আন্দোলন শরিক নেতাদের কাছে দুঃখপ্রকাশ প্রধানমন্ত্রীর
ফ্যাসিস্ট সরকারবিরোধী যুগপৎ আন্দোলনে অংশ নেওয়া শরিক দলগুলোর নেতাদের সম্মানে আয়োজিত এক নৈশভোজে আন্দোলনের শরিকদের কাছে দুঃখ প্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেন, দীর্ঘদিন একসঙ্গে বসার সুযোগ না হওয়ায় এ আয়োজন করা হয়েছে এবং শরিক নেতাদের মনে যে কষ্ট রয়েছে, তা তিনি উপলব্ধি করেন।
সোমবার (২০ জুলাই) সন্ধ্যায় রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘অনেকদিন বসার সুযোগ হয়নি, সেজন্য আজকে এই আয়োজনটি করেছি। আমি জানি, মুরুব্বিরা যা বলেছেন, তার সঙ্গে আমি মোটেও দ্বিমত করব না। উনাদের মনে যে কষ্টের কথাগুলো আছে, সেগুলো আমি জানি। স্বাভাবিকভাবেই বয়সে উনারা আমার থেকে বড়। আমি ছোট ভাই হিসেবে বড় ভাইদের সব বিষয় মেনে নিই। আমি দুঃখ প্রকাশ করছি।’
তিনি শরিকদের উদ্দেশে আরও বলেন, ‘আমরা এতদিন একসঙ্গে ছিলাম। কেন আমরা আলাদা হয়ে যাব? আমরা একসঙ্গেই থাকব। চলতে গেলে এদিক-ওদিক হতেই পারে। এটা ফেয়ারওয়েল ডিনার নয়। ফেয়ারওয়েল যদি কাউকে বলতে হয়, তাহলে স্বৈরাচারকে বলা যাবে। কিন্তু আমরা যারা আন্দোলনে ছিলাম, আমরা ইনশাআল্লাহ একসঙ্গেই থাকব।’
‘মতভিন্নতা থাকতে পারে, বিভেদ নেই’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আন্দোলনের শরিকদের মধ্যে মতপার্থক্য থাকতে পারে, তবে কোনো বিভেদ নেই। তিনি বলেন, ‘আমরা একসঙ্গে আছি, একসঙ্গে ছিলাম এবং ইনশাআল্লাহ ভবিষ্যতেও একসঙ্গে থাকব। আমাদের মধ্যে মতভিন্নতা থাকতে পারে, কিন্তু ভুল বোঝাবুঝির কোনো কারণ নেই। ৩১ দফার মাধ্যমে আমরা একটি জায়গায় একত্রিত হয়েছি। আমাদের উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য এক।’
তিনি আরও বলেন, ‘৩১ দফা বাস্তবায়নের পদ্ধতি নিয়ে ভিন্ন মত থাকতে পারে। কিন্তু আমাদের মধ্যে কোনো বিভেদ নেই। ৩১ দফা এবং জুলাই সনদের আলোকে আমরা দেশকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাব।’
‘গুপ্তরা আন্দোলনে ছিল না’
আন্দোলনের সময়কার প্রসঙ্গ টেনে প্রধানমন্ত্রী বলেন, যারা এখন বিভিন্ন দাবি করছেন, তাদের অনেককেই আন্দোলনের সময় রাজপথে দেখা যায়নি।
তিনি বলেন, ‘একটি শব্দ ‘গুপ্ত’ বললেই মানুষ বুঝে যায় কাদের কথা বলছি। আন্দোলনের সময় আমরা তাদের অনেক খুঁজেছি, কিন্তু রাজপথে পাইনি। বরং যারা দেশ ছেড়ে পালিয়ে গিয়েছিল, তাদের সঙ্গে বিভিন্নভাবে তাদের দেখা গেছে। ১৭ বছর রাজপথে তাদের দেখা যায়নি।’
‘ঐক্য ধরে রাখতে হবে’
শরিকদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, জনগণের আস্থা ধরে রাখতে হলে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে।
তিনি বলেন, ‘দেশের মানুষ আমাদের ওপর আস্থা রেখেছে। জনগণ প্রত্যাশা নিয়ে আমাদের দায়িত্ব দিয়েছে। আগে সেই দায়িত্ব পালন করি, তারপর নিজেদের কথা ভাবব।’
‘৩১ দফার পক্ষেই জনগণের রায়’
প্রধানমন্ত্রী দাবি করেন, সাম্প্রতিক নির্বাচনে জনগণ ৩১ দফার পক্ষেই রায় দিয়েছে।
তিনি বলেন, ‘আমরা অনেকগুলো রাজনৈতিক দল একসঙ্গে রাষ্ট্র মেরামতের ৩১ দফা দিয়েছিলাম। তখন অনেকে সংস্কারের ‘স’ পর্যন্ত বলেননি। অথচ আজ তারাই বড় বড় কথা বলছেন। আমি মনে করি, জনগণ নির্বাচনে ৩১ দফার পক্ষেই রায় দিয়েছে। এখন এটি শুধু রাজনৈতিক দলগুলোর নয়, বরং দেশের জনগণের ৩১ দফা।’
‘অন্তর্বর্তী সরকারের ৬০ শতাংশে গুপ্ত বাহিনীর প্রভাব ছিল’
বক্তব্যে অন্তর্বর্তী সরকারের এক উপদেষ্টার সঙ্গে আলাপের প্রসঙ্গও তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী।
তিনি বলেন, ‘একজন উপদেষ্টা আমাকে বলেছেন, ১৮ মাস দেশ পরিচালনার সময় তারা খুব অসহায় ছিলেন। তার ভাষায়, সরকারের ৬০ শতাংশের বেশি জায়গায় সেই গুপ্ত বাহিনীর প্রভাব ছিল। নির্বাচনের পর জনগণের রায়ের কারণে তারা দিশেহারা হয়ে গেছে।’
শরিক নেতাদের উপস্থিতি
নৈশভোজ শুরুর আগে প্রধানমন্ত্রী শরিক নেতাদের টেবিলে গিয়ে কুশল বিনিময় করেন এবং তাদের খোঁজখবর নেন। পরে তিনি শরিক নেতাদের সঙ্গে একই টেবিলে বসে নৈশভোজে অংশ নেন।
অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন বিএনপির মহাসচিব ও স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। এছাড়া জাতীয় পার্টির (কাজী জাফর) চেয়ারম্যান মোস্তফা জামাল হায়দার, নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক এবং জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের মহাসচিব মুফতি মহিউদ্দিন ইকরাম বক্তব্য রাখেন।
অনুষ্ঠানে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সালাহ উদ্দিন আহমদ, সেলিমা রহমান, ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু, বরকত উল্লাহ বুলুসহ শরিক দলের শীর্ষ নেতারা উপস্থিত ছিলেন।