১৩ আগস্ট ২০২৬, ১৪:৩৩

চেয়ারম্যান, মহাসচিব, ‘মাননীয় মন্ত্রী’ থেকে ‘মহামান্য’—মির্জা ফখরুলের বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবন

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর  © সংগৃহীত

ঠাকুরগাঁওয়ের পৌর চেয়ারম্যান থেকে সংসদ সদস্য, বিএনপির মহাসচিব, মন্ত্রণালয় থেকে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে অধিষ্ঠিত হওয়া—মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলায় তিনি যেমন মাঠের রাজনীতিতে নেতৃত্ব দিয়েছেন, তেমনি বিরোধী দলের আন্দোলন থেকে শুরু করে রাষ্ট্র পরিচালনার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বও সামলেছেন। ছাত্ররাজনীতি, শিক্ষকতা ও সরকারি চাকরি পেরিয়ে জাতীয় রাজনীতির শীর্ষে উঠে আসা এই নেতার বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবনের প্রতিটি অধ্যায়ই নানা ঘটনা ও পরিবর্তনের সাক্ষী।

ছাত্রজীবন থেকেই মির্জা ফখরুল রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন। ষাটের দশকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় তিনি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন।

মির্জা ফখরুল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি বিষয়ে পড়াশোনা করেন এবং স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় তিনি ছাত্র ইউনিয়নের এসএম হল শাখার সাধারণ সম্পাদক এবং পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি হন। ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের সময় তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র ইউনিয়নের নেতৃত্বে ছিলেন। ওই সময় রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের কারণে তাঁকে গ্রেপ্তারও করা হয়েছিল।

শিক্ষাজীবন শেষ করে ১৯৭২ সালে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ঢাকা কলেজে অর্থনীতির প্রভাষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। পরে তিনি বিভিন্ন সরকারি কলেজে শিক্ষকতা করেন।

সরকারি চাকরিতে থাকাকালে ১৯৭৯ সালের দিকে তৎকালীন উপপ্রধানমন্ত্রী এস. এ. বারীর একান্ত সচিব হিসেবেও কাজ করেন তিনি। 

১৯৮৬ সালে সরকারি চাকরি থেকে পদত্যাগ করে মির্জা ফখরুল সক্রিয় রাজনীতিতে যোগ দেন। এর দুই বছর পর, ১৯৮৮ সালে তিনি স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ঠাকুরগাঁও পৌরসভা নির্বাচনে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন।

১৯৯০-এর দশকের শুরুতে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের সময় তিনি বিএনপিতে যোগ দেন। ১৯৯২ সালে তাঁকে ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপির সভাপতি করা হয়। এরপর ধীরে ধীরে তিনি জাতীয় পর্যায়ে বিএনপির নেতৃত্বে উঠে আসেন।

বিএনপির রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করতে করতে মির্জা ফখরুল দলটির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে উঠে আসেন। ২০০৯ সালের ৮ ডিসেম্বর বিএনপির পঞ্চম জাতীয় কাউন্সিলে তাঁকে সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিবের দায়িত্ব দেওয়া হয়। এর আগে ও পরে তিনি জাতীয়তাবাদী কৃষক দলের নেতৃত্বেও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। 

মির্জা ফখরুল প্রথমবার জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে ঠাকুরগাঁও-১ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। ২০০১ সালের অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি ওই আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।

২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের সময় তিনি কৃষি মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী এবং বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

২০০৮ সালের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও তিনি ঠাকুরগাঁও-১ আসন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। পরবর্তী সময়ে ২০১৮ সালের নির্বাচনে বগুড়া-৬ আসন থেকে নির্বাচিত হলেও তিনি সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নেননি।

২০১১ সালের ২০ মার্চ বিএনপির তৎকালীন মহাসচিব খন্দকার দেলওয়ার হোসেনের মৃত্যুর পর মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব পান। প্রায় পাঁচ বছর তিনি এই দায়িত্ব পালন করেন।

এই সময় বিএনপির রাজনৈতিক কর্মসূচি, আন্দোলন এবং দলীয় বক্তব্যে তিনি অন্যতম প্রধান মুখ হয়ে ওঠেন। বিশেষ করে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন বিএনপির রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

২০১৬ সালের ৩০ মার্চ বিএনপির মহাসচিব হিসেবে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এরপর থেকে তিনি দলটির শীর্ষ সাংগঠনিক দায়িত্বে রয়েছেন।

বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার কারাবাস ও অসুস্থতার সময় এবং দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের লন্ডন অবস্থানের সময়ে দেশে থেকে বিএনপির সাংগঠনিক ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে মির্জা ফখরুল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচনের পর মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর নতুন সরকারের মন্ত্রিসভায় স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। একই সঙ্গে তিনি বিএনপির মহাসচিব হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন।

বিএনপির পক্ষে বিভিন্ন রাজনৈতিক আন্দোলনের সময় মির্জা ফখরুল একাধিকবার গ্রেপ্তার ও কারাবরণের মুখোমুখি হয়েছেন। ২০২২ সালের ডিসেম্বরেও তাঁকে আটক করা হয়েছিল। ২০২৩ সালের অক্টোবরেও তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁর রাজনৈতিক জীবনের একটি বড় অংশ বিরোধী দলের কর্মসূচি ও সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত। 

রাজনৈতিক জীবনে অন্তত সাড়ে ৪শ দিন করা বরণ করেছেন তিনি।

ব্যক্তিগত জীবনে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর রাহাত আরা বেগমকে বিয়ে করেছেন। এই দম্পতির দুই মেয়ে—মির্জা শামারুহ ও মির্জা সাফারুহ।