জামায়াতের সঙ্গে জোট ও কাউন্সিল ছাড়া কমিটিসহ যে ৪ কারণে এনসিপি ছাড়লেন সামান্তা শারমিন
জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) থেকে পদত্যাগ করেছেন দলটির যুগ্ম আহ্বায়ক সামান্তা শারমিন। জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে জোট, নির্বাচনী কৌশল, গণঅভ্যুত্থানে নারীদের ভূমিকার যথাযথ স্বীকৃতি না দেওয়া এবং কাউন্সিল ছাড়াই দলের পুনর্গঠন—এই চারটি বিষয়কে পদত্যাগের প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন তিনি।
আজ বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) সন্ধ্যায় নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে দেওয়া দীর্ঘ এক পোস্টে পদত্যাগের ঘোষণা দিয়ে এসব কারণ তুলে ধরেন তিনি।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা সামান্তা শারমিন এর আগে এনসিপির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তবে গত ২৩ অক্টোবর ঘোষিত দলের নতুন কমিটিতে তাকে যুগ্ম আহ্বায়ক পদে রাখা হয়। নতুন কমিটিতে পদমর্যাদা কমে যাওয়ার পর তার দলত্যাগের গুঞ্জনও ছড়িয়ে পড়ে। এর আগে গত ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে এনসিপির জোট গঠনের পর দলীয় কর্মকাণ্ডে কিছুটা নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েন তিনি।
ফেসবুক পোস্টে সামান্তা শারমিন জানান, প্রায় এক বছর আগে জামায়াতের সঙ্গে জোট গঠনের প্রশ্নে তিনি দলের ভেতরে ভিন্ন অবস্থান নিয়েছিলেন। তার মতে, জামায়াত নীতিগত বা কৌশলগত কোনো ক্ষেত্রেই এনসিপির মিত্র হওয়ার যোগ্য নয়। এ জোটের জন্য দলকে কঠিন মূল্য দিতে হবে বলেও তিনি সতর্ক করেছিলেন।
তিনি লেখেন, গত ১১ মাসে দলের অতীত কর্মকাণ্ড বিশ্লেষণ ও ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা নিয়ে বিভিন্ন পর্যায়ে লিখিত অভিযোগ ও প্রস্তাব দিয়েছেন। পাশাপাশি দলের ভেতরে আলোচনা, বিতর্ক ও মতাদর্শিক সংগ্রামের মাধ্যমে এনসিপিকে ভুল পথ থেকে ফেরানোর চেষ্টা করেছেন। তবে দল তার অবস্থান পরিবর্তনে আগ্রহী না হওয়ায় পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
জামায়াতের সঙ্গে জোট নিয়ে আপত্তি
পদত্যাগের প্রথম কারণ হিসেবে জামায়াতের সঙ্গে জোটের প্রসঙ্গ তুলে ধরেছেন সামান্তা শারমিন। তার বক্তব্য, এনসিপির রাজনীতির অন্যতম ভিত্তি ছিল রাষ্ট্র সংস্কার। সাংবিধানিক, আইনি এবং রাজনৈতিক ও দলীয় কাঠামোর সংস্কারের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য নিয়ে দলটির যাত্রা শুরু হয়েছিল।
কিন্তু তার মতে, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী এই তিন ক্ষেত্রের কোনো সংস্কারকেই নিজেদের রাজনৈতিক প্রকল্পের অংশ মনে করে না। জামায়াতের দার্শনিক ভিত্তি ও প্রস্তাবিত রাষ্ট্রব্যবস্থাও গণতান্ত্রিক নয় বলে দাবি করেন তিনি। তার অভিযোগ, ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষাকে নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহারের জন্যই জামায়াত সংস্কারের কথা বলে।
সামান্তা শারমিনের মতে, জামায়াতের সঙ্গে জোট করার ফলে সংস্কারপন্থি ও উদার গণতান্ত্রিক মূল্যবোধে বিশ্বাসী সাধারণ মানুষ এনসিপির রাজনীতি থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছেন। এতে দলটির নিজস্ব রাজনৈতিক পরিচয়ও দুর্বল হয়েছে।
নির্বাচনি কৌশল নিয়ে অসন্তোষ
পদত্যাগের দ্বিতীয় কারণ হিসেবে ২০২৬ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এনসিপির অংশগ্রহণের কৌশল নিয়ে অসন্তোষ জানিয়েছেন তিনি। তার মতে, এবারের নির্বাচন শুধু ক্ষমতার পরিবর্তনের নির্বাচন না হয়ে রাজনৈতিক পরিবর্তনের সুযোগ তৈরি করতে পারত। কিন্তু পুরোনো রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে জোট করে নির্বাচনে অংশ নেওয়ায় সেই সম্ভাবনা নষ্ট হয়েছে।
