০২ অক্টোবর ২০২৬, ১৯:৫০

কেন এত ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন মেজর আখতারুজ্জামান, জামায়াতের ৩৪ এমপি ফেরার সময় কী ঘটেছিল বিমানবন্দরে?

জামায়াত নেতা মেজর আখতারুজ্জামান, বামে বিমানবন্দর কর্মকর্তার সঙ্গে উচ্চবাচ্য করার সময়  © টিডিসি সম্পাদিত

হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে লাগেজ ও ট্রলি সংকটকে কেন্দ্র করে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি, সরকারি কাজে বাধা এবং দায়িত্বরত নিরাপত্তা কর্মকর্তাকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করার মামলায় জামায়াত নেতা মেজর (অব.) আখতারুজ্জামানকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত কমিশনার (গোয়েন্দা) শফিকুল ইসলাম এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

আজ শুক্রবার (২ অক্টোবর) রাজধানীর ক্যান্টনমেন্ট এলাকার নিজ বাসভবন থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গ্রেপ্তারের আগে একটি ভিডিও বার্তাও দিয়েছেন মেজর আখতারুজ্জামান।

জানা গেছে, শুক্রবার বিমানবন্দরের নিরাপত্তা কর্মকর্তা মো. শাহরিয়ার আলম সজিব বাদী হয়ে বিমানবন্দর থানায় দণ্ডবিধির একাধিক ধারায় মামলাটি দায়ের করেন। একই দিন বিকালে মামলার এজাহার আদালতে এলে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আলবিরুনী মীর তা গ্রহণ করেন। বিমানবন্দর থানার এসআই মাজেদুল ইসলামকে আগামী ১০ নভেম্বরের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে নির্দেশ দিয়েছেন বলেও জানিয়েছেন প্রসিকিউশন বিভাগের এসআই আবু বক্কর ছিদ্দিক।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বৃহস্পতিবার সৌদি আরবের মদিনা থেকে আসা বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের একটি বিমান বন্দরে আসার পর লাগেজ বেল্ট এলাকায় ট্রলির সংকট দেখা দেয়। বিমানটির যাত্রীদের বড় একটি অংশ পবিত্র ওমরা পালন শেষে ফিরছিলেন। যাত্রী তালিকায় জামায়াতে ইসলামীর ৩৪ জন সংসদ সদস্যও ছিলেন। সঙ্গে ছিলেন তাদের পরিবারের সদস্যরা। এ সময় লাগেজ পেতে বিলম্ব, দীর্ঘ লাইন, জমজমের পানি নিয়ে অব্যবস্থাপনা এবং বসার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না থাকায় যাত্রীদের মধ্যে ক্ষোভ দেখা দেয়। এ থেকেই ঘটনার সূত্রপাত।

ডিবি পুলিশ আমাকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে যাচ্ছে। সবাইকে বিষয়টি জানিয়ে রাখলাম। দোয়া করবেন, দেশের মানুষ-জনগণ ও প্রবাসীদের জন্য যেন শহীদ হতে পারি, আল্লাহ যেন আমার সেই আহ্বান কবুল করবেন। জনগণের অধিকারে-সংগ্রামে আমি আছি, থাকব। যতদিন বেঁচে আছি, জনগণের জন্য সংগ্রাম করব— গ্রেপ্তার হওয়ার আগে ভিডিওবার্তা মেজর (অব.) আখতারুজ্জামান

মামলা, পুলিশের বক্তব্য এবং বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণেও এর প্রমাণ মিলেছে। পুলিশ বলছে, বৃহস্পতিবার বেলা পৌনে ১১টার দিকে সৌদি আরবের মদিনা থেকে আসা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের একটি উড়োজাহাজ (বিজি-৩৩৮) থেকে যাত্রীরা নামার পর ৮ নম্বর লাগেজ বেল্ট এলাকায় ট্রলির সংকট দেখা দেয়। এতে লাগেজ পেতে বিলম্ব হওয়ায় যাত্রীদের মধ্যে ক্ষোভ ও উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। এ সময় ঢাকা-৫ আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ কামাল হোসেনের আহ্বানে পরিস্থিতি দেখতে ঘটনাস্থলে যান বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন এস এম রাগীব সামাদ।

