০২ আগস্ট ২০২৬, ১৮:৩৭

যত দিন জামায়াত থাকবে, তত দিন আওয়ামী লীগ থাকবে: ফরহাদ মজহার

চিন্তক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক ফরহাদ মজহার  © সংগৃহীত

বাংলাদেশের রাজনীতিতে যতদিন জামায়াতে ইসলামীর রাজনৈতিক তৎপরতা বহাল থাকবে, ততদিন আওয়ামী লীগের অস্তিত্বও টিকে থাকবে বলে মন্তব্য করেছেন বিশিষ্ট কবি, চিন্তক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক ফরহাদ মজহার। জামায়াতে ইসলামীর রাজনীতি করার তীব্র বিরোধিতা করে তিনি বলেছেন, বিদ্যমান ১৯৭২ সালের সংবিধান মূলত জনগণের সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত একটি ঔপনিবেশিক অস্ত্র, যা সম্পূর্ণ বাতিল করে নতুন ‘গঠনতন্ত্র’ প্রণয়ন ও গণসার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠাই নতুন বাংলাদেশ গঠনের একমাত্র পথ।

রবিবার (২ আগস্ট) রাজধানীর ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি (ডিআরইউ) মিলনায়তনে আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টি আয়োজিত ৩৬ জুলাইয়ের অবদান বিতর্ক ও ব্যর্থতার দায় পর্যালোচনা শীর্ষক সংলাপে এসব কথা বলেন তিনি।

বক্তব্যের শুরুতে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের ঐতিহাসিক গুরুত্ব তুলে ধরে ফরহাদ মজহার বলেন, ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ প্রথম একটি রাজনৈতিক জনগোষ্ঠী হিসেবে বিশ্ব ইতিহাসে আত্মপ্রকাশ করেছে। এই জাতীয় অর্জনের সঙ্গে কোনো আপস বা দর-কষাকষি করা যাবে না, এমনকি জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গেও নয়। তিনি আরও বলেন, ‘আমি বারবার একটা কথা বলেছি, যদিও তারা অনেকে রাগ করেছেন—যত দিন জামায়াতে ইসলামী থাকবে, তত দিন বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ থাকবে। আমি জামায়াতে ইসলামী নাম নিয়ে রাজনীতি করার ঘোরবিরোধী। কারণ, ইসলাম আমাদের ধর্ম। তার নীতিগত ও নৈতিক দিক একটি নতুন রাষ্ট্র ও নতুন সমাজ গঠনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।’

১৯৭২ সালের সংবিধান সম্পূর্ণ বাতিলের দাবি পুনর্ব্যক্ত করে তিনি বলেন, এ বিষয়ে কোনো আপসের সুযোগ নেই। সংবিধানের সপ্তম অনুচ্ছেদের সমালোচনা করে তিনি বলেন, সেখানে এক বাক্যে জনগণকে রাষ্ট্রক্ষমতার মালিক বলা হলেও ঠিক পরের বাক্যে সংবিধানকে জনগণের ওপরে স্থান দিয়ে তাদের সার্বভৌমত্ব নাকচ করা হয়েছে।

ঔপনিবেশিক শাসনের ইতিহাস টেনে তিনি বলেন, তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানে এলএফওর (লিগ্যাল ফ্রেমওয়ার্ক অর্ডার) অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে বিজয়ীরা গণপরিষদ দাবি করে এই সংবিধান চাপিয়ে দিয়েছিল। সংবিধান ও গঠনতন্ত্র-এর পার্থক্য তুলে ধরে ফরহাদ মজহার বলেন, ‘জনগণ সংবিধানের ঊর্ধ্বে, অধীন নয়। জনগণ চাইলে যখন খুশি নতুন গঠনতন্ত্র প্রণয়ন করতে পারে। কনস্টিটিউশন বা সংবিধান শব্দটিকে কলোনিয়াল শাসকেরা ব্যবহার করত লুটেরা ও মাফিয়া শ্রেণিকে দিয়ে গণবিরোধী শাসন চালাতে। অন্যদিকে গঠনতন্ত্র হলো জনগণ নিজেরা একত্র হয়ে সম্পদের মালিকানা, ব্যাংক, বিনিয়োগ, বৈদেশিক বাণিজ্য, চিকিৎসা ও শিক্ষাব্যবস্থা কীভাবে পরিচালিত হবে তা স্থির করা।’