সামান্তা শারমিনের দাবি, এনসিপির সামনে একা নির্বাচন করা কিংবা পুরোনো রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে পরিবর্তন করতে আগ্রহী শক্তিগুলোর সঙ্গে জোট গঠনের সুযোগ ছিল। এতে নির্বাচনী ফলের বাইরেও দলটি বেশি রাজনৈতিক প্রভাব তৈরি করতে পারত। কিন্তু নেতৃত্ব নির্বাচনী জয়কে রাজনৈতিক পরিবর্তনের চেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, ১১ দলীয় ঐক্যের মতো নির্বাচনী কৌশল গ্রহণ না করেও রাজনৈতিক প্রভাব তৈরির পাঁচটি পদ্ধতির কথা তিনি দলের নেতৃত্বকে জানিয়েছিলেন। তবে সেসব প্রস্তাব গুরুত্ব পায়নি। তার মতে, বড় দলের সঙ্গে জোট করে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার মধ্য দিয়ে এনসিপি নিজেদের স্বতন্ত্র রাজনীতি ও অভ্যুত্থান-পরবর্তী নতুন রাজনৈতিক সম্ভাবনাকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।
গণঅভ্যুত্থানে নারীদের ভূমিকার স্বীকৃতি না দেওয়া
পদত্যাগের তৃতীয় কারণ হিসেবে গণঅভ্যুত্থানে নারীদের অংশগ্রহণ, অবদান ও রাজনৈতিক অধিকার যথাযথভাবে স্বীকৃতি না দেওয়ার বিষয়টি তুলে ধরেছেন সামান্তা শারমিন। তার মতে, ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে নারীরা সম্মুখসারির যোদ্ধা, প্রতিরোধকারী ও আন্দোলনের রক্ষাকর্তা হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। কিন্তু অভ্যুত্থানের পর পুরোনো রক্ষণশীল রাজনৈতিক শক্তিগুলো নারীদের রাজনৈতিক মাঠ থেকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছে।
তিনি মনে করেন, পুরোনো রাজনৈতিক দলগুলোর বাইরে এসে এনসিপির সামনে নারী-পুরুষের সমতার ভিত্তিতে নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তোলার সুযোগ ছিল। শুধু দলে নারীদের অন্তর্ভুক্ত করাই যথেষ্ট নয়; নেতৃত্ব, সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও সাংগঠনিক ক্ষমতায় তাদের মর্যাদাপূর্ণ অবস্থান নিশ্চিত করা প্রয়োজন ছিল। কিন্তু এনসিপি সেই পথ অনুসরণ করেনি বলে অভিযোগ করেন তিনি।
সামান্তা শারমিনের ভাষ্য, দলটি বিভিন্ন ক্ষেত্রে রক্ষণশীল রাজনৈতিক প্রবণতার অনুসারী হয়েছে এবং নারীদের প্রতিবাদ ও মতামতকে যথাযথ গুরুত্ব দেয়নি। তার মতে, নারীদের রাজনৈতিকভাবে পিছিয়ে রাখার মধ্য দিয়ে এনসিপি গণঅভ্যুত্থানের বৈষম্যবিরোধী ও অন্তর্ভুক্তিমূলক চরিত্রের অবনমন ঘটিয়েছে।
কাউন্সিল ছাড়াই দলের পুনর্গঠন
পদত্যাগের চতুর্থ কারণ হিসেবে কাউন্সিল আয়োজন না করে এনসিপির আহ্বায়ক কমিটি পুনর্গঠনের সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেছেন তিনি। তার মতে, অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে মানুষ এমন একটি রাজনৈতিক দল প্রত্যাশা করেছিল, যার অভ্যন্তরীণ কাঠামো হবে গণতান্ত্রিক, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক।
কিন্তু কাউন্সিল না করে পুনরায় আহ্বায়ক কমিটি পুনর্গঠনের মাধ্যমে এনসিপি পুরোনো রাজনৈতিক দলগুলোর মতোই আচরণ করেছে বলে অভিযোগ করেন সামান্তা শারমিন। তার মতে, নির্ধারিত সময়ে কাউন্সিল আয়োজন না করলে নেতৃত্বের বৈধতা, জবাবদিহি ও প্রতিনিধিত্ব নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়। এতে দলের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা সীমিতসংখ্যক ব্যক্তির হাতে কেন্দ্রীভূত হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে।
তিনি আরও বলেন, দলের নেতৃত্ব নির্বাচনের আগেই বড় ধরনের রদবদল অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র ও নিরপেক্ষতা নিয়ে নেতৃত্বের উদাসীনতা প্রকাশ করে। যে দল নিজের অভ্যন্তরে গণতান্ত্রিক নেতৃত্ব নির্বাচন নিশ্চিত করতে পারে না, তার পক্ষে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে গণতন্ত্র ও নিরপেক্ষতার দাবি কতটা বিশ্বাসযোগ্যভাবে তোলা সম্ভব, সেই প্রশ্নও সামনে আসে।
পদত্যাগের ঘোষণা দিয়ে সামান্তা শারমিন বলেন, এনসিপির প্রাথমিক মূল্যবোধের প্রতি দলটির আর আন্তরিক থাকা সম্ভব বলে তিনি মনে করেন না। তবে কোনো একটি সিদ্ধান্ত বা কর্মকাণ্ডের প্রতিক্রিয়া হিসেবে তার পদত্যাগকে মূল্যায়ন না করার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। তার মতে, সমস্যাগুলো দলটির রাজনৈতিক চিন্তা, কর্মপদ্ধতি ও সাংগঠনিক কাঠামোর সঙ্গে সম্পর্কিত।