বিশেষ ভেলায় চেয়ার বসিয়ে বন্যার্তদের পাশে বিএনপির এমপি
বান্দরবানের ভয়াবহ বন্যা ও পাহাড়ধসে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন সংসদ সদস্য ও জেলা বিএনপির আহ্বায়ক সাচিং প্রু জেরী। বন্যাকবলিত এলাকা পরিদর্শন, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের মধ্যে আর্থিক সহায়তা ও ত্রাণ বিতরণ করেছেন তিনি। বিশেষ ভেলায় চড়ে দুর্গত এলাকা পরিদর্শনেও গিয়েছেন তিনি।
রবিবার (১২ জুলাই) ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে দেখা যায়, বিশেষভাবে তৈরি একটি ভেলায় চেয়ার বসিয়ে সেখানে বসে আছেন এমপি সাচিং প্রু জেরী। কয়েকজন ব্যক্তি ভেলাটি টেনে পানিবন্দী এলাকার মধ্যে নিয়ে যাচ্ছেন।
ভিডিওতে তাকে ভেলায় থাকা আরেক ব্যক্তিকে হাতের ইশারায় দূরের একটি এলাকা দেখাতেও দেখা যায়। পেছনে দূরে কয়েকটি গাড়িও দেখা যায়। তবে ভিডিওটি বান্দরবানের ঠিক কোন এলাকায় ধারণ করা হয়েছে, তা তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
এদিকে, বন্যা ও পাহাড়ধসে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে বিভিন্ন এলাকায় সহায়তা কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন এই সংসদ সদস্য। শনিবার (১১ জুলাই) দুপুরে তিনি লামা উপজেলার আজিজনগর ইউনিয়নে পাহাড়ধসে শিশুসহ পাঁচজন নিহত হওয়া দুই পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। এ সময় তার সঙ্গে ছিলেন লামা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মঈন উদ্দিন, লামা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ কায়ছার হামিদ এবং জেলা ও উপজেলা বিএনপির নেতাকর্মীরা।
এ সময় ক্ষতিগ্রস্ত দুই পরিবারের ঘরবাড়ি মেরামতের জন্য ৫০ হাজার টাকা করে মোট এক লাখ টাকা আর্থিক সহায়তা প্রদান করেন তিনি। এছাড়া পাহাড়ধসে গুরুতর আহত হয়ে চট্টগ্রামের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আজিজনগর ইউনিয়নের মহিলা সদস্য রেহেনা আক্তারকে ১০ হাজার টাকা অনুদান দেওয়া হয়।
অন্যদিকে, আলীকদম উপজেলায় বন্যাকবলিত এলাকা পরিদর্শন করে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের মধ্যে ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করেন সাচিং প্রু জেরী। এ সময় উপজেলার চারটি ইউনিয়নের এক হাজার ৩৩০টি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে পর্যায়ক্রমে ত্রাণ সহায়তা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। প্রাথমিকভাবে এসব পরিবারকে চিহ্নিত করেছে উপজেলা প্রশাসন।
এ লক্ষ্যে এমপি সাচিং প্রু জেরীর নির্দেশনায় আলীকদম উপজেলা পরিষদ মিলনায়তনে উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে বন্যা-পরবর্তী পরিস্থিতি মোকাবিলা, ত্রাণ কার্যক্রমে সমন্বয় এবং একই পরিবারে একাধিকবার ত্রাণ বিতরণ (ওভারল্যাপিং) রোধে একটি জরুরি সভা অনুষ্ঠিত হয়।
সভায় সিদ্ধান্ত হয়, প্রতিটি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে ৩০ কেজি চালের পাশাপাশি দুই কেজি আলু, এক লিটার সয়াবিন তেল, এক কেজি পেঁয়াজ, ৫০০ গ্রাম মসুর ডাল এবং ৫০০ গ্রাম লবণ সমন্বয়ে একটি শুকনো খাদ্যসামগ্রীর প্যাকেজ দেওয়া হবে।
এদিকে, টানা কয়েক দিনের ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে বান্দরবানের সার্বিক বন্যা পরিস্থিতির খুব একটা উন্নতি হয়নি। রবিবার (১২ জুলাই) টানা চতুর্থ দিনের মতো জেলার সঙ্গে সারা দেশের সড়ক যোগাযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন রয়েছে। একই সঙ্গে পাহাড়ধস ও বন্যার পানিতে সড়ক তলিয়ে যাওয়ায় জেলার সাতটি উপজেলার অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ ব্যবস্থাও কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে।
এর আগে শনিবার বিকেল থেকে বৃষ্টির পরিমাণ কিছুটা কমে আসায় সাঙ্গু নদীর পানি নামতে শুরু করলেও জেলা শহরের অধিকাংশ এলাকা এখনও পানিবন্দী রয়েছে। বান্দরবান-চট্টগ্রাম, বান্দরবান-রাঙামাটি এবং জেলা সদরের সঙ্গে আলীকদম, রুমা ও রোয়াংছড়ি উপজেলার সড়ক যোগাযোগ এখনও বিচ্ছিন্ন। বিভিন্ন স্থানে সড়ক ও সেতু ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি পাহাড়ধসের ঘটনাও ঘটেছে। এতে কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে পুরো জেলা। বন্যায় সড়ক, অবকাঠামো ও কৃষি খাতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। জেলার প্রায় সাড়ে তিন হাজার একর জমির ফসল নষ্ট হয়েছে।
প্রশাসন ও স্থানীয় সূত্র জানায়, গত ৫ জুলাই থেকে জেলার সাতটি উপজেলায় টানা মাঝারি থেকে ভারী বর্ষণ হচ্ছে। অব্যাহত বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে জেলার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়ে পড়ে। বন্যা ও পাহাড়ধসে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে জনজীবন। যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দী অবস্থায় চরম দুর্ভোগে দিন কাটাচ্ছেন।
সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে ত্রাণ কার্যক্রম চললেও আশ্রয়কেন্দ্রে অবস্থানরত অনেক বানভাসি অভিযোগ করেছেন, সেখানে পর্যাপ্ত খাবার ও বিশুদ্ধ পানির সংকট রয়েছে। একই সঙ্গে টানা বৃষ্টিতে পাহাড়ধসের ঝুঁকি বাড়তে থাকায় পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসকারী মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যেতে প্রশাসন, ফায়ার সার্ভিস, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদের পক্ষ থেকে নিয়মিত মাইকিং করা হচ্ছে।
বান্দরবানের জেলা প্রশাসক মো. সানিউল ফেরদৌস বলেন, বন্যার্তদের সার্বিক সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। দুর্যোগ মোকাবিলায় জেলায় ২২০টি আশ্রয়কেন্দ্র এবং একটি জরুরি কন্ট্রোল রুম খোলা হয়েছে। সেনাবাহিনী, বিজিবি, পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা বন্যাকবলিত ও ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনা করছেন।