২৫ জুলাই ২০২৬, ১৯:২৫

খোন্দকার দেলোয়ার হোসেন: বিএনপির ক্রান্তিকালের মহাসচিব

খোন্দকার দেলোয়ার হোসেন  © টিডিসি সম্পাদিত

খোন্দকার দেলোয়ার হোসেনকে বিএনপির ইতিহাসে শুধু একজন মহাসচিব হিসেবে দেখলে তাঁর ভূমিকার পূর্ণ মূল্যায়ন হয় না। ওয়ান ইলেভেন বা ১/১১’র রাজনৈতিক সংকট, দলের শীর্ষ নেতৃত্বের কারাবরণ, বিএনপিকে ভাঙার চেষ্টা, সংস্কারপন্থী বিতর্ক এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকারের চাপের মধ্যে তিনি কার্যত দলের অভিভাবকের ভূমিকায় ছিলেন। তাঁর নেতৃত্বেই বিএনপি সাংগঠনিকভাবে টিকে থাকে এবং ঐক্যবদ্ধ থাকার বার্তা পায়।

বিএনপির ইতিহাসে এমন অনেক নেতা আছেন যারা দলের নেতাকর্মী ও জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্যতার পাশাপাশি আলোচিত হয়েছেন। কিন্তু সংকটের সময় দলকে ধরে রাখার জন্য যাঁদের নাম উচ্চারিত হয়, তাঁদের মধ্যে অন্যতম হচ্ছেন খোন্দকার দেলোয়ার হোসেন। ওয়ান-ইলেভেন-পরবর্তী সময়ের রাজনৈতিক ইতিহাস লেখা হলে তাঁর ভূমিকা আলাদা অধ্যায় হিসেবেই বিবেচিত হবে।

খোন্দকার দেলোয়ার হোসেনকে বিএনপির ইতিহাসে ‘ক্রান্তিকালের মহাসচিব’ বলা হয়। দল যখন নেতৃত্বশূন্য হওয়ার আশঙ্কায়, তখন সংগঠনের পুরোভার একাই কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন খোন্দকার দেলোয়ার।

রাজনৈতিক পথচলা
খোন্দকার দেলোয়ার হোসেনের রাজনৈতিক পরিচয়ের প্রাথমিক ভিত্তি নির্মিত হয়েছিল মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর সান্নিধ্যে। পরবর্তীতে তিনি বিএনপির অন্যতম শীর্ষ নেতা হিসেবে পরিচিতি পেলেও, তাঁর রাজনৈতিক শেকড় ছিল ভাসানীর গণমুখী ও আন্দোলনধর্মী রাজনীতির সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত। তার রাজনৈতিক জীবনের শুরুতে মজলুম মওলানার আদর্শে অনুপ্রাণিত ছিলেন এবং তাঁর ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। 

ভাসানীর আদর্শে রাজনৈতিক হাতেখড়ি: ছাত্রজীবন থেকেই তিনি মওলানা ভাসানীর কৃষক-শ্রমিকমুখী, শোষণবিরোধী ও গণমানুষের রাজনীতির প্রতি আকৃষ্ট হন। ভাসানীর নেতৃত্বাধীন রাজনীতিতে সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে তাঁর রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তি তৈরি হয়।

গণআন্দোলনের কর্মী: ভাসানীর নেতৃত্বে সংগঠিত বিভিন্ন গণআন্দোলন, বিশেষ করে স্বৈরাচারবিরোধী ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার দাবির আন্দোলনে তিনি সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। এতে তিনি একজন মাঠকেন্দ্রিক সংগঠক হিসেবে পরিচিতি পান।

সাদাসিধে জীবন ও জনমুখী রাজনীতি: খোন্দকার দেলোয়ার হোসেনের ব্যক্তিগত জীবনযাপন ও রাজনৈতিক আচরণে ভাসানীর সরলতা, জনগণের সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ এবং তৃণমূলভিত্তিক রাজনীতির প্রভাব লক্ষ করা যেত বলে তাঁর সমসাময়িকরা উল্লেখ করেছেন।