ওই বিমানে সপরিবারে জামায়াতের এই ৩৪ এমপি দেশে ফেরেন

মামলার বরাত দিয়ে পুলিশ জানিয়েছে, একপর্যায়ে আখতারুজ্জামান বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন এস এম রাগীব সামাদের দিকে আক্রমণাত্মক ভঙ্গিতে এগিয়ে যান এবং ‘আমি কিন্তু পিটাবো ধইরা’, ‘ঘাড় ধরে বের করে দিবো’ বলে প্রকাশ্যে হুমকি দেন। একই সাথে বিমান ও পর্যটনমন্ত্রী (এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত) সম্পর্কেও চরম অশালীন মন্তব্য করেন।

মামলার বিবরণে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, আখতারুজ্জামানের সঙ্গে থাকা প্রটোকল সহকারীরা বিমানবন্দরের সংরক্ষিত কেপিআই এলাকায় মুঠোফোনে ভিডিও ধারণ শুরু করেন। সেখানে দায়িত্বরত নিরাপত্তা সুপারভাইজার ওয়ারেন্ট অফিসার মোহাম্মদ কামাল উদ্দিন তাদের ভিডিও ধারণে নিষেধ করেন। এতে আখতারুজ্জামান ক্ষিপ্ত হয়ে ওই কর্মকর্তাকে গালিগালাজ করেন এবং একপর্যায়ে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করেন। সাধারণ যাত্রীদের সংগ্রহ করা পবিত্র জমজমের পানির বোতলের ক্ষতিসাধন এবং বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের একজন প্রতিনিধির সঙ্গে মারমুখী আচরণের অভিযোগও আনা হয়েছে।

ওই সময়ের একটি ভিডিওতে দেখা যায়, ওমরাহযাত্রীদের জমজমের পানি সরবরাহে বিলম্ব নিয়ে আখতারুজ্জামান নির্বাহী পরিচালক এস এম রাগীব সামাদকে বলছিলেন, ‘ঘাড় ধরে বের করে দেব, ঘাড় ধরে বের করে দেব। আপনারা কাজ করেন না, কিছু করেন না। তদবির করে পোস্ট নেন। মাইর খাইতে চান?’

এদিকে ঘটনার সময় ‘দায়িত্বে অবহেলা’র অভিযোগে সংশ্লিষ্ট ব্যাগেজ ইনচার্জ মনিরুল ইসলাম প্রধান এবং ফ্লাইট সুপারভাইজার সাদ্দাম হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করে তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ শুরু হয়েছে। মূলত বিমানটি অবতরণের পর প্রায় তিন ঘণ্টা পার হলেও কন্টেইনার অফলোডিং ও পরিচালনগত গাফিলতির কারণে যাত্রীরা লাগেজ এবং জমজমের পানি না পাওয়ায় জামায়াতের ৪ জন এমপি সাধারণ যাত্রীদের পক্ষে বিমান কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিত অভিযোগ দেন। এর প্রেক্ষিতে তাদের সাময়িক বরখাস্ত করা হয়।

বৃহস্পতিবার বেলা পৌনে ১১টার দিকে সৌদি আরবের মদিনা থেকে আসা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের একটি উড়োজাহাজ (বিজি-৩৩৮) থেকে যাত্রীরা নামার পর ৮ নম্বর লাগেজ বেল্ট এলাকায় ট্রলির সংকট দেখা দেয়। এতে লাগেজ পেতে বিলম্ব হওয়ায় যাত্রীদের মধ্যে ক্ষোভ ও উত্তেজনা সৃষ্টি হয়— মামলার বিবরণে বাদীর বর্ণনা

এদিকে গ্রেপ্তারের আগে মেজর আখতারুজ্জামান ভিডিও বার্তায় বলেছেন, ‘ডিবি পুলিশ আমাকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে যাচ্ছে। সবাইকে বিষয়টি জানিয়ে রাখলাম। দোয়া করবেন, দেশের মানুষ-জনগণ ও প্রবাসীদের জন্য যেন শহীদ হতে পারি, আল্লাহ যেন আমার সেই আহ্বান কবুল করবেন। জনগণের অধিকারে-সংগ্রামে আমি আছি, থাকব। যতদিন বেঁচে আছি, জনগণের জন্য সংগ্রাম করব।’

ঘটনার সময় বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন এস এম রাগীব সামাদ ও মেজর আখতারুজ্জামান, মাঝে দাঁড়িয়ে জামায়াতের এমপি কামাল হোসেন

