চমক আসছে বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বে, আলোচনায় জাতীয় কাউন্সিলও
নতুন করে চারজনকে দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটিতে সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করেছে বিএনপি। তবে শুধু স্থায়ী কমিটিই নয়, জাতীয় নির্বাহী কমিটিতেও আসতে চলেছে আরও বড় রদবদল। মহাসচিব, সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব ও যুগ্ম মহাসচিবসহ বেশ কিছু পদে শীঘ্রই পরিবর্তন দেখা যাবে। কাউন্সিল ঘিরে এই পরিবর্তন আসবে বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে।
শনিবার দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী আহমেদ, স্বৈরাচার এরশাদবিরোধী আন্দোলনের অন্যতম প্রধান ছাত্রনেতা বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা কাউন্সিলের সদস্য আমানউল্লাহ আমান ছাড়াও জিয়া পরিবারের চ্যারিটি সংস্থা ‘জিয়াউর রহমান ফাউন্ডেশনে’র নির্বাহী পরিচালক ফরহাদ হালিম ডোনার এবং সাবেক আমলা ইসমাইল জবিউল্লাকে চেয়ারম্যানের নির্দেশ ও ক্ষমতাবলে স্থায়ী কমিটির সদস্য করা হয়েছে। এর ফলে এ কমিটিতে বর্তমানে সদস্য সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৫ জনে। গঠনতন্ত্রে মোট ১৯ জন সদস্য থাকার কথা থাকলেও দীর্ঘদিন ধরেই দলটির এই ফোরাম সেই কোটা অপূর্ণ থেকে আসছে।
চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া, কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার জমিরউদ্দিন সরকার মৃত্যুবরণ করেছেন। এছাড়া, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের স্পিকারের দায়িত্বপ্রাপ্ত হওয়ায় হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীরবিক্রম কমিটি থেকে পদত্যাগ করেছেন। সম্প্রতি দেশের তেইশতম রাষ্ট্রপতি হিসেবে দলীয় মনোনয়ন পাওয়ায় এই কমিটি ও বিএনপি থেকে পদত্যাগ করেছেন দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। সেই হিসেবে এখনও স্থায়ী কমিটির ৪টি পদ শূন্য রয়ে গেল।
দলটির গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, দলের চেয়ারম্যান, সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান ও মহাসচিব জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য হিসেবে নির্বাচিত বলে গণ্য হবেন। তাদেরসহ জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য সংখ্যা হবে ১৯ জন। চেয়ারম্যান এ কমিটির প্রধান থাকবেন এবং তিনি স্থায়ী কমিটির সভা আহ্বান করবেন। জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্যবৃন্দ তাদের পদাধিকার বলে জাতীয় কাউন্সিলের সদস্য বলে গণ্য হবেন। গঠনতন্ত্রে জাতীয় স্থায়ী কমিটির দায়িত্ব ও কর্তব্যও নির্ধারণ করা আছে।
দলের সাংগঠনিক কার্যক্রমে আরও গতিশীলতা আনা, নীতিনির্ধারণী কার্যক্রম জোরদার করা এবং দলীয় শৃঙ্খলা ও সার্বিক সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে নজরদারি বাড়ানোর লক্ষ্যেই এ পরিবর্তন আনা হয়েছে বলে বিএনপির দলীয় সূত্র জানিয়েছে।
এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বিএনপি জানিয়েছে, নতুন দায়িত্ব পাওয়া নেতারা তাদের দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ও নেতৃত্বের দক্ষতা কাজে লাগিয়ে দলের পাশাপাশি জনগণের স্বার্থে নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবেন বলে দল আশা করছে।
বিএনপি সূত্র জানায়, জাতীয় স্থায়ী কমিটিতে এখনো পাঁচটি পদ শূন্য রয়েছে। এসব পদেও শিগগিরই নতুন ও নিবেদিতপ্রাণ নেতাদের অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। এর মাধ্যমে দলের সাংগঠনিক কার্যক্রমে আরও গতি আনার চেষ্টা করা হচ্ছে। একজন স্থায়ী কমিটির সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘স্থায়ী কমিটির পাঁচটি পদ এখনো শূন্য রয়েছে। দলীয় সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে গতিশীলতা আনতে এসব পদে নতুন ও যোগ্য নেতাদের অন্তর্ভুক্ত করা হবে।’