আদর্শগত ধারাবাহিকতা: পরবর্তীকালে তিনি ভিন্ন রাজনৈতিক ধারায় যুক্ত হয়ে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের গুরুত্বপূর্ণ নেতা ও মহাসচিব হলেও, তাঁর রাজনৈতিক জীবনের সূচনা এবং সংগঠক হিসেবে গড়ে ওঠার পেছনে মওলানা ভাসানীর ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

রাজনৈতিক পরিপক্বতার ভিত্তি: অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষকের মতে, ভাসানীর কাছ থেকে তিনি গণসংযোগ, জনসভায় বক্তব্য দেওয়ার কৌশল এবং আন্দোলনভিত্তিক রাজনীতির বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন করেন, যা পরবর্তী সময়ে তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে কাজে লাগে।

খোন্দকার দেলোয়ার হোসেন ১৯৭৯ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলে (বিএনপি) যোগ দেন। এর আগে, ১৯৭৮ সালে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান যখন 'জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক দল' (জাগদল) গঠন করেন, তখন তিনি সেই দলে যোগ দিয়েছিলেন এবং দলের মানিকগঞ্জ জেলা শাখার আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব পান। পরবর্তীতে ১৯৭৯ সালে বিএনপি প্রতিষ্ঠার পর তিনি দলের মানিকগঞ্জ জেলা শাখার সভাপতি নির্বাচিত হন। 

এর আগে, ১৯৫৭ সালে মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টিতে (ন্যাপ) যোগদানের মাধ্যমে সক্রিয় রাজনীতিতে প্রবেশ করেন। ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের একজন সংগঠক হিসেবে মানিকগঞ্জে বিপ্লবী কমান্ড কাউন্সিলের সদস্য নিযুক্ত হন এবং সরাসরি যুদ্ধ অংশ নেন। ১৯৭৮ সালে জিয়াউর রহমান গঠিত জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক দলে (জাগদল) যোগ দেন। ১৯৭৯ সালে বিএনপিতে যোগ দেন এবং মানিকগঞ্জ জেলা শাখার সভাপতি নির্বাচিত হন। ১৯৮৫ সালে বিএনপির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য মনোনীত হন। ২০০৭ সালে ওয়ান-ইলেভেন (১/১১) পরবর্তী সংকটের সময় দলের ষষ্ঠ মহাসচিবের দায়িত্ব লাভ করেন এবং আমৃত্যু এই পদে বহাল ছিলেন।

বিএনপির মহাসচিব হওয়ার প্রেক্ষাপট
খোন্দকার দেলোয়ার হোসেনের বিএনপির মহাসচিব হওয়ার প্রেক্ষাপট বুঝতে হলে ২০০৭ সালের ১/১১-এর রাজনৈতিক সংকট এবং সে সময় বিএনপির অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি বিবেচনা করতে হবে।

২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি দেশে জরুরি অবস্থা জারি হয় এবং সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার দায়িত্ব নেয়। এরপর বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বের বিরুদ্ধে ব্যাপক অভিযান শুরু হয়। চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াসহ অনেক কেন্দ্রীয় নেতা গ্রেপ্তার হন।

সে সময় বিএনপির তৎকালীন মহাসচিব আবদুল মান্নান ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে যে, তিনি দলের আনুষ্ঠানিক অবস্থানের বাইরে গিয়ে সেনাসমর্থিত সরকারের সঙ্গে সমঝোতার চেষ্টা করছেন এবং তথাকথিত 'সংস্কারপন্থী' অবস্থানের প্রতি সহানুভূতিশীল। এতে দলের ভেতরে বিভক্তি তৈরি হয়।

খালেদা জিয়ার সিদ্ধান্ত
২০০৭ সালের ৩ সেপ্টেম্বর কারাবন্দি হওয়ার ঠিক আগে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া আবদুল মান্নান ভূঁইয়াকে মহাসচিব পদ থেকে বহিষ্কার করেন এবং দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য বর্ষীয়ান নেতা খোন্দকার দেলোয়ার হোসেনকে নতুন মহাসচিব নিয়োগ দেন। এই সিদ্ধান্তের মূল উদ্দেশ্য ছিল দলকে ঐক্যবদ্ধ রাখা এবং নেতৃত্বে আস্থাভাজন একজন নেতাকে দায়িত্ব দেওয়া।

