, ৩ নভেম্বর ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফের পাল্টা অভ্যুত্থানের পর ৩ থেকে ৬ নভেম্বর পর্যন্ত জিয়াউর রহমান বন্দী ছিলেন। ৭ নভেম্বর ভোরে সিপাহিরা সংগঠিত হয়ে তাঁকে মুক্ত করেন। সিপাহিরা ট্যাংক নিয়ে রাস্তায় নামলে সাধারণ মানুষ তাঁদের স্বাগত জানায়। সিপাহিরা বিপ্লব ঘটিয়েছিলেন, আর জনগণ তাতে সংহতি প্রকাশ করেছিল বলে দিনটি জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে।
স্বাধীনতার ইতিহাস নিয়ে কৃতিত্বের লড়াই না করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ১৯৭১ সালে বিএনপি ছিল না, ১৯৭৫ সালেও দলটি প্রতিষ্ঠিত হয়নি। তাই ইতিহাসে কারও অবদানকে ছোট করে দেখার সুযোগ নেই। মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব ও অবদানের স্বীকৃতি কোনো ব্যক্তি বা দলের একক সম্পত্তি হতে পারে না।
১৯৯০ সালের গণ-আন্দোলনের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, জনগণ দুঃশাসন, দুর্নীতি ও অদক্ষতার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিল। আন্দোলনের মুখে এরশাদকেও ক্ষমতা ছাড়তে হয়েছিল। রাজনীতিতে সমঝোতা ও নমনীয়তা থাকা জরুরি। তা না হলে রাজনীতি জনগণের কল্যাণের পরিবর্তে সংঘাতের দিকে চলে যায়।
২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থান প্রসঙ্গে জামায়াত আমির বলেন, ওই আন্দোলনকে অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কেউ বলছেন, আন্দোলনের সঙ্গে তাঁদের কোনো সম্পর্ক ছিল না, এটি কেবল ছাত্রদের আন্দোলন। আবার কেউ দাবি করছেন, তাঁদের নেতা আন্দোলনের মাস্টারমাইন্ড। এ ধরনের পরস্পরবিরোধী বক্তব্য দিয়ে জাতির সঙ্গে উপহাস করা হচ্ছে।
জামায়াতে ইসলামী ওই আন্দোলনের কৃতিত্ব দাবি করেনি উল্লেখ করে তিনি বলেন, দলটি আন্দোলনকে দেশের জনগণের জন্য মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি নিয়ামত হিসেবে বিবেচনা করে। আন্দোলনে শহীদদের পরিবার ও আহত ব্যক্তিদের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেছে।
জাতীয় স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে সরকারের অবস্থান পরিষ্কার করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, মাতারবাড়ীসহ গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় স্বার্থের বিষয়ে সরকারের ভূমিকা ও দৃষ্টিভঙ্গি জাতির সামনে স্পষ্ট করতে হবে। দেশের স্বার্থবিরোধী কোনো চুক্তি বা সিদ্ধান্ত জনগণ মেনে নেবে না। আধিপত্যবাদের প্রভাবমুক্ত স্বাধীন জাতি গঠন, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং চাঁদাবাজি ও দুর্নীতি নির্মূলের আন্দোলন অব্যাহত থাকবে।
আলোচনা সভায় বিশেষ অতিথির বক্তব্যে জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, ৭ নভেম্বরের ঘটনাপ্রবাহকে শুধু সামরিক ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এর পেছনে ছিল একদলীয় শাসন, গণতন্ত্র ও মানুষের অধিকার হরণের বিরুদ্ধে জনমনের ক্ষোভ। অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে বর্তমানেও জনগণের ভোটাধিকার ও গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষাকে সম্মান করতে হবে। গণভোটের রায় ও জুলাই সনদ বাস্তবায়নের মাধ্যমে জনগণের প্রত্যাশা পূরণে তিনি সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।
সভাপতির বক্তব্যে জামায়াতে ইসলামীর ঢাকা মহানগরী উত্তরের আমির মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন বলেন, ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা ছিল শুধু ক্ষমতার পরিবর্তন নয়, রাষ্ট্র ও সমাজব্যবস্থার মৌলিক পরিবর্তন। চাঁদাবাজি, দুর্নীতি, বাজার সিন্ডিকেট, দলীয়করণ ও জনদুর্ভোগ অব্যাহত থাকলে জনগণের প্রত্যাশা পূরণ হবে না।
কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরা সদস্য ও মহানগরীর সহকারী সেক্রেটারি নাজিম উদ্দীন মোল্লার সঞ্চালনায় সভায় আরও বক্তব্য দেন জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের, ঢাকা মহানগরী উত্তরের নায়েবে আমির আব্দুর রহমান মূসা, ইঞ্জিনিয়ার গোলাম মোস্তফা, সহকারী সেক্রেটারি মাহফুজুর রহমান, ডা. ফখরুদ্দিন মানিক ও ইয়াসিন আরাফাত।