মিষ্টির পর ইশরাকের বিদায়— অন্যদের প্রতিও কঠিন বার্তা প্রধানমন্ত্রীর
ক্ষমতাসীন বিএনপির তরুণ নেতা ও মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার ইশরাক হোসেনের পদত্যাগকে ঘিরে সরকার ও দলের ভেতরে নতুন করে আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে। মাদকবিরোধী অভিযানে আগ্নেয়াস্ত্র হাতে তার উপস্থিতির ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার দুই দিনের মাথায় মন্ত্রিসভা ছাড়ার ঘোষণা দিয়েছেন তিনি। এর আগে রাজধানীর মিরপুরে রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনায় অভিযোগের মুখে বিএনপির সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি পদত্যাগ করেন। পরপর দুটি ঘটনায় ক্ষমতাসীন দলের নেতা ও জনপ্রতিনিধিদের প্রতি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কঠোর অবস্থানের বিষয়টি সামনে এসেছে।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এসব ঘটনা শুধু ব্যক্তিগত বা দলীয় শৃঙ্খলার প্রশ্ন নয়; সরকারের ভাবমূর্তি, প্রশাসনিক কর্তৃত্ব এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করার অঙ্গীকারের সঙ্গেও যুক্ত। বিশেষ করে দায়িত্বশীল পদে থাকা ব্যক্তিদের কর্মকাণ্ড নিয়ে বিতর্ক তৈরি হলে সরকার কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানায়, তা পর্যবেক্ষণ করছেন রাজনৈতিক অঙ্গনের সংশ্লিষ্টরা।
তবে ইশরাকের পদত্যাগের ক্ষেত্রে একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। প্রধানমন্ত্রী তাকে পদত্যাগের নির্দেশ দিয়েছেন বলে ১৮ অক্টোবর রাতে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়। পরদিন সংবাদ সম্মেলনে ইশরাক বলেন, তিনি নিজেই প্রধানমন্ত্রীর কাছে পদত্যাগের ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন। বিতর্কের কারণে সরকার ও দলকে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে ফেলতে চাননি বলেও জানান তিনি। ফলে পদত্যাগের পেছনে প্রধানমন্ত্রীর সরাসরি নির্দেশ ছিল কি না, সে বিষয়ে ইশরাকের বক্তব্য ও সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে।
দুই দিনে বিতর্ক থেকে পদত্যাগ
গত ১৭ অক্টোবর রাজধানীর গেন্ডারিয়া এলাকায় মাদকবিরোধী অভিযানে আগ্নেয়াস্ত্র হাতে ইশরাক হোসেনের উপস্থিতির ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ভিডিওতে তাকে অস্ত্র হাতে গাড়ি থেকে নেমে কয়েকজনকে আটকের নির্দেশ দিতে দেখা যায়। তার সঙ্গে থাকা ব্যক্তিদের কয়েকজনের হাতেও অস্ত্র দেখা যায়। এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনার পাশাপাশি একজন প্রতিমন্ত্রীর এ ধরনের অভিযানে অংশ নেওয়ার এখতিয়ার, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা এবং অস্ত্র প্রদর্শনের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
ইশরাকের বক্তব্য, তার আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স রয়েছে এবং নিজের ও অন্যদের নিরাপত্তার স্বার্থে তিনি অস্ত্র হাতে নিয়েছিলেন। তবে আইনগতভাবে অস্ত্রের লাইসেন্স থাকা এবং জনসমক্ষে অস্ত্র প্রদর্শনের বৈধতা এক বিষয় নয়। এ ঘটনায় ঢাকা মহানগর পুলিশ তদন্তের উদ্যোগ নেয়।
১৮ অক্টোবর রাতে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে ইশরাককে পদত্যাগ করতে বলা হয়েছে বলে সংবাদ প্রকাশিত হয়। ১৯ অক্টোবর জাতীয় প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলনে তিনি পদত্যাগের ঘোষণা দেন। তার ভাষ্য, মাদকবিরোধী কার্যক্রম অব্যাহত রাখতে এবং বিতর্কের কারণে সরকার ও দলকে বিব্রতকর অবস্থায় না ফেলতেই তিনি এ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। প্রতিমন্ত্রীর পদ ছাড়লেও বিএনপির কর্মী হিসেবে মাদকবিরোধী কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার কথা জানিয়েছেন তিনি।
