২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২০:০১

বিএনপিতে সুবিধাবাদীদের দাপট, ত্যাগীরা হতাশ

বিএনপি ও সরকার  © লোগো

দীর্ঘ দেড় যুগেরও বেশি সময়ের রাজনৈতিক প্রতিকূলতা, হামলা-মামলা, গ্রেপ্তার ও নানা হয়রানি মোকাবিলা করে যারা বিএনপির রাজপথের আন্দোলনে সক্রিয় ছিলেন, তাদের একটি অংশ এখন দল ক্ষমতায় আসার পর নিজেদের অবমূল্যায়িত মনে করছেন।

গেল ১২ ফেব্রুয়ারির ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর বিএনপি সরকার গঠনের ৭ মাস না পেরোতেই তৃণমূলের বিভিন্ন স্তরে এমন ক্ষোভ ও হতাশার কথা সামনে আসছে। তাদের অভিযোগ, দলের দুঃসময়ে মাঠে থাকা পরীক্ষিত নেতাকর্মীদের তুলনায় ক্ষমতার আশপাশে থাকা নতুন মুখ, ব্যবসায়ী ও সুযোগসন্ধানী গোষ্ঠীর প্রভাব বাড়ছে।

বিএনপির তৃণমূলের কয়েকজন নেতাকর্মীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তাদের অসন্তোষের মূল জায়গা শুধু পদ-পদবি নয়; স্থানীয় প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি, উন্নয়নকাজ, সরকারি সুযোগ-সুবিধা কিংবা সাংগঠনিক সিদ্ধান্তে নিজেদের কার্যকর ভূমিকা না থাকার বিষয়টিও তাদের হতাশ করছে। দীর্ঘদিন মামলা মোকাবিলা, আত্মগোপন ও রাজনৈতিক কর্মসূচিতে সক্রিয় থাকা নেতাদের অনেকে এখন মনে করছেন, সুসময়ে তাদের ত্যাগের স্বীকৃতি মিলছে না।

এদিকে, বিএনপির নেতৃত্বও বিষয়টি উপেক্ষা করছে না বলে সাম্প্রতিক বক্তব্যে ইঙ্গিত মিলেছে। গেল ১৪ জুলাই বরিশালে বিএনপির সাংগঠনিক সভায় বিএনপি চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সরাসরি ‘হাইব্রিড’ ও অনুপ্রবেশকারীদের বিষয়ে সতর্ক করেন। তিনি বলেন, কোনোভাবেই হাইব্রিড বা অনুপ্রবেশকারীদের বিএনপিতে জায়গা দেওয়া যাবে না।

বক্তব্যে তিনি গত ১৭ বছর নির্যাতন, গুম, হত্যা ও মামলার মধ্যেও যারা দলকে টিকিয়ে রেখেছেন, তাদের ত্যাগের যথাযথ মূল্যায়নের কথা জানান। 

প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, গত ১৭ বছর নির্যাতন, গুম, হত্যা ও মামলার মধ্যেও তৃণমূল নেতাকর্মীরা দলকে টিকিয়ে রেখেছেন। সেই ত্যাগের মূল্যায়ন করেই দলকে এগিয়ে নেওয়া হবে।

বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী আহমেদ দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, হাইব্রিডরা সব সময় একটু সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করে, তবে “হাইব্রিড নেতাদের বিষয়ে বিএনপি সতর্ক রয়েছে” এবং নেতাকর্মীদের সতর্ক করা হয়েছে।

তিনি জানান, দলীয় নাম ব্যবহার করে চাঁদাবাজি, দখলবাজি বা অন্য কোনো অপকর্মের বিরুদ্ধে বিএনপি ব্যবস্থা নিচ্ছে এবং এ ক্ষেত্রে দলের অবস্থান ‘জিরো টলারেন্স’। 

জানা গেছে, দলটির ভেতর থেকেই অনুপ্রবেশকারী ও সুবিধাবাদীদের বিষয়ে সতর্কতার কথা বলা হচ্ছে। বিএনপির অঙ্গ সংগঠন জাতীয়তাবাদী যুবদল সভাপতি আব্দুল মোনায়েম মুন্না বলেছেন, দলের কঠিন সময়ে যারা পাশে ছিলেন না, সুসময়ে তাদের স্বাগত জানানো হবে না।

বিএনপির খুলনা বিভাগীয় সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক ছাত্রদলের সাবেক নেতা জয়ন্ত কুমার কুন্ডুও ‘ফিল্টারিং’-এর মাধ্যমে দুর্দিনের ত্যাগী ও পরীক্ষিত নেতাদের মূল্যায়নের কথা বলেছেন।

এ নিয়ে সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনাও আলোচনায় এসেছে। আগস্টে বিএনপির মিডিয়া সেলের ডিজিটাল টিমের গ্রাফিকস ডিজাইনার তানিম সুফিয়ানীকে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। দলটির পক্ষ থেকে জানানো হয়, তার আগের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড ও বিএনপি এবং খালেদা জিয়াকে নিয়ে করা কিছু মন্তব্যের তথ্য ছড়িয়ে পড়ার পর এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এরপর গেল কয়েকদিন আগে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে এক গুরুত্বপূর্ণ পদে বিগত সরকারের পদলেহী ও আওয়ামীপন্থি কর্মকর্তার পদায়ন নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তুমুল সমালোচনা চলছে। এসব ঘটনা দলীয় কাঠামোতে নতুন করে রাজনৈতিক পরিচয় যাচাইয়ের প্রশ্ন সামনে আনছে।