সংকটকালে নেতৃত্ব
মহাসচিব হওয়ার পর খোন্দকার দেলোয়ার হোসেন বিএনপির সাংগঠনিক কার্যক্রম সচল রাখেন। দলের অধিকাংশ শীর্ষ নেতা কারাগারে বা মামলায় জড়িয়ে থাকলেও তিনি প্রকাশ্যে দলের অবস্থান তুলে ধরেন, নেতাকর্মীদের সংগঠিত রাখেন এবং দল ভাঙার বিভিন্ন প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে অবস্থান নেন। বিএনপির ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি ১/১১-এর সংকটকালে দলের ঐক্য ও অখণ্ডতা রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

২০০৯ সালের ৮ ডিসেম্বর বিএনপির পঞ্চম জাতীয় কাউন্সিলে খোন্দকার দেলোয়ার হোসেন পুনরায় দলের মহাসচিব নির্বাচিত হন। অর্থাৎ, সংকটকালে পাওয়া দায়িত্ব পরে দলীয় কাউন্সিলের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক বৈধতা লাভ করে।

কেন দেলোয়ারকে বেছে নেওয়া হয়েছিল
খোন্দকার দেলোয়ার হোসেনকে বিএনপির মহাসচিব হিসেবে বেছে নেওয়ার পেছনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক কারণ ছিল।

প্রথমত, তৎকালীন চেয়ারপারসন  খালেদা জিয়ার প্রতি তাঁর অবিচল আনুগত্য। ২০০৭ সালের ১/১১-পরবর্তী সংকটে যখন বিএনপির একটি অংশ তথাকথিত 'সংস্কারপন্থী' অবস্থান নেয় এবং তৎকালীন মহাসচিব আবদুল মান্নান ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে দল ভাঙার অভিযোগ ওঠে, তখন খোন্দকার দেলোয়ার খালেদা জিয়ার নেতৃত্বের প্রতি প্রকাশ্যে অনুগত থাকেন। এ কারণে খালেদা জিয়া তাঁকে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য নেতা হিসেবে বিবেচনা করেন।

দ্বিতীয়ত, খোন্দকার দেলোয়ার হোসেনের দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা।

দেলোয়ার হোসেন ভাষা আন্দোলনের কর্মী, ন্যাপের রাজনীতি থেকে উঠে আসা একজন প্রবীণ রাজনীতিক ছিলেন। তিনি ১৯৭৮ সালে জিয়াউর রহমানের আহ্বানে বিএনপিতে যোগ দেন, পাঁচবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন, জাতীয় সংসদে প্রধান বা চিফ হুইপের দায়িত্ব পালন করেন এবং ১৯৮৫ সাল থেকেই বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ছিলেন। ফলে দলের সাংগঠনিক কাঠামো ও নেতৃত্ব সম্পর্কে তাঁর গভীর অভিজ্ঞতা ছিল।

তৃতীয়ত, সংকট মোকাবিলার সক্ষমতা।

সেই সময় বিএনপির অনেক শীর্ষ নেতা কারাগারে বা মামলায় জড়িয়ে পড়েছিলেন। দলকে ঐক্যবদ্ধ রাখা, নেতাকর্মীদের মনোবল ধরে রাখা এবং দলের মূলধারার অবস্থান স্পষ্টভাবে তুলে ধরতে এমন একজন নেতার প্রয়োজন ছিল, যিনি আপসহীন ও গ্রহণযোগ্য। দেলোয়ার সেই ভূমিকা পালন করেন এবং প্রকাশ্যে বলেন, দলের নেতৃত্ব নির্ধারণের অধিকার বিএনপির নিজস্ব, বাইরের কোনো প্রতিষ্ঠানের নয়।