বিএনপির সর্বশেষ জাতীয় কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয়েছিল ২০১৬ সালের ১৯ মার্চ। এরপর জাতীয় স্থায়ী কমিটি পুনর্গঠন করা হলেও বিভিন্ন সময়ে মৃত্যু, পদত্যাগ ও অন্যান্য কারণে কমিটির বেশ কয়েকটি পদ শূন্য হয়ে যায়। বিভিন্ন সময়ে কিছু পদে নতুন সদস্য নিয়োগ দেওয়া হলেও এবার একসঙ্গে চারজনকে স্থায়ী কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করা হলো।
দলীয় সূত্রের দাবি, বিএনপির চেয়ারপারসনের ৮৫ সদস্যের উপদেষ্টা কাউন্সিলেও অন্তত ১১টি পদ বর্তমানে শূন্য রয়েছে। কয়েকজন সদস্যের মৃত্যু, কয়েকজনের স্থায়ী কমিটিতে পদোন্নতি এবং দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে কয়েকজনকে বহিষ্কারের কারণে এসব পদ শূন্য হয়েছে। এ ছাড়া বিএনপির ৩৫ সদস্যের ভাইস চেয়ারম্যান প্যানেলেও বিভিন্ন কারণে বেশ কয়েকটি পদ শূন্য রয়েছে।
মহাসচিব পদে আসতে পারেন রিজভী আহমেদ
মো. সাহাবুদ্দিন রাষ্ট্রপতির পদ থেকে পদত্যাগ করার পর দলের কোন নেতাকে ওই পদে বসানো হবে, সেই আলোচনার অবসান হয়েছে কদিন আগে। গেল ১৩ আগস্ট দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে রাষ্ট্রপতি প্রার্থী ঘোষণা ও নির্বাচন কমিশনের তফসিল অনুযায়ী রবিবার (১৬ আগস্ট) বাছাইয়ে তা চূড়ান্ত হওয়ায় দলের মহাসচিবের পদটিও শূন্য হয়ে গেছে।
জাতীয় সংসদে বিএনপির সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় রাষ্ট্রপতি পদে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নির্বাচিত হওয়ার বিষয়টি প্রায় নিশ্চিত। যে কারণে তার শূন্য পদে আগামীতে কে হবেন বিএনপির মহাসচিব সেটি নিয়েও নানা আলোচনা শুরু হয়েছে। প্রথমে ভারপ্রাপ্ত তারপর কাউন্সিলের মাধ্যমে মহাসচিব নির্বাচিত হওয়ার পর প্রায় ১৬ বছর ধরে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ এই পদে আসীন ছিলেন মির্জা ফখরুল। তার এই পদে কে আসবেন, দলের ভেতর ও বিভিন্ন গণমাধ্যমে কয়েকজন নেতার নামই ঘুরেফিরে আসছে।
তবে, বিএনপির একাধিক নেতা জানিয়েছেন, দলের পক্ষ থেকে এখনো পর্যন্ত কাউকে এই পদের জন্য চূড়ান্ত বা ভারপ্রাপ্ত হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়নি। বিএনপির গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, দলের স্থায়ী মহাসচিব নির্বাচিত হন জাতীয় কাউন্সিলের মাধ্যমে। তার আগে পর্যন্ত কোনো নেতা সাময়িকভাবে বা ভারপ্রাপ্ত হিসাবে মহাসচিবের দায়িত্ব পালন করতে পারেন।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সেলিমা রহমান বলেন, মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর পূর্ণাঙ্গ মহাসচিব থাকাকালে সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব ছিলেন রুহুল কবির রিজভী আহমেদ। দলের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী রিজভীই ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব হবেন।
বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদুও বলেন, যেহেতু মহাসচিব পদত্যাগ করে চলে গেছেন এবং এই মুহূর্তে দলের কোনো কাউন্সিল হচ্ছে না, তাই একজন ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব দায়িত্ব গ্রহণ করবেন। তার (সাবেক মহাসচিবের) পরে জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে যিনি আছেন অথবা অন্য কোনো নেতা—অর্থাৎ একজন ভারপ্রাপ্ত হিসেবে দায়িত্ব পাবেন।
দলীয় গঠনতন্ত্রের নিয়ম উল্লেখ করে বিএনপির এই ভাইস চেয়ারম্যান আরও বলেন, আমাদের দলের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী সাধারণত পার্টির চেয়ারম্যানই মহাসচিব মনোনীত করেন। পরবর্তীতে সেটি কাউন্সিলে অনুমোদন করিয়ে নেওয়া হয়। কিন্তু যেহেতু এখন কাউন্সিল হচ্ছে না, সেই হিসেবে চেয়ারম্যান যাকে মনোনীত করবেন, তিনিই আগামী কাউন্সিল হওয়া পর্যন্ত মহাসচিবের দায়িত্ব পালন করবেন।
সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব পদে আসতে পারেন সোহেল
এদিকে, দলের দীর্ঘদিনের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব (দপ্তরসহ) রুহুল কবির রিজভী আহমেদ জাতীয় স্থায়ী কমিটিতে পদ পাওয়ায় বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিবের পদটিও এখন শূন্য হয়ে পড়ল। দলের এক নীতিনির্ধারক নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, আপাতত এ পদটি শূন্য রেখে ‘ভারপ্রাপ্ত’ দিয়ে চালিয়ে নেয়া হতে পারে। আসন্ন জাতীয় কাউন্সিলের মাধ্যমে পূর্ণাঙ্গ মহাসচিব পদটি পূরণ করার সম্ভাবনা রয়েছে।
