ভোটারদের বাধা, আগাম সিল-স্বাক্ষর ও এজেন্টদের বের করে দেওয়ার অভিযোগ জামায়াতের
ঠাকুরগাঁও-১ আসনের উপনির্বাচনে ব্যাপক অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা, বলপ্রয়োগ ও দলীয়করণের অভিযোগ তুলেছে জামায়াতে ইসলামী। ভোটারদের কেন্দ্রে যেতে বাধা, আগেই ভোট হয়ে যাওয়ার ঘটনা, নির্বাচনী এজেন্টদের দায়িত্ব পালনে প্রতিবন্ধকতা এবং ব্যালট বইয়ের মুড়িতে আগাম সিল ও স্বাক্ষর করে রাখার অভিযোগ করেছে দলটি। এসব ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি অবশিষ্ট সময়ের ভোটগ্রহণ নিরপেক্ষভাবে সম্পন্ন করার দাবি জানিয়েছে তারা।
আ বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) বিকালে রাজধানীর মগবাজারে জামায়াতের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব অভিযোগ করেন দলটির সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক সংসদ সদস্য মিয়া গোলাম পরওয়ার।
সংবাদ সম্মেলনে গোলাম পরওয়ার বলেন, ঠাকুরগাঁও-১ আসনের উপনির্বাচনে ভোটারদের ভোটকেন্দ্রে যেতে বাধা দেওয়া, ভোট দিতে গিয়ে আগেই ভোট দেওয়া হয়ে গেছে বলে জানতে পারা, ভোটারদের ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং নির্বাচনী এজেন্টদের দায়িত্ব পালনে বাধা দেওয়ার তথ্য তারা পেয়েছেন। নির্বাচনী দায়িত্বে নিয়োজিত কর্মকর্তাদের পরিচয়পত্র না থাকার অভিযোগও রয়েছে। এসব বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের কার্যকর পদক্ষেপ দৃশ্যমান না হওয়ায় জামায়াত উদ্বিগ্ন বলেও জানান তিনি।
তিনি নির্বাচন কমিশন, ঠাকুরগাঁওয়ের রিটার্নিং কর্মকর্তা, জেলা প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতি অবশিষ্ট সময়ের ভোটগ্রহণ সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষভাবে সম্পন্ন করতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান।
সরকারদলীয় শীর্ষ পর্যায় থেকে নির্বাচনকে সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও শান্তিপূর্ণ দাবি করার সমালোচনা করে জামায়াতের এই নেতা বলেন, গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন ছবি ও ভিডিওতে ভিন্ন চিত্র দেখা যাচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে নির্বাচন সুষ্ঠু হয়েছে বলে দাবি করা বাস্তবতার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়। এ ধরনের বক্তব্য জনগণকে বিভ্রান্ত করতে পারে।
নির্বাচন কমিশনে অভিযোগ দিয়েও প্রতিকার মেলেনি অভিযোগ করে গোলাম পরওয়ার বলেন, নির্বাচনের আগে জামায়াতের একটি প্রতিনিধিদল প্রধান নির্বাচন কমিশনারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে নয় দফা লিখিত অভিযোগ ও তিনটি দাবি জানিয়েছিল। পরবর্তী সময়ে ১১-দলীয় ঐক্যের পক্ষ থেকেও নির্বাচন কমিশনের কাছে অনিয়মের অভিযোগ তুলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানানো হয়। কিন্তু এসব অভিযোগের কার্যকর প্রতিকার দেখা যায়নি।
তিনি আরও বলেন, ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফাইরুজ ইসলামের বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট একটি দলের প্রার্থীর পক্ষে অবস্থান নেওয়ার অভিযোগ তোলা হয়েছিল। নির্বাচনের নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করতে তাকে দায়িত্ব থেকে সরানোর দাবি জানানো হলেও এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ করেন তিনি।