ঘটনার কাছাকাছি সময়েই বিমানবন্দর থেকে লাইভে ফেসবুকের ফলোয়ারদের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলেন জনপ্রিয় ট্রাভেল কনটেন্ট ক্রিয়েটর ডা. ওরাকাতুল জান্নাত। ওই সময় তিনি বারবার বিমানবন্দরে নামার পরের ভোগান্তি নিয়ে কথা বলেছিলেন। এমনকি কোনো এক পাপের কারণে বাংলাদেশে জন্ম নিতে হয়েছে বলেও আক্ষেপ করেছিলেন তিনি। তার ভিডিওতেও বেশ কয়েকবার মেজর আখতারুজ্জামানকে দেখা গেছে।

ওই সময় ডা. ওরাকাতুল জান্নাত বলেন, ‘আমরা ৯টা বাজার ৫ মিনিট আগে ল্যান্ড করছি। এখন বাজে হচ্ছে সকাল ১১টা। ট্রলির জন্য প্রথমে আমরা আধা ঘণ্টা-৪০ মিনিট লাইনে দাঁড়ালাম। ট্রলির লাইন শেষ হলো, ওয়েট করতে করতে লাগেজ আসে না। এখন বাজে সাড়ে ১১টা, অলমোস্ট ৩ ঘণ্টা! ৩ ঘণ্টার ভোগান্তি... এই ভোগান্তি বলার মতো না।’

এত ভোগান্তি, এগুলো আসলে কাকে বলবেন? আমাদের কিসমত! আমরা এমন এক দেশে জন্মাইছি। বলে না যে পাপের কারণে আমরা জন্মাইছি! কোনো এক পাপ হইছিল এইজন্য এই দেশে আমরা জন্মাইছি এবং এই সাফারিংগুলা আমাদের জন্য জীবনভরের সাফারিং! এই সাফারিংগুলা কোনোদিন শেষ হবে না— কাছাকাছি সময়ে ফেসবুক লাইভে বিমানবন্দরের ভোগান্তি প্রসঙ্গে জনপ্রিয় ট্রাভেল কনটেন্ট ক্রিয়েটর ডা. ওরাকাতুল জান্নাত

তিনি আরও বলেন, ‘৫০০ মিটার থেকে ১ কিলোমিটার লম্বা সিরিয়াল হবে জানিয়ে তিনি বলেন, এগুলো দেখার কেউ নাই! ৩ ঘণ্টা ধরে আমরা দাঁড়িয়ে আছি, বসার একটা জায়গা নাই অ্যারাইভ্যালে! যেখানে ব্যাগেজ ক্লেইম হয়, সেখানে বসার কোনো জায়গা নাই! মুরুব্বিরা আছে, বয়স্ক মানুষজন আছে, বাচ্চাকাচ্চাসহ লোকজন আছে, বসার কোনো জায়গা নাই! মানুষের ধৈর্যের একটা পরীক্ষা হয়ে যায়!’

একই সময়ে ফেসবুক লাইভে ভোগান্তির কথা বর্ণনা করেন জনপ্রিয় কনটেন্ট ক্রিয়েটর ডা. ওরাকাতুল জান্নাত

জমজমের পানি নিতে না দেওয়া এবং বিমানবন্দর কর্মকর্তাদের অবহেলা ও উপেক্ষার বিবরণ দিয়ে এই কনটেন্ট ক্রিয়েটর বলেন, ‘জমজমের পানি আসে নাই, বিমান বলতেও পারে না যে ওখান থেকে পানি লোড হয়েছে কি লোড হয়নি! বিমান একটা এক্সপ্লেনেশন দেয়ার প্রয়োজন বোধ করে নাই! এসে মানুষজন ৩ ঘণ্টা ধরে দাঁড়িয়ে আছে যে আপনারা... আপনাদের জিনিস আসে নাই, আপনারা পরে আসেন—এটাও এক্সপ্লেনেশন দেয়ার প্রয়োজন বোধ করে নাই!’

ক্ষুব্ধ হয়ে তিনি বলেন, ‘এত ভোগান্তি, এগুলো আসলে কাকে বলবেন? আমাদের কিসমত! আমরা এমন এক দেশে জন্মাইছি। বলে না যে পাপের কারণে আমরা জন্মাইছি! কোনো এক পাপ হইছিল এইজন্য এই দেশে আমরা জন্মাইছি এবং এই সাফারিংগুলা আমাদের জন্য জীবনভরের সাফারিং! এই সাফারিংগুলা কোনোদিন শেষ হবে না।’