গণভোটকে ‘উপহাস’, জাতীয় সংসদের সংবিধান সংশোধন কমিটির সভা বর্জন এস এম ফরহাদের
সংবিধান সংশোধন নিয়ে সংসদীয় বিশেষ কমিটির মতবিনিময় সভা বর্জনের ঘোষণা দিয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) সাধারণ সম্পাদক (জিএস) এস এম ফরহাদ। তার অভিযোগ, গণভোটের রায় উপেক্ষা করে এ ধরনের মতবিনিময় সভার আয়োজন গণরায়কে উপহাস করার শামিল। একই সঙ্গে এটি জুলাই অভ্যুত্থানের চেতনার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা।
মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) দুপুর আড়াইটায় সংবিধান সংশোধনবিষয়ক সংসদীয় বিশেষ কমিটির মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। তবে এ সভায় অংশ নেবেন না বলে সামািজক মাধ্যম ফেসবুকে এ তথ্য জানিয়েছেন ডাকসুর জিএস।
এতে তিনি বলেন, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের পর অনুষ্ঠিত ডাকসু নির্বাচনে প্রার্থী ও ভোটারদের অভিন্ন প্রত্যাশা ছিল একটি বৈষম্যহীন ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা। শহীদ ও আহত ব্যক্তিদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে এমন একটি রাষ্ট্র গড়ে তোলাই ছিল তাঁদের আকাঙ্ক্ষা, যেখানে ভবিষ্যতে আর ফ্যাসিবাদের উত্থান ঘটবে না এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে গণতান্ত্রিক পরিবেশ বজায় থাকবে।
এস এম ফরহাদ আরও বলেন, জুলাই অভ্যুত্থানের চেতনা ধারণ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও ডাকসুর নির্বাচিত প্রতিনিধিরা শহীদ ও আহত ব্যক্তিদের প্রত্যাশা পূরণে কাজ করতে অঙ্গীকারবদ্ধ। সেই দায়বদ্ধতা থেকেই তিনি ও ডাকসু মতবিনিময় সভা বর্জন এবং পুরো প্রক্রিয়া থেকে নিজেদের বিরত রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। পোস্টে তিন ধরনের অভিযোগ করেন ফরহাদ।
গণভোটের রায় ও জুলাই সনদ উপেক্ষার অভিযোগ
এস এম ফরহাদ অভিযোগ করেন, ২০২৫ সালের জুলাই জাতীয় সনদের আলোকে রাষ্ট্র সংস্কারের পক্ষে গণভোটে ৬৮ দশমিক ৫৯ শতাংশ মানুষ ‘হ্যাঁ’ ভোট দিয়েছেন। জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে পাওয়া এই রায় বাস্তবায়ন করা সরকারের সাংবিধানিক ও নৈতিক দায়িত্ব। কিন্তু সরকার ও সংসদীয় কমিটি জনগণের এই রায় উপেক্ষা করে সংবিধানের আংশিক সংশোধনের মাধ্যমে পুরোনো কাঠামো বহাল রাখতে চাইছে।
তিনি বলেন, এ ধরনের উদ্যোগ জুলাই অভ্যুত্থানের শহীদদের আত্মত্যাগের সঙ্গে প্রতারণার শামিল। এই প্রক্রিয়ায় অংশ নেওয়া জনগণের ঐতিহাসিক গণরায় ও অভ্যুত্থানের মূল আকাঙ্ক্ষাকে অস্বীকার করার সমান।
সংসদের ক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন
সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, সংসদের দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে সংবিধান সংশোধনের ক্ষমতা রয়েছে। তবে এই ক্ষমতা দিয়ে সংবিধানের মৌলিক কাঠামো পরিবর্তন করা সম্ভব নয় বলে মনে করেন এস এম ফরহাদ।
তিনি বলেন, সংবিধান সংশোধনের ক্ষমতা (অ্যামেন্ডিং পাওয়ার) এবং সংবিধান প্রণয়ন বা পরিবর্তনের গাঠনিক ক্ষমতা (কনস্টিটিউয়েন্ট পাওয়ার) এক বিষয় নয়। জুলাই জাতীয় সনদে থাকা দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ, প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ভারসাম্য, তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার পুনঃপ্রবর্তন ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতাসহ ৪৮টি বিষয় সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর সঙ্গে সম্পর্কিত। সংসদের সীমিত সংশোধনী ক্ষমতা দিয়ে এসব মৌলিক পরিবর্তন আনা সম্ভব নয়।
আদালতে বাতিল হওয়ার আশঙ্কা
সংবিধানের বিদ্যমান কাঠামোর অধীনে একতরফাভাবে সংশোধন করা হলে তা ভবিষ্যতে সুপ্রিম কোর্টে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন ডাকসুর জিএস। এ প্রসঙ্গে তিনি অতীতে পঞ্চম, অষ্টম ও ত্রয়োদশ সংশোধনী আদালতে বাতিল হওয়ার উদাহরণ তুলে ধরেন। তাঁর মতে, জনগণের প্রত্যক্ষ রায়ের ভিত্তিতে স্বাধীন সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন না করে কেবল সংসদ সদস্যদের মাধ্যমে সংশোধন করা হলে তা আইনি অনিশ্চয়তার মুখে পড়তে পারে। এতে জুলাই অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে অর্জিত সংস্কার উদ্যোগও ঝুঁকিতে পড়বে।
ফরহাদ বলেন, সংবিধানের আংশিক ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত সংশোধনের পরিবর্তে অবিলম্বে বর্তমান প্রক্রিয়া বন্ধ করতে হবে। গণভোটে ৬৯ শতাংশ মানুষের রায়কে গুরুত্ব দিয়ে জুলাই সনদের আলোকে একটি স্বাধীন সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন করতে হবে। তিনি আরও বলেন, রাষ্ট্র ও সংবিধান সংস্কারের যেকোনো সৎ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উদ্যোগে ডাকসু সহযোগিতা করতে প্রস্তুত। তবে একতরফা রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়নের কোনো প্রক্রিয়ায় তাঁরা অংশ নেবেন না।