২২ জুলাই ২০২৬, ১১:১৪

গঠনতন্ত্র অনুযায়ী এমপি নজরুলকে কি বহিষ্কার করবে জামায়াত, তার এমপি পদ কি থাকবে?

এমপি গাজী নজরুল ইসলাম ও জামায়াতে ইসলামীর লোগো  © সংগৃহীত

সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য ও জামায়াতে ইসলামীর নেতা গাজী নজরুল ইসলামের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর দলীয় ব্যবস্থা ও তার সংসদ সদস্য পদ নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে, গঠনতন্ত্র অনুযায়ী জামায়াত যদি তাকে দল থেকে বহিষ্কার করে, তাহলে তার এমপি পদ থাকবে কি না।

সোমবার (২০ জুলাই) রাতে গাজী নজরুল ইসলামের সঙ্গে এক নারীর অন্তরঙ্গ মুহূর্তের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এরপর বিষয়টি নিয়ে সামাজিক ও রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা শুরু হয়। তবে ওই নারীকে নিজের দ্বিতীয় স্ত্রী দাবি করেছেন গাজী নজরুল ইসলাম। জামায়াতও জানিয়েছে, বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

জানা যায়, গাজী নজরুল ইসলাম বর্তমানে জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় মজলিশে শুরার সদস্য। এর আগে তিনি পঞ্চম ও অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জামায়াতের প্রার্থী হিসেবে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন।

জামায়াতের গঠনতন্ত্রের ৬২ ধারায় (চ) পদচত্যির কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, জামায়াত ঘোষিত নীতির বিপরীতে কোনো কাজ করলে তার সদস্যপদ বাতিল বলে গণ্য হবে। আবার একই ধারার বহিষ্কার হওয়ার কারণের (ক, খ, গ, ঘ, ঙ)-তে বলা আছে, আমীরে জামায়াত কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের পরামর্শক্রমে জামায়াতের যে কোন সদস্যকে (রুকনকে) জামায়াত হইতে বহিষ্কার করিতে পারবেন।

এছাড়াও যদি- কোন সদস্য (রুকন) জামায়াতের নিয়ম-শৃঙ্খলা ও জামায়াতের নীতিসমূহের পরিপন্থী কাজ করেন অথবা এমন কোন কাজ করেন যাহাতে জামায়াতের নৈতিক প্রভাব ক্ষতিগ্রস্ত কিংবা জামায়াতের মর্যাদা ক্ষুণ্ণ হয় তাহলে নির্বাহী পরিষদের পরামর্শক্রমে যে কোনো সদস্যকে বহিষ্কার করা যাবে।

এ ঘটনায় মঙ্গলবার (২১ জুলাই) জামায়াতের কেন্দ্রীয় সিনিয়র প্রচার সহকারী মুজিবুল আলম স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, গাজী নজরুল ইসলামকে ঘিরে প্রকাশিত বিভিন্ন সংবাদ ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের তথ্য পর্যবেক্ষণ করছে দলটি। এরই মধ্যে সংসদ সদস্যের নিজের বক্তব্য, তার প্রথম ও দ্বিতীয় স্ত্রীর বক্তব্য এবং দ্বিতীয় স্ত্রীর বাবার ভিডিও বক্তব্য প্রকাশিত হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে আরও খোঁজখবর নেওয়া হবে। প্রকৃত ঘটনার তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহের পর সাংগঠনিক নিয়ম অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানানো হয়।

এদিকে সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি কোনো রাজনৈতিক দলের মনোনয়নে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর ওই দল থেকে পদত্যাগ করলে অথবা সংসদে ওই দলের বিপক্ষে ভোট দিলে তার আসন শূন্য হবে। তবে কোনো সংসদ সদস্যকে দল থেকে বহিষ্কার করা হলে তার সদস্যপদ বাতিল হবে কি না, সে বিষয়ে সংবিধানে সরাসরি কিছু বলা নেই।

আইনজীবীদের মতে, এ কারণে কোনো রাজনৈতিক দল কাউকে বহিষ্কার করলে তার সংসদ সদস্য পদ বহাল থাকার সুযোগ রয়েছে। অতীতে দল থেকে বহিষ্কৃত হয়েও কয়েকজন সংসদ সদস্যের পদ বহাল থাকার নজির রয়েছে।