বিএনপি সূত্র আরও জানায়, বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব হাবিব উন নবী খান সোহেলকে সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব পদে উন্নীত করার বিষয়টি দলের হাইকমান্ডের বিশেষ বিবেচনায় রয়েছে। গত ১৫ বছরে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় তিনি কঠোর রাজনৈতিক নিপীড়ন ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। ফ্যাসিবাদী হাসিনা শাসনামলে দলের লাখ লাখ নেতাকর্মীদের মতো সোহেলও হামলা-মামলা-কারা নির্যাতনের শিকার হয়েছেন।
হাসিনার স্বৈরশাসনে বিএনপির নেতাকর্মীদের মধ্যে সোহেল সর্বাধিক ৬ শতাধিক মামলার আসামি ছিলেন। গণআন্দোলনের মুখে ফ্যাসিস্ট সরকারের পতনের পর দলের অনেক নেতাকর্মী যেখানে ধানের শীষের প্রার্থী হিসেবে সংসদ সদস্য এমনকি মন্ত্রিত্ব পর্যন্ত লাভ করেছেন, সেখানে প্রয়াত চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার স্নেহভাজন হাবিব উন নবী সোহেল ‘খোলা চোখে’ বঞ্চিতই রয়ে গেছেন। এসব দিকও তার দলীয় পদোন্নতির ক্ষেত্রে বিবেচনায় আসতে পারে বলে সূত্রটি জানায়।
যুগ্ম মহাসচিব পদ
বিএনপির গঠনতন্ত্র অনুযায়ী দলে মোট ৭ জন যুগ্ম মহাসচিব দায়িত্ব পালন করবেন। সেই ৭ জনের মধ্যে দলের দীর্ঘকালীন সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী আহমেদ বা অন্য কোনো নেতা মহাসচিবের শূন্যপদে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব ও হাবিব উন নবী খান সোহেল রিজভী আহমেদের শূন্যপদ সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব পদে দায়িত্ব পেলে যুগ্ম মহাসচিবের পদও শূন্য হবে। সেক্ষেত্রে দলটির জাতীয় নির্বাহী কমিটির প্রচার সম্পাদক সুলতান সালাহউদ্দিন টুকুর যুগ্ম মহাসচিব হিসেবে পদোন্নতি ঘটতে পারে বলে বিএনপি সূত্র জানিয়েছে।
জাতীয় কাউন্সিল
দলের দীর্ঘদিনের জাতীয় কাউন্সিল আয়োজন নিয়েও বিএনপির ভেতরে আলোচনা চলছে। দলীয় সূত্র মতে, চলতি বছরের শেষ দিকে অথবা আগামী বছরের শুরুর দিকে জাতীয় কাউন্সিল আয়োজনের সম্ভাবনার কথা জানিয়েছে ক্ষমতাসীন দলটি। স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে কাউন্সিল আয়োজনের সময় নির্ধারণ করা হতে পারে বলেও সূত্র জানিয়েছে।
বিএনপির গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, দলটির সাংগঠনিক কাঠামো তৃণমূল থেকে জাতীয় পর্যায় পর্যন্ত ১৩টি স্তরে বিস্তৃত। ইউনিয়ন ও পৌরসভা বা সিটি করপোরেশনের ওয়ার্ড পর্যায় থেকে শুরু করে উপজেলা, থানা, পৌরসভা, মহানগর, জেলা, জাতীয় কাউন্সিল, জাতীয় স্থায়ী কমিটি, জাতীয় নির্বাহী কমিটি, সংসদীয় বোর্ড, সংসদীয় দল এবং প্রবাসী সাংগঠনিক কাঠামো পর্যন্ত এ ব্যবস্থা বিস্তৃত।
এই কাঠামোর নবম স্তরে রয়েছে জাতীয় স্থায়ী কমিটি। এটি বিএনপির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ও তদারকি সংস্থা হিসেবে দায়িত্ব পালন করে। গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, বিএনপির চেয়ারম্যান, সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান ও মহাসচিব পদাধিকারবলে জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য। চেয়ারম্যান এ কমিটির নেতৃত্ব দেন এবং সভা আহ্বান করেন। জাতীয় স্থায়ী কমিটি দলের মৌলিক নীতি ও কর্মসূচি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করে। চেয়ারম্যান ছাড়া দলের কর্মকর্তা ও সদস্যদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রেও কমিটির চূড়ান্ত কর্তৃত্ব রয়েছে। পাশাপাশি দলের গঠনতন্ত্র, বিধি ও প্রবিধানের ব্যাখ্যা দেওয়ার ক্ষমতাও এ কমিটির রয়েছে।
এ ছাড়া দলের গুরুত্বপূর্ণ প্রকাশনা অনুমোদন, ওয়ার্ড থেকে জাতীয় পর্যায় পর্যন্ত সাংগঠনিক কাঠামোর তদারকি এবং প্রয়োজন অনুযায়ী কোনো কমিটি স্থগিত, বিলুপ্ত বা পুনর্গঠনের নির্দেশ দেওয়ার ক্ষমতাও জাতীয় স্থায়ী কমিটির হাতে রয়েছে।