চতুর্থত, ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতা ও জ্যেষ্ঠতা।

দলের ভেতরে খোন্দকার দেলোয়ার হোসেন একজন প্রবীণ, অভিজ্ঞ এবং তুলনামূলকভাবে কম বিতর্কিত সাংগঠনিক নেতা হিসেবে পরিচিত ছিলেন। ফলে সংকটকালে তাঁকে সামনে আনলে দলের বিভিন্ন স্তরে তা গ্রহণযোগ্য হবে—এমন ধারণা শীর্ষ নেতৃত্বের মধ্যে ছিল। পরবর্তীতে ২০০৯ সালের জাতীয় কাউন্সিলেও তাঁকেই মহাসচিব হিসেবে বহাল রাখা হয়, যা তাঁর প্রতি দলের আস্থার প্রতিফলন হিসেবে দেখা হয়।

খোন্দকার দেলোয়ার হোসেনকে বিএনপির মহাসচিব করা হয়েছিল তাঁর পরীক্ষিত আনুগত্য, দীর্ঘ সাংগঠনিক অভিজ্ঞতা, সংকট মোকাবিলার সক্ষমতা এবং ১/১১-এর রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে দলকে ঐক্যবদ্ধ রাখার সক্ষমতার কারণে। বিএনপির নিজস্ব মূল্যায়নেও তিনি সেই সময়ের "বিশ্বস্ত সংকটকালীন নেতা" হিসেবে বিবেচিত হন। 

ওয়ান-ইলেভেন: সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় ও বিএনপির নেতৃত্বের সংকট
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি (১/১১) ছিল একটি যুগান্তকারী মোড়। এদিন জরুরি অবস্থা জারি, নির্ধারিত জাতীয় নির্বাচন স্থগিত এবং সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আবির্ভাব শুধু ক্ষমতার পালাবদলই ঘটায়নি; এটি দেশের দুই প্রধান রাজনৈতিক দল—বিএনপি ও আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব, সংগঠন ও ভবিষ্যৎ রাজনীতিকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। 

২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন নিয়ে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে তীব্র সংঘাত সৃষ্টি হয়। প্রধান উপদেষ্টা নিয়োগ, ভোটার তালিকা এবং নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে বিরোধ এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে রাজনৈতিক সহিংসতা দেশকে অচলাবস্থার দিকে নিয়ে যায়। এই পরিস্থিতিতে ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি রাষ্ট্রপতি প্রফেসর ইয়াজউদ্দিন আহমদ জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেন এবং পরে ড. ফখরুদ্দীন আহমদের নেতৃত্বে সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার দায়িত্ব নেয়। 

১/১১-এর পর বিএনপির ওপর তৎকালীন সেনাসমর্থিত সরকারের পক্ষ থেকে ব্যাপক চাপ সৃষ্টি হয়। ফলে সদ্য প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করা বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া গ্রেপ্তার হন। গ্রেপ্তার ও নির্যাতনের শিকার হন সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব তারেক রহমান ও এমনকি রাজনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা না থাকা সত্ত্বেও খালেদা জিয়ার ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকোও দুর্নীতির মামলায় গ্রেপ্তার হন। স্থায়ী কমিটি ও কেন্দ্রীয় নেতাদের অনেকে গ্রেপ্তার, আত্মগোপন বা মামলায় জড়িয়ে পড়েন। ফলে বিএনপি কার্যত নেতৃত্বশূন্য অবস্থায় পড়ে। 

'মাইনাস টু' ফর্মুলা
সে সময় সবচেয়ে আলোচিত বিষয় ছিল তথাকথিত ‘মাইনাস টু ফর্মুলা’। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ভাষ্য অনুযায়ী, এই ধারণার উদ্দেশ্য ছিল দেশের দুই প্রধান নেত্রী—খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনাকে সক্রিয় রাজনীতি থেকে সরিয়ে নতুন রাজনৈতিক নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা। এই অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের রাজনৈতিক আলোচনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। 