বিভিন্ন ভোটকেন্দ্রে ভোটারদের বাধা দেওয়া ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগ তুলে গোলাম পরওয়ার বলেন, একজন নারী ভোট দিতে গিয়ে জানতে পারেন, তার ভোট আগেই দেওয়া হয়ে গেছে। এ ধরনের ঘটনার ভিডিও প্রকাশিত হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।
ভোটারদের ভয়ভীতি ও অর্থ বিতরণের অভিযোগ করে জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল অভিযোগ করেন, হিন্দু সম্প্রদায়ের ভোটারদের মধ্যে বিশেষভাবে ভীতি সৃষ্টি করা হয়েছে। সরকারি চাকরিজীবী ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কর্মরত ব্যক্তিদের দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের পক্ষে কাজ করলে চাকরিতে সমস্যায় পড়তে পারেন—এমন ইঙ্গিত দিয়ে চাপ প্রয়োগ করা হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। তার মতে, এ ধরনের কর্মকাণ্ড ভোটারদের স্বাধীনভাবে ভোট দেওয়ার অধিকার ক্ষুন্ন করে।
নির্ধারিত সময়ের আগে নির্বাচনী প্রচারণা চালানো এবং ধানের শীষ প্রতীক রঙিনভাবে ব্যবহারের অভিযোগের ছবি নির্বাচন কমিশনে জমা দেওয়া হয়েছিল বলেও জানান গোলাম পরওয়ার। এ ছাড়া জামায়াতের নেতাকর্মীদের মারধর করে আহত করা, নারী ভোটারদের বাধা দেওয়া এবং নির্বাচনী এজেন্টদের কেন্দ্র থেকে বের করে দেওয়ার অভিযোগ করেন তিনি।
কয়েকটি ভোটকেন্দ্রে প্রিসাইডিং ও পোলিং কর্মকর্তাদের পরিচয়পত্র বা পরিচয় শনাক্ত করার প্রয়োজনীয় ব্যাজ দেখা যায়নি বলেও দাবি করেন তিনি। এ বিষয়ে প্রশ্ন তোলা হলে কোনো কোনো কর্মকর্তা যথাযথ পরিচয়পত্র দেখাতে পারেননি বলে অভিযোগ করেন গোলাম পরওয়ার।
তিনি বলেন, কয়েকটি ব্যালট বইয়ের মুড়িতে আগাম সিল ও স্বাক্ষর করে রাখা হয়েছিল বলে তারা জানতে পেরেছেন। নিয়ম অনুযায়ী ভোটারকে ব্যালট দেওয়ার প্রক্রিয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সিল ও স্বাক্ষর সম্পন্ন হওয়ার কথা। আগাম সিল ও স্বাক্ষর করে রাখলে জাল ভোটের সুযোগ তৈরি হতে পারে। নির্বাচনী এলাকায় অর্থ বিতরণের অভিযোগও পেয়েছেন তারা। এসব ঘটনার তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তিনি।
ভোটকেন্দ্রে সেনাবাহিনী মোতায়েনের দাবি জানিয়েছিলেন উল্লেখ করে গোলাম পরওয়ার বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যসংখ্যা বেশি থাকলেই নির্বাচন নিরপেক্ষ হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। তবে ভোটারদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, জাল ভোট প্রতিরোধ এবং ভোটকেন্দ্রে শৃঙ্খলা বজায় রাখতে সেনাবাহিনী কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারত।
তিনি বলেন, একটি উপনির্বাচনেই যদি অনিয়মের অভিযোগ কার্যকরভাবে মোকাবিলা করা না যায়, তাহলে ভবিষ্যতে ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা, সিটি করপোরেশন ও উপজেলা পরিষদের নির্বাচন কীভাবে নিরপেক্ষভাবে সম্পন্ন হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দেয়।
সংবাদ সম্মেলনে জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের সেক্রেটারি অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের এবং কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরা সদস্য আতাউর রহমান সরকার উপস্থিত ছিলেন।