তবে কেউ নিজে দল থেকে পদত্যাগ করলে সংসদ সদস্য পদ হারানোর বিধান রয়েছে। এর আগে দশম জাতীয় সংসদে সরকারদলীয় সংসদ সদস্য আবদুল লতিফ সিদ্দিকী দল থেকে পদত্যাগ করায় তার সংসদ সদস্য পদ বাতিল হয়েছিল। সেই হিসেবে গাজী নজরুল ইসলাম জামায়াত থেকে নিজে পদত্যাগ করলে তার সংসদ সদস্য পদ স্বয়ংক্রিয়ভাবে শূন্য হবে। কিন্তু দল তাকে বহিষ্কার করলে বিষয়টি ভিন্ন হতে পারে।

আরও পড়ুন: এমপি নজরুলের বিয়ের কাবিননামা নিয়েও চাঞ্চল্য, কোথায় বিয়ে হয়েছে জানেন না নিবন্ধনকারী কাজী

সংবিধানের ৬৬ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী কোনো সংসদ সদস্যের আসন শূন্য হবে কি না, এ নিয়ে কোনো বিতর্ক দেখা দিলে বিষয়টি শুনানি ও নিষ্পত্তির জন্য নির্বাচন কমিশনের কাছে পাঠানো হবে। এ ক্ষেত্রে কমিশনের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত হবে।

অর্থাৎ গাজী নজরুল ইসলামকে জামায়াত বহিষ্কার করলে এবং দলটির পক্ষ থেকে তার সংসদ সদস্য পদ বাতিলের উদ্যোগ নেওয়া হলে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেবে নির্বাচন কমিশন।

এ বিষয়ে সংবিধান বিশেষজ্ঞ ও আইনজীবী হাবিবুর রহমান এ বিষয়ে নিজের ফেসবুক স্ট্যাটাসে লিখেছেন, সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী কোনো দল থেকে মনোনীত হয়ে নির্বাচিত কোনো সংসদ সদস্যকে ওই দল থেকে বহিষ্কার করা হলে তার সংসদ সদস্য পদ শূন্য হবে না। তবে তিনি নিজে দল থেকে পদত্যাগ করলে সংসদ সদস্য পদ শূন্য হবে বলে উল্লেখ করেন।

এদিকে সোমবার (২০ জুলাই) রাতে গাজী নজরুল ইসলামের সঙ্গে এক নারীর অন্তরঙ্গ মুহূর্তের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। পরে ভিডিওটি প্রথমে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে তৈরি বলে জামায়াতের কিছু নেতা-কর্মী দাবি করেছেন। যদিও পরবর্তীতে ফ্যাক্টচেকিং প্রতিষ্ঠানসহ অনেকেই ভিডিওটি আসল প্রমাণ করে। এরপর গাজী নজরুল ইসলাম ভিডিওতে থাকা নারীকে তার দ্বিতীয় স্ত্রী বলে দাবি করেছেন।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও ও সিসিটিভি ফুটেজে একটি কক্ষে এক তরুণীর সঙ্গে গাজী নজরুল ইসলামকে দেখা যায়।
ভিডিওতে থাকা তরুণীকে এমপির দ্বিতীয় স্ত্রী বলে দাবি করেছেন স্থানীয় জামায়াত নেতারা। মঙ্গলবার সকালে জামায়াতের সাতক্ষীরা জেলা শাখার সেক্রেটারি মাওলানা আজিজুর রহমান বলেন, ভিডিওটি তাদের নজরে এসেছে। এমপি তাদের জানিয়েছেন, ভিডিওতে যাকে দেখা যাচ্ছে তিনি তার দ্বিতীয় স্ত্রী।

তিনি আরও বলেন, প্রথম স্ত্রীর সম্মতিক্রমেই এই বিয়ে হয়েছে।

এ বিষয়ে গাজী নজরুল ইসলামও একটি সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দিয়েছেন। মঙ্গলবার দেওয়া বিজ্ঞপ্তিতে তিনি দাবি করেন, গত ১৩ জুলাই প্রথম স্ত্রী মোছা. মাকছুদা বেগম ও দ্বিতীয় স্ত্রী মোছা. মরিয়ম বেগমকে সঙ্গে নিয়ে রাজধানীর মগবাজারে দ্বিতীয় স্ত্রীর বাবা মো. মাসুম বিল্লাহর ব্যবসায়িক কার্যালয়ে যান। সেখানে তারা আনুমানিক সোয়া এক ঘণ্টা অবস্থান করেন বলেও বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করেন তিনি।