ইশরাকের এই সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়েছে-সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা ব্যক্তিদের কর্মকাণ্ড নিয়ে বিতর্ক তৈরি হলে তা রাজনৈতিক নেতৃত্বের জন্যও চাপ সৃষ্টি করতে পারে। তবে পদত্যাগের পাশাপাশি ঘটনাটির আইনগত দিকের নিষ্পত্তি কতটা স্বচ্ছভাবে হয়, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
মিষ্টির পদত্যাগে আগেই সতর্কবার্তা
ইশরাকের ঘটনার আগে গত ২৪ সেপ্টেম্বর রাতে রাজধানীর মিরপুর-১ এলাকায় রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে। পরে কেন্দ্রটির স্থাপনাও ভেঙে ফেলার অভিযোগ সামনে আসে। নিম্ন আয়ের মানুষের স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানটিতে এ ঘটনার পর ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। ঘটনায় বিএনপির সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টির সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ ওঠে। তিনি অভিযোগ অস্বীকার করেন।
ঘটনাটি তদন্তাধীন থাকার মধ্যেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশে মিষ্টিকে সংসদ সদস্য পদ ছাড়তে হয় বলে সরকারি ও সংবাদমাধ্যমের সূত্রে জানা যায়। গত ১ অক্টোবর তিনি জাতীয় সংসদের স্পিকারের কাছে পদত্যাগপত্র জমা দেন। পরে তার আসন শূন্য ঘোষণা করে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় সাংবিধানিক ও নির্বাচনী প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়।
রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্রের ঘটনায় শুধু একজন সংসদ সদস্যের পদত্যাগেই রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া সীমাবদ্ধ থাকেনি। বিএনপির ঢাকা মহানগর উত্তর শাখা ও যুবদলের সংশ্লিষ্ট সাংগঠনিক কমিটির বিরুদ্ধেও পদক্ষেপের ঘোষণা আসে। ফলে ঘটনাটি দলীয় পর্যায়েও শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার প্রশ্ন সামনে আনে।
আলোচনায় স্বাস্থ্য খাতের ৩৪২ কোটি টাকার প্রকল্প
সরকারের সামনে নতুন করে অস্বস্তি তৈরি করেছে ফ্যামিলি কার্ড প্রকল্পের জন্য ৩৪২ কোটি টাকার ট্যাবলেট বা প্যাড কেনার প্রক্রিয়া নিয়ে ওঠা অভিযোগ। জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতা ও সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অভিযোগ করেছেন, স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন বকুলের ভাতিজার মালিকানাধীন একটি প্রতিষ্ঠান এ কাজ পেতে অনিয়মের আশ্রয় নিয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, নৌবাহিনীর অধীন ডকইয়ার্ড অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কসকে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে ব্যবহার করে কাজটি পাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে।
১৫ অক্টোবর জাতীয় একটি ইংরেজি দৈনিকে প্রকাশিত অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে নৌবাহিনীর ডকইয়ার্ড, স্যালেক্সট্রা লিমিটেড ও বুরাক ব্রেক লিমিটেডের মধ্যে ২৪ আগস্টের একটি চুক্তির বিবরণ তুলে ধরা হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, বুরাক ব্রেকের মালিকানা স্বাস্থ্যমন্ত্রীর ভাতিজা ও ভাতিজির সঙ্গে যুক্ত এবং প্রতিষ্ঠানটির আগে ট্যাবলেট সরবরাহের উল্লেখযোগ্য অভিজ্ঞতার তথ্য পাওয়া যায়নি। প্রতিবেদনে চুক্তির অর্থ বণ্টন ও সরাসরি ক্রয়প্রক্রিয়ায় ডকইয়ার্ডের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে।
