গণহত্যার বিচার না হলে জনতার আদালতে এই সরকারের বিচার হবে: জামায়াত নেতা আযাদ
গণহত্যার বিচার না হলে জনতার আদালতে এই সরকারের বিচার হবে বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ড. এ এইচ এম হামিদুর রহমান আযাদ।
বৃহস্পতিবার (২৩ জুলাই) সকালে জুলাই গণহত্যার সুষ্ঠু তদন্ত ও দ্রুত বিচার দাবিতে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সামনে মানববন্ধনে এসব কথা বলেন তিনি। পরে সাত দফা দাবিতে চিফ প্রসিকিউটর ও আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রেজিস্ট্রারের কাছে স্মারকলিপি দেওয়া হয়।
এ সময় তিনি বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শহীদ ও আহত ব্যক্তিদের আত্মত্যাগের মাধ্যমে জাতি একটি নতুন বাংলাদেশ পেয়েছে। জাতির প্রত্যাশা ছিল, বিপ্লব-পরবর্তী প্রথম কাজ হবে গণহত্যার বিচার, এরপর রাষ্ট্র সংস্কার এবং তারপর নির্বাচন।
তিনি অভিযোগ করেন, গণহত্যার বিচার ও রাষ্ট্র সংস্কার ছাড়াই নির্বাচন হয়েছে। নির্বাচনের মাধ্যমে বিএনপি ক্ষমতায় এসে চিফ প্রসিকিউটর পরিবর্তন করেছে। এরপর থেকে গণহত্যার বিচারপ্রক্রিয়ায় ধীরগতি দেখা যাচ্ছে। তিনি দ্রুত বিচার শেষ করতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।
আমার বাংলাদেশ পার্টির (এবি পার্টি) সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ বলেন, জুলাই-পরবর্তী সময়ে বিএনপি নির্বাচনের বিষয়ে যতটা আগ্রহী ছিল, রাষ্ট্র সংস্কার ও গণহত্যার বিচারে এখন ততটা সক্রিয় নয়।
তিনি বলেন, সরকার যদি নিজেদের জুলাইয়ের শক্তির প্রতিনিধি মনে করে, তাহলে ফৌজদারি অপরাধে জড়িত আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের বিচারের আওতায় আনতে হবে। একই সঙ্গে দল হিসেবে আওয়ামী লীগের বিচারও নিশ্চিত করতে হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
এনসিপির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদিব বলেন, জুলাই আন্দোলনের সময় আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগ ও তাদের সহযোগী সংগঠনের সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকদেরও বিচারের আওতায় আনতে হবে। তিনি বিচারপ্রক্রিয়ায় গড়িমসি না করার আহ্বান জানান এবং দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ উপদেষ্টা নিয়োগের প্রস্তাব দেন।
জুলাই শহীদ মেহেদী হাসান জুনায়েদের বাবা শেখ জামাল হোসেন বলেন, তার ছেলে হত্যা মামলার রায়ে তিনি সন্তুষ্ট নন।
তিনি বলেন, চানখারপুলে ছয়জনকে গুলি করে হত্যার ঘটনায় পুলিশ সদস্য সুজনকে ছয় বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে যাদের মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে, তারা কেউ দেশে নেই। এটি ন্যায়বিচার নয়। তিনি সরকারের কাছে সুষ্ঠু বিচার নিশ্চিত করার দাবি জানান।
মেহেদী হাসানের মা বলেন, সন্তানকে হত্যার দুই বছর চার দিন পার হলেও এখনো বিচার সম্পন্ন হয়নি। এ বিষয়ে তিনি রাষ্ট্রের কাছে জবাব চান।
শহীদ আলিফের বাবা গাজিউর রহমান বলেন, জুলাইয়ের শহীদেরা কোনো মন্ত্রিত্ব বা পদ-পদবীর জন্য আন্দোলন করেননি। তারা রাষ্ট্র সংস্কারের লক্ষ্যে রাজপথে নেমেছিলেন। দুই বছরেও সরকার একটি মামলারও নিষ্পত্তি করতে পারেনি। তার ছেলে হত্যা মামলায় এখনো কোনো আসামি গ্রেপ্তার না হওয়ায় তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
মানববন্ধনে আরও বক্তব্য দেন নেজামে ইসলাম পার্টির সিনিয়র নায়েবে আমীর মাওলানা আব্দুল মাজেদ আতহারী, জাগপার সাধারণ সম্পাদক ইকবাল হোসেন, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টির মহাসচিব নিজামুল হক নাঈম, এলডিপির প্রেসিডিয়াম সদস্য ড. নিয়ামুল বশির এবং বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর ঢাকা মহানগর উত্তরের প্রচার সম্পাদক আতাউর রহমান সরকার।
এ সময় উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সহকারী সেক্রেটারি দেলাওয়ার হোসেন। এছাড়া জুলাই শহীদ পরিবারের সদস্য, জুলাই আন্দোলনে আহত ব্যক্তিরা এবং ১১ দলীয় ঐক্যের নেতাকর্মীরা কর্মসূচিতে অংশ নেন।
মানববন্ধন শেষে জুলাই ২০২৪-এর গণহত্যার সুষ্ঠু তদন্ত ও দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে সাত দফা দাবিতে স্মারকলিপি দেওয়া হয়।
দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে—জুলাই ২০২৪-এর হত্যাকাণ্ডের প্রধান ঘটনাস্থলগুলোর পূর্ণাঙ্গ তদন্ত দ্রুত শেষ করে দায়ীদের বিরুদ্ধে বিচার এগিয়ে নেওয়া, অভিযুক্ত পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর যেসব সদস্য এখনো গ্রেপ্তার হননি এবং দায়িত্বে আছেন, তাদের আইনের আওতায় আনা, দেশের সব জেলায় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগের তদন্ত সম্পন্ন করা, তদন্তে অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার ও সাক্ষীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, গণহত্যা বা মানবতাবিরোধী অপরাধের পক্ষে অপপ্রচারকারীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া, গুম ও গুম-পরবর্তী হত্যাকাণ্ডের অভিযোগের তদন্ত দ্রুত শেষ করে বিচার নিশ্চিত করা এবং গুমসংক্রান্ত সব মামলার তদন্ত দ্রুত সম্পন্ন করে ভুক্তভোগী পরিবার ও সাক্ষীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।