তৃণমূলের অভিযোগের আরেকটি দিক হলো অর্থ ও প্রভাবের ব্যবহার। স্থানীয় পর্যায়ের কয়েকজন নেতার দাবি, জনপ্রতিনিধি বা ক্ষমতাবান নেতাদের ঘিরে এমন একটি বলয় তৈরি হয়েছে, যেখানে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সম্পর্কের চেয়ে অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও ব্যক্তিগত যোগাযোগ বেশি কার্যকর হয়ে উঠছে। তবে এসব অভিযোগের বড় অংশই দলীয় নেতাকর্মীদের বক্তব্যনির্ভর; নির্দিষ্ট ঘটনা ও অর্থ লেনদেনের অভিযোগের ক্ষেত্রে স্বাধীনভাবে যাচাই প্রয়োজন।

সম্প্রতি ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট থানার ওসির একটি অডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার ঘটনাও প্রশাসনিক পদায়নে অর্থ ও রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগকে আলোচনায় এনেছে। অডিও ছড়িয়ে পড়ার পর ওসি মো. রাকিবুল হাসানকে প্রত্যাহার করে তদন্ত শুরু করেছে পুলিশ; অডিওটি তার কণ্ঠের কি না, তা যাচাইয়ে ফরেনসিক পরীক্ষার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। 

তৃণমূলের নেতাদের ভাষ্য, ক্ষমতার সঙ্গে যুক্ত হওয়ার সুযোগ তৈরি হলেও বড় সরকারি কাজ, টেন্ডার বা ঠিকাদারি ব্যবসায় প্রবেশের মতো আর্থিক সক্ষমতা তাদের অনেকের নেই। ব্যাংক গ্যারান্টি, অভিজ্ঞতা ও টার্নওভারের মতো প্রাতিষ্ঠানিক শর্তও নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য বড় বাধা। ফলে দীর্ঘদিন রাজনীতিতে সক্রিয় থাকা নেতারা মনে করছেন, ক্ষমতার পরিবর্তন হলেও অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী গোষ্ঠীর প্রভাব কমেনি।

ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) বক্তব্যে দলীয় শৃঙ্খলা, অনুপ্রবেশকারী ও অবৈধ দখল-চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে অবস্থানের কথা জানিয়েছেন। তিনি বলেন, বিএনপি ক্ষমতার জোরে নয়, জনগণের শক্তির ওপর নির্ভর করে রাজনীতি করে।

তৃণমূলের প্রশ্ন, এসব ঘোষণার বাস্তব প্রয়োগ কতটা হচ্ছে। কারণ মাঠপর্যায়ের নেতাদের মতে, কোনো কর্মীর দীর্ঘ রাজনৈতিক ইতিহাস, মামলা-হামলার রেকর্ড, সাংগঠনিক ভূমিকা ও জনসম্পৃক্ততা বিবেচনায় না নিয়ে কেবল ক্ষমতার কাছাকাছি থাকার ভিত্তিতে গুরুত্ব দেওয়া হলে ভবিষ্যতে সংগঠনের ভেতরে অসন্তোষ আরও বাড়তে পারে।

ইতোমধ্যে বিভিন্ন জেলা ও উপজেলায় ত্যাগী নেতাদের মূল্যায়ন এবং ‘হাইব্রিড’বা নতুন করে দলে আসা ব্যক্তিদের ভূমিকা নিয়ে অসন্তোষের খবরও প্রকাশিত হয়েছে। মাদারগঞ্জে বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও ত্যাগী নেতাদের কোণঠাসা হওয়ার অভিযোগ নিয়ে সাম্প্রতিক প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে।

দলের জন্য দীর্ঘদিন মাঠে থাকা এক জেলা পর্যায়ের নেতা বলেন, ‘দুঃসময়ে মামলা-মোকদ্দমা ও পুলিশের হয়রানি মোকাবিলা করেছি। এখন দল ক্ষমতায়, অথচ সিদ্ধান্ত গ্রহণের জায়গায় আমাদের কথা শোনা হয় না।’তার ভাষ্য, ত্যাগীদের প্রত্যাশা ব্যক্তিগত সুবিধা নয়; বরং সাংগঠনিক মর্যাদা ও রাজনৈতিক স্বীকৃতি।

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, ক্ষমতায় থাকার সময় কোনো দলের জন্য সবচেয়ে বড় সাংগঠনিক চ্যালেঞ্জ হলো সরকার ও দলের ভূমিকার মধ্যে ভারসাম্য রাখা এবং দলীয় সিদ্ধান্তে যোগ্যতা ও পরীক্ষিত রাজনৈতিক ভূমিকার মূল্যায়ন নিশ্চিত করা। বিএনপির ক্ষেত্রেও ত্যাগী নেতাকর্মীদের অভিযোগের যথাযথ সাংগঠনিক পর্যালোচনা না হলে দীর্ঘদিনের কর্মীদের মধ্যে নিষ্ক্রিয়তা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। একই সঙ্গে অর্থ, প্রভাব কিংবা ব্যক্তিগত যোগাযোগের অভিযোগের ক্ষেত্রেও সুনির্দিষ্ট প্রমাণ ও প্রাতিষ্ঠানিক তদন্তের মাধ্যমে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি উঠছে।

ফলে বিএনপির সামনে এখন দুটি সমান্তরাল চ্যালেঞ্জ-একদিকে ক্ষমতাকে ঘিরে তৈরি হওয়া নতুন সুবিধাভোগী বলয় নিয়ন্ত্রণ, অন্যদিকে দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত নেতাকর্মীদের সাংগঠনিকভাবে পুনর্মূল্যায়ন। হাইকমান্ডের ঘোষিত ‘ফিল্টারিং’বাস্তবে কতটা কার্যকর হয়, সেটিই এখন তৃণমূলের অন্যতম আগ্রহের বিষয়।