ওই প্রতিবেদনে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন বকুল বলেন, বুরাক ব্রেক নামে কোনো প্রতিষ্ঠান বা সংশ্লিষ্ট চুক্তির বিষয়ে তিনি অবগত নন। তার বক্তব্য, পরিবারের কেউ ব্যবসায় যুক্ত নন। তবে প্রতিবেদনে তার ভাতিজার সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়টি স্বীকার করার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ঘটনায় সরকারি ক্রয়প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা, প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র এবং প্রভাবশালী ব্যক্তিদের আত্মীয়স্বজনের ব্যবসায়িক সুবিধা পাওয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
সরকারের জন্য এখানে চ্যালেঞ্জ দ্বিমুখী। একদিকে অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করা, অন্যদিকে রাজনৈতিক পরিচয় কিংবা পারিবারিক সম্পর্কের কারণে কাউকে আগাম অপরাধী সাব্যস্ত না করা। তদন্তে অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া এবং প্রমাণ না মিললে অভিযোগের নিষ্পত্তি করা-দুটিই সমান গুরুত্বপূর্ণ।
শিক্ষামন্ত্রীকে ঘিরে বিতর্কও আলোচনায়
শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলনকে ঘিরেও বিতর্ক তৈরি হয়েছে। গণমাধ্যমে তার বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ প্রকাশিত হওয়ার পাশাপাশি তার স্ত্রী ও সাবেক ব্যক্তিগত কর্মকর্তা সোহেলের নামও আলোচনায় এসেছে বলে বিভিন্ন মহলে দাবি করা হচ্ছে। এসব অভিযোগের নির্দিষ্ট নথি ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য যাচাই ছাড়া কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়।
এর আগে গত জুলাইয়ে টানা বৃষ্টি ও জলাবদ্ধতার মধ্যে এইচএসসি পরীক্ষা চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও শিক্ষা বোর্ডগুলোর সমালোচনা হয়। এ সময় এক পরীক্ষার্থীর সঙ্গে শিক্ষামন্ত্রীর কথোপকথনের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ভিডিওতে শিক্ষার্থীদের ‘ফার্মের মুরগি’ বলে মন্তব্য করতে শোনা যাওয়ায় সমালোচনা তৈরি হয় এবং তার পদত্যাগের দাবিও ওঠে।
ওই কথোপকথনে মন্ত্রী বলেন, পরীক্ষা স্থগিতের পক্ষে তার মত ছিল; তবে বৈঠকে অন্যদের মতামত ও আবহাওয়ার পূর্বাভাস বিবেচনায় পরীক্ষা চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। অন্যদিকে, পরীক্ষার্থীরা বৃষ্টিতে ভিজে অসুস্থ হওয়া এবং পরীক্ষার রুটিনে পর্যাপ্ত বিরতি না থাকার বিষয়ে উদ্বেগ জানিয়েছিল।
স্বাস্থ্য ও শিক্ষা-দুটি খাতই সরাসরি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে যুক্ত। এ দুই খাতের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের নিষ্পত্তি তাই শুধু রাজনৈতিক ভাবমূর্তির প্রশ্ন নয়; সরকারি সেবার মান ও জন-আস্থার সঙ্গেও সম্পর্কিত।
মন্ত্রিসভায় রদবদল, দায়িত্বের নিশ্চয়তা নেই
সরকারের দায়িত্ব বণ্টনেও পরিবর্তন এসেছে। গত ২১-২২ আগস্ট তথ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব ছাড়েন জহির উদ্দিন স্বপন। পরে তাঁকে মন্ত্রীর পদমর্যাদায় প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা নিয়োগ দেওয়া হয় এবং তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি-বিজেপির চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার আন্দালিব রহমান পার্থ।