বিএনপির অভ্যন্তরে বিভক্তি
দলের এই ক্রান্তিলগ্নে বিএনপির ভেতর দুটি ধারা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। যার একটি অংশ ‘সংস্কারপন্থী’ অংশ যারা দলের কাঠামো পরিবর্তনের পক্ষে অবস্থান নেয়। নতুন নেতৃত্বের প্রশ্ন তোলে। সরকারের সঙ্গে সমঝোতার পথ খুঁজছিল—এমন অভিযোগ ওঠে। আরেকটি অংশ ‘মূলধারা’ যারা  (খালেদা জিয়া-অনুগত অংশ) খালেদা জিয়ার নেতৃত্ব অক্ষুন্ন রাখার পক্ষে থাকে। দল ভাঙার যেকোনো প্রচেষ্টার বিরোধিতা করে। এই বিভাজন ছিল বিএনপির ইতিহাসের অন্যতম বড় অভ্যন্তরীণ সংকট। 

এই সংকটের মধ্যেই বিএনপির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত আসে। কারাবন্দি হওয়ার ঠিক আগে খালেদা জিয়া তৎকালীন মহাসচিব আবদুল মান্নান ভূঁইয়াকে দল থেকে বহিষ্কার করে খোন্দকার দেলোয়ার হোসেনকে মহাসচিব নিয়োগ দেন। বিএনপির বক্তব্য অনুযায়ী, দেলোয়ার ছিলেন সংকটকালে সবচেয়ে বিশ্বস্ত ও পরীক্ষিত নেতা। দলের বিভিন্ন পর্যায়ে তিনি গ্রহণযোগ্য ছিলেন। তাঁর বিরুদ্ধে বড় ধরনের দলীয় বিরোধিতা ছিল না। 

আপসহীন অবস্থান
দলের মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পাওয়ার পরপরই খোন্দকার দেলোয়ার হোসেন প্রকাশ্যে ঘোষণা দেন যে, বিএনপির নেতৃত্ব নির্ধারণ করবে বিএনপিই; বাইরের কোনো শক্তি নয়। এ অবস্থান তাঁকে সংকটকালের মুখপাত্রে পরিণত করে। ‘বিএনপি মানেই খালেদা জিয়ার নেতৃত্ব’—এই অবস্থান প্রতিষ্ঠায় তাঁর দৃঢ়তা ছিল পাহাড়সমান।  

মহাসচিব হওয়ার পর দেলোয়ার প্রতিদিন সংবাদ সম্মেলন করে দলের অবস্থান তুলে ধরেন। গ্রেপ্তার হওয়া নেতাদের বিষয়ে বক্তব্য দেন। তৃণমূলের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখেন। সংস্কারপন্থীদের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করেন। বিএনপির সাংগঠনিক ঐক্য ধরে রাখার চেষ্টা করেন। 

অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষকের মতে, ১/১১-পর্বে খোন্দকার দেলোয়ার ছিলেন বিএনপির "ক্রাইসিস ম্যানেজার" বা সংকটকালীন সাংগঠনিক মুখ।

দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব
১/১১ বিএনপিকে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়—ব্যক্তিনির্ভর নেতৃত্বের সীমাবদ্ধতা সামনে আসে। বিকল্প নেতৃত্ব তৈরির প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট হয়। সংগঠনকে বিকেন্দ্রীকরণের প্রশ্ন গুরুত্ব পায়। দলীয় ঐক্য রক্ষাই সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ হয়ে ওঠে। 

রাজনৈতিক মূল্যায়ন
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ১/১১-কে বিভিন্ন পক্ষ ভিন্নভাবে মূল্যায়ন করে। কেউ এটিকে রাজনৈতিক অচলাবস্থা নিরসনের একটি ব্যতিক্রমী পর্ব হিসেবে দেখেন, আবার কেউ এটিকে গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতায় সামরিক-সমর্থিত হস্তক্ষেপ এবং রাজনৈতিক প্রকৌশলের প্রচেষ্টা হিসেবে সমালোচনা করেন। তবে প্রায় সব বিশ্লেষণেই একমত যে, এই সময়টি বিএনপির ইতিহাসে সবচেয়ে কঠিন নেতৃত্বসংকটের অধ্যায়গুলোর একটি ছিল এবং সেই সংকট মোকাবিলায় খোন্দকার দেলোয়ার হোসেনের উত্থান একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ঘটনা।