৫ আগস্টের গণ–অভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্রক্ষমতা হস্তান্তরের প্রক্রিয়ায় গুরুতর গলদ ছিল উল্লেখ করে ফরহাদ মজহার অভিযোগ করেন, জনগণের আকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে একটি পূর্ণ ক্ষমতাসম্পন্ন অন্তর্বর্তী সরকার গঠন করতে দেওয়া হয়নি। তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান, রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন (চুপ্পু) এবং বিএনপি—এই তিন শক্তি মিলে তা হতে দেয়নি, যার প্রমাণ সম্প্রতি প্রকাশিত রাষ্ট্রপতি চুপ্পুর সাক্ষাৎকারেই মিলেছে। ৮ আগস্ট পুরোনো সংবিধান ও রাষ্ট্রপতিকে বহাল রেখে গঠিত সরকার মূলত একটি ‘সাংবিধানিক প্রতিবিপ্লব’।

গণমাধ্যমের সমালোচনা করে তিনি বলেন, হাসিনাহীন কিন্তু হাসিনা-ব্যবস্থা টিকিয়ে রেখে গঠিত এই সরকারকে সাংবাদিকেরা ভুলভাবে ‘অন্তর্বর্তী সরকার’ বলেছেন। বাস্তবে এটি ছিল পুরোনো সংবিধানের অধীন প্রেসিডেন্ট দ্বারা পরিচালিত একটি সেনাসমর্থিত উপদেষ্টা সরকার, যা দিয়ে মূল সংবিধান বদলানো অসম্ভব।

শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশি নির্যাতন না চালানোর জন্য বিএনপি ও অন্যান্য রাজনৈতিক দলকে সতর্ক করে তিনি বলেন, তারেক রহমান যেন তরুণদের সঙ্গে বেইমানি না করেন। বেগম খালেদা জিয়াও কখনো তরুণদের সঙ্গে বেইমানি করতে চাননি বলে তিনি মন্তব্য করেন।


ধর্মের নামে তাণ্ডব ও মাজার ভাঙচুরের সমালোচনা করে তিনি বলেন, ‘যারা মাজার ভাঙছেন, ধর্মকে মানুষকে ভয় দেখানো বা অত্যাচার করার অস্ত্র বানাচ্ছেন, তাঁদের আমরা চিনি। গাজাকে ধূলিসাৎ করে রিয়েল এস্টেট বানানোর মতো এটাও একধরনের আগ্রাসন। পেট্রোডলারের কোনো নির্দিষ্ট ব্যাখ্যা চাপিয়ে দিয়ে কেউ দাবি করতে পারেন না যে তাঁরাই ইসলামের একমাত্র কর্তৃত্বের হকদার। ইসলামে কারও এই ধরনের একক কর্তৃত্ব দাবি করার সুযোগ নেই।’

গণ–অভ্যুত্থানের অর্জনকে ‘ব্যর্থতা’ বলার তীব্র বিরোধিতা করে তিনি বলেন, ২০ বছর পর এখন যেখানে কথা বলা যাচ্ছে এবং শেখ হাসিনা পালিয়ে গেছে—তা কখনো ব্যর্থতা হতে পারে না। তরুণদের দেখানো পথ থেকে পিছিয়ে আসার সুযোগ নেই।


সংলাপে সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা শারমিন এস মুরশিদ বলেন, ১৯৭১ ও ২০২৪—উভয় চেতনাকেই ধারণ করে সামনে এগোতে হবে। একটি সরকারের পতন ঘটানো আর রাষ্ট্র পুনর্গঠন সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। দুর্নীতি, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও পুরোনো রাষ্ট্রব্যবস্থা পরিবর্তন না হলে কোনো সরকারই সফল হতে পারবে না।

এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই সংলাপে আরও বক্তব্য দেন সাবেক উপদেষ্টা ও এনসিপির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়া, আইনজীবী আবু হেনা রাজ্জাকী, এবি পার্টির সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান ফুয়াদ, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জুবায়ের আহমেদ ভূঁইয়া, এ বি এম খালিদ হাসান এবং ত্রাণ ও পুনর্বাসন সম্পাদক সুলতানা রাজিয়া প্রমুখ।