এই পরিবর্তনকে মন্ত্রিসভার পুনর্বিন্যাস ও দায়িত্ব পুনর্বণ্টনের অংশ হিসেবে দেখা হলেও ইশরাক ও মিষ্টির ঘটনাসহ সাম্প্রতিক বিতর্কের প্রেক্ষাপটে দায়িত্বশীল পদে থাকা ব্যক্তিদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ ও নেতৃত্বের আস্থার বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে দলীয় শৃঙ্খলা, প্রশাসনিক দক্ষতা এবং সরকারি সেবার মান নিয়ে বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক বক্তব্য ও পদক্ষেপ সামনে এসেছে। এসব পদক্ষেপের কার্যকারিতা নির্ভর করবে শুধু পদ পরিবর্তন বা পদত্যাগের ওপর নয়, বরং অভিযোগের নিষ্পত্তি এবং প্রতিষ্ঠানগত সংস্কার কতটা এগোয় তার ওপর।
প্রশাসনের প্রতিও কঠোর বার্তা
প্রধানমন্ত্রীর কঠোরতার আলোচনা দলীয় নেতা ও মন্ত্রীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। গত ১৭ অক্টোবর মাত্র সাড়ে চার ঘণ্টায় রাজধানীর ১৩টি স্থানে আকস্মিক পরিদর্শন করেন তারেক রহমান। হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আবাসিক এলাকা এবং হকারমুক্ত ফুটপাত ঘুরে দেখেন তিনি। সকাল ৯টা ১০ মিনিটে শুরু হওয়া এই পরিদর্শন চলে দুপুর ১টা ৪১ মিনিট পর্যন্ত।
পরিদর্শনের সময় তিনি রোগী, শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা ও সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বলেন এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পরিচ্ছন্নতা ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেন। কুয়েত-বাংলাদেশ মৈত্রী সরকারি হাসপাতালে পরিচ্ছন্নতা উন্নয়নে সাত দিন এবং আজিমপুর সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী আবাসিক এলাকার পরিবেশ উন্নয়নে দুই সপ্তাহ সময় বেঁধে দেন।
সরকারি সেবার বাস্তব অবস্থা সরাসরি দেখার এই উদ্যোগ প্রশাসনের কাছে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে। দাপ্তরিক প্রতিবেদন বা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের আশ্বাসের বাইরে গিয়ে মাঠপর্যায়ের পরিস্থিতি যাচাই করা হলে দায়িত্ব পালনের ঘাটতি চিহ্নিত করা সহজ হয়। তবে আকস্মিক পরিদর্শনের ফল স্থায়ী করতে হলে পরবর্তী সময়ে নিয়মিত তদারকি, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ঘাটতি সংশোধন এবং ফলাফল মূল্যায়নের ব্যবস্থা থাকতে হবে।
প্রধানমন্ত্রীর সময়ানুবর্তিতা, মিতব্যয়ী জীবনযাপন এবং সাধারণ মানুষের মতো চলাচলের চেষ্টা নিয়েও আলোচনা হচ্ছে। এসব উদ্যোগের রাজনৈতিক তাৎপর্য থাকলেও শেষ পর্যন্ত প্রশাসনের কার্যকারিতা বিচার হবে নাগরিকেরা সময়মতো ও মানসম্মত সেবা পাচ্ছেন কি না, তার ভিত্তিতে।
অভিযোগের নিষ্পত্তি না হলে ‘কঠোরতা’র বিশ্বাসযোগ্যতা প্রশ্নে
পরপর কয়েকটি ঘটনায় বিএনপির নেতা, সংসদ সদস্য ও মন্ত্রীদের কর্মকাণ্ড নিয়ে বিতর্ক তৈরি হওয়ায় দলের ভেতরে সতর্কতা বাড়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। তবে কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলেই তিনি অপরাধী-এমন ধারণা যেমন গ্রহণযোগ্য নয়, তেমনি রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে অভিযোগের তদন্ত বন্ধ রাখা বা দায় এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগও থাকা উচিত নয়। কোনো ব্যক্তি পদত্যাগ করলেই তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ প্রমাণিত হয়ে যায় না। আবার অভিযোগের ভিত্তিতে কাউকে আগাম দোষী সাব্যস্ত করাও ন্যায়সংগত নয়। তদন্তের ফল, প্রমাণ এবং আইনসম্মত প্রক্রিয়াই হওয়া উচিত চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের ভিত্তি।