বিএনপির বর্তমান মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ১/১১-কে ‘দেশের এক চরম রাজনৈতিক সংকটকাল’ হিসেবে বর্ণনা করে খোন্দকার দেলোয়ার হোসেনকে সেই সংকটে ‘দলের বিরুদ্ধে চক্রান্ত রুখে দেওয়া’ নেতার মর্যাদা দিয়েছেন।

তিনি বলেন, ‘১/১১-তে দেশের এক চরম রাজনৈতিক সংকটকালে বিএনপি মহাসচিবের দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে খোন্দকার দেলোয়ার হোসেন দলের বিরুদ্ধে চক্রান্ত রুখে দিতে যোগ্য নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। 
মির্জা ফখরুল বলেন, ‘দৃঢ়তা, অটুট মনোবল এবং ব্যক্তিত্বে তিনি ছিলেন অনন্য উচ্চতায় একজন ব্যতিক্রমী রাজনীতিবিদ। ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে স্বাধিকার, স্বাধীনতা, গণতন্ত্র ও জনগণের মুক্তির সকল সংগ্রামে তিনি রেখেছেন অসামান্য অবদান।

বিএনপির মহাসচিব বলেন, স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের জাতীয়তাবাদী দর্শনকে বুকে ধারণ করে দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে স্বৈরাচারের কবল থেকে গণতন্ত্রে উত্তরণের প্রত্যেকটি আন্দোলন-সংগ্রামে অ্যাডভোকেট খোন্দকার দেলোয়ার হোসেনের অবদান দল ও দেশবাসী চিরদিন শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করবে।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় খোন্দকার দেলোয়ার হোসেন সম্পর্কে মূল্যায়ন তুলে ধরে বলেন, ‘খোন্দকার দেলোয়ার হোসেনের জীবন খুব ছোট না। খুব অল্প সময়ে তিনি সবার ওপরে উঠতে পেরেছিলেন। বাকি সময় তিনি নানাবিধ ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে চাপা পড়েছিলেন। তিনি তাঁর অভিজ্ঞতা ও রাজনৈতিক জ্ঞান প্রকাশ করার জন্য যথেষ্ট বাধার সম্মুখীন হয়েছেন। তাঁর অনেক ধৈর্য ও সাহস ছিল।’

গয়েশ্বর চন্দ্র রায় আরও বলেন, অনেকে অনেক কথা বলতে চান। কিন্তু সবসময় সব কথা না বলা ভালো। সত্য কথা বলারও সময় আছে। সত্য কথা বলতে গেলে কখনো কখনো বড় ধরনের ক্ষতি হয়ে যেতে পারে। তিনি (খোন্দকার দেলোয়ার) এমন একজন মানুষ ছিলেন, যিনি দলের জন্য নিজের ব্যক্তিগত স্বার্থকে কখনো প্রাধান্য দেননি। কঠিন সময়েও তিনি দলের প্রতি দায়িত্বশীল ছিলেন এবং ধৈর্যের সঙ্গে সংকট মোকাবিলা করেছেন।

১ ফেব্রুয়ারি ১৯৩৩ সালে জন্মগ্রহণ করা খোন্দকার দেলোয়ার হোসেন ২০১১ সালের ১৬ মার্চ বুধবার সিঙ্গাপুরের মাউন্ট এলিজাবেথ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৭৮ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন। তিনি দীর্ঘদিন কিডনি ও হৃদ্‌রোগ বিভিন্ন শারীরিক জটিলতায় ভুগছিলেন।

তাঁর মৃত্যু উপলক্ষে বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয় ও রাজনৈতিক অঙ্গনে শোকের ছায়া নেমে আসে। বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া, ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা শোক প্রকাশ করেন। নয়াপল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে তাঁর জানাজায় বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ, আইনজীবী ও সর্বস্তরের বিপুলসংখ্যক মানুষ অংশ নেন।