বিএনপি ক্ষমতায় আসার আগে দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহার রোধের যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, তার বিশ্বাসযোগ্যতা যাচাই হবে নিজেদের নেতা ও মন্ত্রীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে দল কী আচরণ করে, তা দিয়ে। একই নীতি সবার ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা হলে দলীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে জবাবদিহির সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠার সুযোগ তৈরি হবে।
শেষ পর্যন্ত পরীক্ষা পুরো সরকারের
রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্রের ঘটনায় মিষ্টির পদত্যাগ, মাদকবিরোধী অভিযানে অস্ত্র হাতে উপস্থিতি নিয়ে বিতর্কের পর ইশরাকের পদত্যাগ এবং স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাত ঘিরে ওঠা অভিযোগ-সব মিলিয়ে সরকার এখন ধারাবাহিকতা রক্ষার পরীক্ষায় রয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর কঠোর অবস্থান রাজনৈতিকভাবে কতটা কার্যকর হবে, তা নির্ধারিত হবে শুধু কে পদে থাকলেন আর কে পদ ছাড়লেন, তা দিয়ে নয় বরং অভিযোগের তদন্ত কতটা নিরপেক্ষ হলো, সরকারি ক্রয়প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত হলো কি না, প্রশাসনের নির্দেশনা বাস্তবায়িত হলো কি না এবং আইন সবার ক্ষেত্রে সমানভাবে প্রয়োগ করা হলো কি না-এসব বিষয়ই হবে প্রকৃত মাপকাঠি।
দলের ভেতরে নেতৃত্বের প্রতি আনুগত্য গুরুত্বপূর্ণ; কিন্তু রাষ্ট্র পরিচালনায় আইনের শাসন, প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ম এবং নাগরিকের অধিকার আরও গুরুত্বপূর্ণ। ক্ষমতাসীন দলের পরিচয় কাউকে অভিযোগের ঊর্ধ্বে রাখবে না-এই নীতি যদি বাস্তব সিদ্ধান্তে প্রতিফলিত হয়, তবেই তারেক রহমানের কঠোরতার বার্তা বিশ্বাসযোগ্যতা পাবে।
অন্যদিকে, পদত্যাগ বা পদ পরিবর্তনের মধ্যেই যদি বিতর্কের সমাপ্তি ঘটে এবং মূল অভিযোগগুলোর নিষ্পত্তি না হয়, তাহলে কঠোরতার বার্তা দীর্ঘমেয়াদে প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে। তাই পরীক্ষা শুধু ইশরাক, মিষ্টি কিংবা শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের নয়; পরীক্ষা পুরো সরকারের-তারা কতটা স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও আইনের সমান প্রয়োগ নিশ্চিত করতে পারে।
মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেনের মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ বিষয়ে বিএনপির অন্যতম ভাইস চেয়ারম্যান ড. আসাদুজ্জামান রিপন দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, আমি যেটা বলতে চাই-’২৪-এ মানুষ যে পরিবর্তনটা এনেছে, সেটা গণতান্ত্রিক পরিবেশে কথা বলার জন্য, নিজেকে সার্বভৌম সিটিজেন ভাবার জন্য, নিজের সরকার নিজে গড়ার জন্য এবং যে সরকারকে বানাব, সেই সরকারকে যেন প্রশ্ন করতে পারি, ‘এই, তুমি কী করছ এটা?’ এই যে নাগরিক সরকারকে প্রশ্ন করতে পারে এবং সরকারও বোধ করে যে ‘আমি কিন্তু প্রশ্নের সম্মুখীন হচ্ছি এবং আমাকে কিন্তু জনগণের কাছে জবাবদিহি করতে হবে’-এই যে আজকে আমি একজন প্রতিমন্ত্রীকে পদত্যাগ করতে দেখলাম বিকজ অব পিপলস পালস, মিডিয়ার পালস। গণমাধ্যমের যে আলোচনাগুলো, নাগরিকদের যে ভাবনাগুলো, সরকার হয়তো অনুভব করেছে যে, জনগণ বিষয়টা ভালোভাবে নিচ্ছে না। প্রাইম মিনিস্টার আস্কড হিজ ক্যাবিনেট কলিগ এবং উনি রিজাইন (রিলিনকুইশ) করেছেন এবং যিনি রিলিনকুইশ করেছেন, তাকেও আমি বলব যে তিনিও ডেমোক্রেসির স্পিরিটকে রেসপেক্ট করেছেন; তার উদ্দেশ্য ও সদিচ্ছা নিয়ে আমার কোনো ভিন্নমত নাই।